শিশুদের কি ঘ্রাণ শুঁকতে শেখাতে হবে
নাক থাকলে তো ঘ্রাণ এমনিতেই পাওয়া যায়। সাধারণত আমরা আলাদা করে ঘ্রাণ চিনতে শিখি না। স্কুলে বা বাসায়—কোথাও ঘ্রাণ চেনানো হয় না। কিন্তু ঘ্রাণ নিয়ে গবেষণা করা ইতিহাসবিদ ড. উইল টালেটের দাবি, শিশুদের ঘ্রাণ শোঁকা আরও ভালোভাবে শেখানো দরকার। এতে তাদের সুস্থতা বাড়তে পারে। পাশাপাশি চারপাশের পৃথিবীকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের এই গবেষক বলেন, বায়ুদূষণের কারণে মানুষের ঘ্রাণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার আজকাল অনেক বস্তু ও পদার্থের স্বাভাবিক ঘ্রাণও বদলে দেওয়া হয়। গাড়ির ভেতরের অংশ, আমাদের ঘরবাড়ি ইত্যাদির ক্ষেত্রে আমরা আসল ঘ্রাণ পাই না। কৃত্রিম সুগন্ধ এসব ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।
টালেটের প্রশ্ন, প্রতিদিনের জীবনে কৃত্রিম ঘ্রাণের এই বহুল ব্যবহার আমাদের বিভিন্ন ঘ্রাণের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতাকে কীভাবে প্রভাবিত করে?
তাই তিনি ঘ্রাণ নিয়ে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। তাঁর মতে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের নাক দিয়ে চারপাশের ঘ্রাণ চিনতে ও সেগুলো নিয়ে ভাবতে শেখাতে হবে। এই অনুশীলন বাসায়ও করা সম্ভব।
কীভাবে শেখানো যেতে পারে? টালেটের পরামর্শ, মানুষকে আরও বেশি জিনিস শুঁকতে উৎসাহিত করা উচিত। যত বেশি ঘ্রাণ শোঁকা হবে, তত বেশি ঘ্রাণ বর্ণনা করার শব্দভান্ডার তৈরি হবে। ওয়াইনের স্বাদ ও ঘ্রাণ বিচার করেন যাঁরা, সেই সোমেলিয়েররাও একই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করেন। তাঁরা বাজারে ঘুরে নানা জিনিসের ঘ্রাণ শোঁকেন। এতে তাঁদের পরিচিত ঘ্রাণের পরিসর বাড়ে। পরে বিভিন্ন ঘ্রাণের মধ্যে মিল-অমিল তুলনা করা সহজ হয়।
ঘ্রাণ নিয়ে ভাবলে আমরা নিজেদের বুঝতে পারব। যেমন কোন ঘ্রাণ আমাদের কেন স্বস্তি দেয়, তা নিয়ে আমরা ভাবতে পারি। আবার ঘ্রাণ কিন্তু আমাদের চারপাশের পৃথিবী সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
এর একটি সহজ উদাহরণ খাবার। খাবার তাজা আছে কি না, নষ্ট হয়েছে কি না, ঘ্রাণ শুঁকে অনেক সময় বলে দেওয়া যায়। শুধু ‘ব্যবহারের শেষ তারিখ’ দেখে খাবার ফেলে না দিয়ে ঘ্রাণের মাধ্যমেও সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।
ঘ্রাণের সঙ্গে আমাদের ভালো থাকার অনুভূতির গভীর সম্পর্ক আছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ঘ্রাণ উপভোগ করার ক্ষমতা আমাদের মানসিক সুস্থতার সঙ্গে যুক্ত। যাঁরা কোনো কারণে ঘ্রাণশক্তি হারান, তাঁদের মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তবে টালেট মনে করেন না যে মানুষ ঘ্রাণকে একেবারেই গুরুত্ব দেয় না। বরং মানুষকে ঘ্রাণ নিয়ে কথা বলার সুযোগ দিলে তারা অনেক সময় নির্দিষ্ট ঘ্রাণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পুরোনো স্মৃতির কথা খুব সুন্দরভাবে বলতে পারেন। সমস্যা হলো, ঘ্রাণ নিয়ে কথা বলার মতো উপযুক্ত শব্দ বা আত্মবিশ্বাস অনেকের থাকে না।
৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হতে যাচ্ছে টালেটের বই সিনিফ: আ হিস্টরি অব স্মেলস। বইটি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি গন্ধ নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণার কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, অতীত নাকি বর্তমানের চেয়ে বেশি দুর্গন্ধময় ছিল।
টালেটের মতে, এটা ঠিক নয়। অতীতে ঘ্রাণ কম-বেশি ছিল না, ঘ্রাণ ছিল আলাদা। আর এখানেই ঘ্রাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। মানুষ প্রায়ই ঘ্রাণকে ব্যবহার করে অন্যদের থেকে পার্থক্য তৈরি করতে।
এখনো ঘ্রাণের কারণে মানুষ বৈষম্যের শিকার হয়। যেমন কোনো খাবারের গন্ধ নিয়ে ধারণার কারণে বাড়ির মালিক কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে বাড়িভাড়া দিতে না চাইতে পারেন। এমনকি যুক্তরাজ্যে রাস্তায় বসবাসকারী মানুষদের ‘অতিরিক্ত’ গন্ধের জন্য অপরাধী বানানোর একটি প্রস্তাবও উঠেছিল।
তাই কোনো ঘ্রাণ বা গন্ধকে ভালো বা খারাপ মনে করার আগে আমাদের ভাবা উচিত, কেন আমরা সেটিকে এভাবে দেখছি। এই ধারণা কোথা থেকে এসেছে? অন্য মানুষ সেই গন্ধ বা ঘ্রাণকে কীভাবে দেখেন?
টালেটের মতে, নিজের ঘ্রাণ-সংক্রান্ত পছন্দ ও ধারণা সম্পর্কে আমাদের আরও সচেতন হওয়া দরকার। একই সঙ্গে অন্য মানুষের ঘ্রাণ পছন্দের প্রতিও আরও সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। ঘ্রাণকে ব্যবহার করে মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করার বদলে একটু মনোযোগ দিয়ে গন্ধ শোঁকা আমাদের নিজেদের এবং অন্যদের আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
ঘ্রাণ আবার নির্দিষ্ট সময়, জায়গা ও পরিস্থিতির সঙ্গেও জড়িয়ে থাকে। টালেট মনে করেন, একুশ শতকের ব্রিটেনকে হয়তো একদিন হাত জীবাণুমুক্ত করার স্যানিটাইজার, দাবানল ও দূষিত পানির ঘ্রাণ দিয়ে মনে করা হবে।
কাঠ পোড়ার ঘ্রাণ যেমন অনেকের কাছে পুরোনো দিনের সুখস্মৃতি ফিরিয়ে আনে, ভবিষ্যতে গাছপালা ও কাঠ পোড়ার ঘ্রাণ হয়তো আর তেমন নস্টালজিক লাগবে না। বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তা মানুষের মনে ভয় তৈরি করতে পারে।