পেটের অণুজীবগুলো কি খাওয়ার ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণ করে

পেটের এসব অণুজীব বা জীবাণু আসলে মানুষের খাওয়ার অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।মডেল: নাজিফা, ছবি: কবির হোসেন

মানুষের পেটের ভেতরে তিন হাজারের বেশি প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া আছে। আমরা জানি, এসব অণুজীব আমাদের খাবার হজমে সাহায্য করে ও শরীরকে রোগব্যাধির হাত থেকে বাঁচায়। কিন্তু এরা কি আমাদের খাবারের ইচ্ছা বা পছন্দকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?

২০১৪ সালে ‘বায়োএসেস’ (BioEssays) জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এক চমকপ্রদ তথ্য জানান। তাঁরা বলেন, পেটের এসব অণুজীব বা জীবাণু আসলে মানুষের খাওয়ার অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এরা নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য দরকারি খাবারগুলোর প্রতি মানুষের টান বাড়িয়ে দেয়। এমনকি মানুষ যদি এদের পছন্দের খাবার না খায়, তবে এরা পেটের ভেতর একধরনের অস্বস্তিও তৈরি করতে পারে।

গবেষণাটির অন্যতম লেখক ও নিউ মেক্সিকো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডাক্তার জো অ্যালকক। তিনি বলেন, ‘আমরা যা খেতে চাই, আমাদের পেটের জীবাণুরা সব সময় তার সঙ্গে একমত হয় না।’

সালমোনেলা টাইফিমুরিয়াম নামের ব্যাকটেরিয়াটি এর একটি চমৎকার উদাহরণ। শরীরে কোনো সংক্রমণ ঘটালে এটি অন্ত্র থেকে মস্তিষ্কে পাঠানো রাসায়নিক সংকেতগুলোতে একধরনের গোলমাল তৈরি করে, যাতে আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রাণী অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও বারবার খেতে থাকে।

অধ্যাপক অ্যালকক ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘সাধারণত পরিপাকতন্ত্রে কোনো জীবাণু আক্রমণ করলে অসুস্থতার কারণে আমাদের খাবারের ইচ্ছা বা ক্ষুধা কমে যায়। কিন্তু সালমোনেলা টাইফিমুরিয়াম শরীরের সেই স্বাভাবিক ক্ষুধা কমার নিয়মটিকে আটকে দেয়। ফলে আক্রান্ত প্রাণীটি ক্রমাগত খেতেই থাকে এবং মলত্যাগের মাধ্যমে চারপাশে আরও বেশি জীবাণু ছড়িয়ে দিয়ে অন্যদের সংক্রমিত করে।’

তবে এটি ছিল একটি তাত্ত্বিক গবেষণা। অর্থাৎ এতে অণুজীবগুলো ঠিক কীভাবে খাবারের লোভ বা ইচ্ছা বাড়াতে পারে তার কিছু বৈজ্ঞানিক ধারণা দেওয়া হয়েছিল। সাধারণ খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে জীবাণুর এই কলকাঠি নাড়ানোর বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য শোনালেও এটি এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত হয়নি।

আরও পড়ুন

অন্ত্রের অণুজীব কীভাবে আমাদের খাবারের ইচ্ছা বদলে দেয়

২০২২ সালে একদল গবেষক এ ধারণাটি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখেন। যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গ ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানী কেভিন কোল এবং কর্নেল ইউনিভার্সিটির অণুজীববিজ্ঞানী ব্রায়ান ট্রেভেলিন বন্য ইঁদুর নিয়ে কাজ শুরু করেন। তাঁরা মাংসাশী, তৃণভোজী ও সর্বভোজী—এই তিন ধরনের ইঁদুরের পেট থেকে মাইক্রোবায়োম বা অণুজীব সংগ্রহ করেন। এরপর সেগুলো জীবাণুমুক্ত ল্যাব-ইঁদুরের পেটে প্রতিস্থাপন করে এদের খাদ্যাভ্যাস পর্যবেক্ষণ করেন।

গবেষক কেভিন কোল জানান, ‘আমি ভেবেছিলাম মাংসাশী ইঁদুরের অণুজীব পাওয়া ইঁদুরগুলো বেশি প্রোটিনজাতীয় খাবার পছন্দ করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র।’ গবেষণায় দেখা গেল, তৃণভোজী ইঁদুরের অণুজীব পাওয়া দলটির প্রোটিনজাতীয় খাবার বেশি পছন্দ হলো। আর মাংসাশী ইঁদুরের অণুজীব পাওয়া দলটি বেছে নিল শর্করা বা কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার। ফলাফল উল্টো হলেও একটি বিষয় পরিষ্কার বোঝা গেল, পেটের অণুজীব বদলে গেলে খাদ্যাভ্যাস ও পছন্দের খাবারও নিশ্চিতভাবে বদলে যায়।

কিন্তু পেটের এই অণুজীবগুলো কীভাবে তা করে? আসলে অন্ত্রের ভেতরে থাকা ব্যাকটেরিয়াই মস্তিষ্কের জন্য দরকারি নানা রাসায়নিক সংকেত বা নিউরোট্রান্সমিটার তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে একটি হলো ‘সেরোটোনিন’, যা পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়। মজার বিষয় হলো, আমাদের শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশ সেরোটোনিন মস্তিষ্কে নয়, বরং পেটের অন্ত্রেই তৈরি হয়। কাজটা করে ব্যাকটেরিয়া।

আরও পড়ুন

খাবারের লোভ ও ব্যাকটেরিয়ার চক্র

বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের শরীরের অণুজীব আর খাদ্যাভ্যাসের ভেতরে একটি দ্বিমুখী প্রভাব কাজ করে। পিটসবার্গ ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক কেভিন কোল জানান, অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার পরিবর্তন অনেক সময় মানুষের খাওয়ার আচরণকে ঠিক করে দেয় বা নতুন নতুন খাবারের প্রতি টান তৈরি করে।

তবে কেভিন কোল জানান, পরীক্ষাটি করা হয়েছিল ইঁদুরের ওপর। মানুষের ক্ষেত্রে খাবারের নির্বাচন এত সহজ নয়। এর সঙ্গে সংস্কৃতি, সমাজ, আর্থিক অবস্থা এবং ব্যক্তিগত অভ্যাসের মতো নানা জটিল বিষয় জড়িত।

তবু মানুষের শরীরেও এর প্রমাণ মিলতে শুরু করেছে। ২০২৫ সালে ‘নেচার মাইক্রোবায়োলজি’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ‘ব্যাকটেরয়েডস ভালগাটাস’ নামের একটি অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া ইঁদুরের চিনি খাওয়ার ইচ্ছা কমিয়ে দেয়। এটি এমন এক রাসায়নিক তৈরি করে, যা শরীরে জিএলপি-১ হরমোনের ক্ষরণ বাড়ায়। বর্তমানে ওজেম্পিকের মতো জনপ্রিয় ডায়াবেটিস ও ওজন কমানোর ওষুধগুলোও এই একই হরমোনকে কাজে লাগায়। গবেষকেরা আরও দেখেন, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের শরীরে এই ব্যাকটেরিয়াটির পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ কম থাকে।

তবে এর মানে এই নয় যে আমাদের সব খাবারের ইচ্ছার পেছনে অণুজীবদের হাত রয়েছে। কেভিন কোল বলেন, মানুষের নিজের ইচ্ছাশক্তি এখনো সবচেয়ে বড় বিষয়। জীবাণুরা আমাদের সরাসরি পরিচালিত করে না। বরং শরীরে সঞ্চালিত উপাদানগুলোর ভারসাম্য বদলে দিয়ে এরা মৃদু অনুভূতির জন্ম দেয়, যা খাদ্যাভ্যাসে প্রভাব ফেলে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন