রোমানরা এত ধনী হয়েছিল কীভাবে
পায়ের ওপর পা তুলে বসে বসে খেয়ে প্রতিবছর তিন লাখ ডলার আয় করতে পারলে কেমন হতো? মন্দ হতো না নিশ্চয়ই। রোমান কবি জুভেনাল ঠিক এই স্বপ্নই দেখতেন। প্রায় দুই হাজার বছর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি শুধু এমন এক বিনিয়োগ চাই, যা থেকে বছরে ২০ হাজার সেস্টারসেস (রোমান মুদ্রা) আয় হবে।’ বর্তমান সময়ে এটা অনেক টাকা। তখনকার দিনেও মানুষ বুঝত, টাকা দিয়ে টাকা বানাতে হয়। রোমান ঔপন্যাসিক পেট্রোনিয়াস বলেছিলেন, ‘যার পকেটে টাকা আছে, বাতাসও তার অনুকূলে বয়।’ কিন্তু তখন তো আর শেয়ারবাজার বা ক্রিপ্টোকারেন্সি ছিল না। তাহলে রোমানরা তাদের টাকা খাটাত কোথায়?
আজকের দিনে আমরা যেমন শেয়ার কিনি, প্রাচীন রোমানরা কিনত সোনা ও রুপা। মুদ্রাস্ফীতি বা টাকার মান কমে যাওয়ার ভয় তাদেরও ছিল। তাই তারা টাকা জমিয়ে না রেখে তা দিয়ে সোনার বার বা ভারী গয়না বানিয়ে রাখত। কবি ভার্জিল এক ধনী ব্যক্তির বাড়ির বর্ণনায় লিখেছেন, ‘বিশাল প্রাসাদের গভীরে লুকানো আছে রুপার ট্যালেন্ট ও সোনার বার।’ তখনকার দিনে ট্যালেন্ট ছিল মুদ্রার সবচেয়ে বড় একক। এক ট্যালেন্ট মানে প্রায় ২৫ কেজি রুপা! বিখ্যাত লেখক সিসেরো আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন ক্লোডিয়া নামে এক ধনী নারীর সঙ্গে। কাউকে ঋণ দেওয়ার দরকার হলে তিনি তাঁর বিশেষ সিন্দুক থেকে সোনার বার বের করে দিতেন। ব্যাংক নয়, মানুষের বাড়িই ছিল তখন ব্যাংক!
সোনা-রুপা জমানো নিরাপদ মনে হলেও সব সময় তা ছিল না। মাঝেমধ্যে বাজার ধসে পড়ত। গ্রিক ইতিহাসবিদ পলিবিয়াসের লেখা থেকে জানা যায়, একবার ইতালির অ্যাকুইলিয়াতে মাটির মাত্র দুই ফুট নিচে বিশাল সোনার খনি পাওয়া যায়। হঠাৎ বাজারে এত সোনা চলে আসায় মাত্র দুই মাসের মধ্যে সারা ইতালিতে সোনার দাম তিন ভাগের এক ভাগ কমে গিয়েছিল! পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষমেশ খনির ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বসাতে হয়েছিল।
সোনা-রুপা জমিয়ে রাখলে তো আর সুদ বাড়ে না, শুধু দাম বাড়ে-কমে। তাই রোমান স্টেটসম্যান ক্যাটো বুদ্ধি দিলেন ভিন্ন কিছুর। তিনি বললেন, বিনিয়োগ করো কৃষিতে। জমি কেনা, জলপাই তেল বা শস্য উৎপাদন ছিল তাদের সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ। ক্যাটো বলতেন, ‘এগুলো এমন সম্পদ যা স্বয়ং দেবতা জুপিটারও ধ্বংস করতে পারবেন না।’ সোনা সিন্দুকে পড়ে থাকলেও প্রতিবছর ফসল দেয়, মানে নিশ্চিত আয়।
শৌখিন রোমানরা চিত্রকর্ম বা শিল্পকলাতেও প্রচুর টাকা ঢালত। রোমানরা যখন করিন্থ শহর দখল করে, তারা সেখানকার বিখ্যাত সব শিল্পকর্ম লুট করে নিলামে তুলেছিল। সেই নিলামে পারগামনের রাজা দ্বিতীয় অ্যাটালাস একটি পেইন্টিং কিনেছিলেন ১০০ ট্যালেন্ট দিয়ে! অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কেজি রুপার সমান দামে। ভাবা যায়?
তবে ধনী হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা ও খামখেয়ালি সম্রাটরা। গৃহযুদ্ধের সময় জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যেত। ইতিহাসবিদ সুয়েটোনিয়াসের লেখা থেকে জানা যায়, সম্রাট ক্যালিগুলা অদ্ভুত সব জিনিসের ওপর ট্যাক্স বসাতেন। আরেক সম্রাট ভেসপাসিয়ান তো আরও এক কাঠি সরস। তিনি কম দামে বাজার থেকে পণ্য কিনে জমিয়ে রাখতেন, পরে বেশি দামে বিক্রি করে লাভ করতেন। অর্থাৎ খোদ সম্রাটই করতেন সিন্ডিকেটের ব্যবসা! দেখা যাচ্ছে, দুই হাজার বছর আগেও ধনী হওয়ার মূলমন্ত্র একই ছিল, টাকা খাটাও, ঝুঁকি নাও এবং সাবধানে থাকো। শুধু মাধ্যমগুলো বদলেছে; কিন্তু মানুষের মানসিকতা আজও সেই রোমানদের মতোই রয়ে গেছে।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স