১০ বছর পর চাকরি হবে শখের বিষয়, ইলন মাস্ক যা বলছেন
একটু কল্পনা করা যাক, এমন এক পৃথিবী, যেখানে বেঁচে থাকার জন্য কাউকে কাজ করতেই হবে না। চাকরি থাকবে, কিন্তু সেটা আর বাধ্যতামূলক নয়। ঠিক যেমন খেলাধুলা, ছবি আঁকা বা ভিডিও গেম খেলা। ভালো লাগলে করব, না লাগলে করা লাগবে না।
শুনতে অবাস্তব লাগলেও, এমন ভবিষ্যতের কথাই বলছেন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে আয়োজিত ইউএস- সৌদি ইনোভেসমেন্ট ফোরামে মাস্ক বলেন, আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যেই কাজ করা হয়ে উঠবে ঐচ্ছিক। তাঁর যুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর রোবট ধীরে ধীরে মানুষের প্রায় সব কাজই নিজের কাঁধে তুলে নেবে। তখন মানুষের আর কাজ করে বেঁচে থাকার প্রয়োজন থাকবে না।
কাজকে তিনি তুলনা করেছেন সবজি চাষের সঙ্গে। চাইলে বাজার থেকে সবজি কিনে আনা যায়, আবার কেউ কেউ সময় আর শ্রম দিয়ে বাড়ির পেছনে সবজি ফলাতে পারেন। কারণ তাঁরা সেটাতে আনন্দ পান। ভবিষ্যতে কাজও হবে ঠিক তেমনই। প্রয়োজনের তাগিদে নয়, আগ্রহ আর আনন্দ থেকেই মানুষ কাজ করবে।
এই ভবিষ্যতের ছবিতে রোবটদের ভূমিকা অনেক। মাস্কের ধারণা, সামনে এমন এক সময় আসবে, যখন লাখ লাখ রোবট কাজ করবে কারখানায়, হাসপাতলে, এমনকি অস্ত্রোপচার কক্ষেও। সম্প্রতি এক পডকাস্টে তিনি বলেন, এক দশকের মধ্যেই রোবট সার্জনের সংখ্যা মানুষের চেয়ে বেশি হতে পারে। শুধু তাই নয়, সেই চিকিৎসার মান নাকি হবে আজকের রাষ্ট্রপ্রধানদের পাওয়া চিকিৎসার থেকেও উন্নত।
এখানেই থামেননি তিনি। মাস্ক মনে করেন, মানুষের আয়ু সীমিত হওয়াটাও আসলে এক ধরনের 'প্রোগ্রামিং সমস্যা'। যদি এআই–এর সাহায্যে সেই প্রোগ্রাম বদলানো যায়, তাহলে মানুষ আরও দীর্ঘ জীবন পেতে পারে।
এই ভবিষ্যৎ কল্পনায় একসময় টাকার প্রয়োজনও নাকি থাকবে না। মাস্ক এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞান কল্পকাহিনি লেখক ইয়ান ব্যাঙ্কসের কালচার‘ সিরিজের উদাহরণ দেন, যেখানে সমাজ এত সমৃদ্ধ যে টাকা বলে কিছুই নেই। এআই আর রোবট যদি অবিরাম উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারে, তাহলে পণ্য আর সেবার কোনো অভাব থাকবে না। আগেও তিনি ইউনিভার্সাল হাই ইনকামের ধারণার কথা বলেছেন, যেখানে মানুষ কাজ করুক বা না করুক, নিয়মিত অর্থ পাবে।
এই ভাবনার সঙ্গে মিল আছে ওপেন এআই–এর প্রধান স্যাম অল্টম্যানের প্রস্তাবিত ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকামের ধারণারও।
তবে সবাই যে এই ভবিষ্যৎ নিয়ে একমত, তা নয়। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, মাস্ক সময়টা একটু বেশি আশাবাদীভাবে দেখছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ইওনা মারিনেস্কু বলেন, এআই দ্রুত এগোলেও রোবট এখনো খুব ব্যয়বহুল, আর সব ধরনের কাজের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। গবেষণাও বলছে, ২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি আসার পরও বিশ্ব শ্রমবাজারে এখনো বড় ধরনের ধাক্কা লাগেনি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা কিন্তু অন্য জায়গায়।
যদি কাজই না থাকে, তাহলে মানুষ কীভাবে জীবন চালাবে?
আর রাজনৈতিকভাবে কি সবার জন্য ন্যায্য আয়ব্যবস্থা তৈরি করা আদৌ সম্ভব?
অনেকে আশঙ্কা করছেন, এআই–এর কারণে তৈরি হওয়া বিপুল সম্পদ এখনো গুটিকয়েক মানুষের হাতেই জমছে। এতে ধনী আর সাধারণ মানুষের ব্যবধান আরও বেড়ে যেতে পারে।
আরেকটি গভীর প্রশ্নও আছে। কাজ না থাকলে জীবনের মানে কী? অর্থনীতিবিদ অ্যান্টন কোরিনেক মনে করিয়ে দেন, কাজ শুধু আয় নয়, বন্ধুত্ব, সম্পর্ক আর জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়ার বড় একটি জায়গা। কাজ হারালে সমাজকে নতুনভাবে ভাবতে হবে। মানুষ কোথা থেকে সেই অর্থপূর্ণ সংযোগ পাবে?
মাস্ক নিজেও এই প্রশ্ন এড়িয়ে যান না। তাঁর কথায়, 'যদি কম্পিউটার আর রোবট সবকিছু মানুষের চেয়ে ভালো করতে পারে, তাহলে মানুষের জীবনের মানে কী?' তবে তিনি মজা করে বলেন, হয়তো তখন মানুষের কাজ হবে এআইকে অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া।
ভবিষ্যৎ সত্যিই এমন হবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে প্রশ্নটা থেকেই যায়। যদি এমন এক পৃথিবীতে বড় হও, যেখানে কাজ করা বাধ্যতামূলক নয়, তাহলে তুমি আসলে কী করতে চাইবে?
সূত্র: ফরচুন ম্যাগাজিন