সুডোকু মেলালেই ওঠে খিঁচুনি, যেভাবে বদলে গেল তরুণের জীবন
অনেকের অবসরের সঙ্গী সুডোকু। এতে মস্তিষ্কের ব্যায়াম হয়। কিন্তু জার্মানির ২৫ বছর বয়সী এক তরুণের জন্য সুডোকুই চরম আতঙ্কের কারণ হয়েছিল। যখনই তিনি সুডোকুর ছক মেলাতে যেতেন, তখনই তাঁর হাত অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপতে শুরু করত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি এক বিরল ঘটনা। কিন্তু কেন এমন হতো? এর পেছনে লুকিয়ে আছে হাড়হিম করা এক দুর্ঘটনার গল্প।
ঘটনাটি ২০০৮ সালের নভেম্বরের। বন্ধুদের সঙ্গে পাহাড়ের বরফে স্কি করতে গিয়েছিলেন ওই তরুণ। হঠাৎ নেমে এল ভয়ংকর এক তুষারঝড়। বরফের বিশাল স্তূপের নিচে তিনি চাপা পড়ে গেলেন। প্রায় ১৫ মিনিট আটকা ছিলেন সেই বরফকবরের নিচে। এই ১৫ মিনিট তাঁর মস্তিষ্কে অক্সিজেন পৌঁছাতে পারেনি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে হাইপোক্সিয়া। ভাগ্য ভালো তাঁর এক বন্ধু তাঁকে বরফের নিচ থেকে উদ্ধার করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে সিপিআর দিয়ে তাঁকে বাঁচান। এরপর তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেন ঠিকই, কিন্তু অক্সিজেনের অভাবে তাঁর মস্তিষ্কের স্থায়ী কিছু ক্ষতি হয়ে গেল। হাঁটার সময় তাঁর পা অনিয়ন্ত্রিতভাবে কেঁপে উঠত। কথা বলার সময় মুখ বেঁকে যেত। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তাঁর হাতদুটো ছিল একদম স্বাভাবিক। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তাঁকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়।
দুর্ঘটনার আগে সুডোকু মেলানো ছিল তাঁর প্রিয় শখ। রিহ্যাবে বসে সময় কাটানোর জন্য তিনি আবার সুডোকু নিয়ে বসলেন। আর তখনই ঘটল সেই ভুতুড়ে কাণ্ড! যেই তিনি সুডোকুর ছক মেলানোর চেষ্টা করলেন, অমনি তাঁর বাঁ হাতটা সজোরে ঝাঁকি দিয়ে উঠল। বারবার এমন হতে লাগল। অবাক করা বিষয় হলো, সুডোকু মেলানো বন্ধ করলেই হাতের কাঁপুনি থেমে যায়। সুডোকু মেলালেই আবার শুরু কাঁপুনি ।
ডাক্তাররা বুঝলেন, সুডোকু মেলানোর সময় তাঁর একধরনের খিঁচুনি হচ্ছে। কিন্তু কেন? রহস্য ভেদ করতে তাঁরা নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন। প্রথমেই ইইজি স্ক্যান করা হলো। দেখা গেল, সুডোকু মেলানোর সময় তাঁর মস্তিষ্কের ডান পাশের একটি নির্দিষ্ট অংশে মারাত্মক বৈদ্যুতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। তবে এমআরআই স্ক্যানে মস্তিষ্কের গঠনে কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি।
তখন ডাক্তাররা এক বুদ্ধি বের করলেন। তাঁরা রোগীকে এমআরআই মেশিনের ভেতরে ঢুকিয়ে সুডোকু সমাধান করতে দিলেন। একে বলে ফাংশনাল এমআরআই। এতে মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহ দেখা যায়। দেখা গেল, সুডোকু মেলানোর সময় তাঁর মস্তিষ্কের ওই নির্দিষ্ট অংশটি অত্যধিক সক্রিয় হয়ে উঠছে।
আরও গভীর পরীক্ষায় ধরা পড়ল আসল সমস্যা। তাঁর ডিটিআই স্ক্যান করানো হয়। আমাদের মস্তিষ্কে কিছু তন্তু থাকে, যেগুলো মস্তিষ্কের অতিরিক্ত উত্তেজনা থামিয়ে রাখে। ওই তুষারঝড়ের সময় অক্সিজেনের অভাবে তরুণের মস্তিষ্কের এই তন্তুগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ফলে যখনই তিনি সুডোকু নিয়ে ভাবতেন, তাঁর মস্তিষ্কের ওই অংশটি কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই তিনগুণ বেশি সক্রিয় হয়ে উঠত। সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কে ভুল সিগন্যাল পাঠিয়ে বাঁ হাতে খিঁচুনি তৈরি করত।
কেন শুধু সুডোকু মেলালে এমন হতো? পড়ালেখা বা সাধারণ হিসাব-নিকাশের সময় তাঁর এমন হতো না। ডাক্তাররা জানালেন, সুডোকু মেলানোর জন্য আমাদের মস্তিষ্কে একটি ত্রিমাত্রিক ছবি কল্পনা করতে হয়। তারপর সংখ্যাগুলোকে সাজাতে হয় বিশেষ নিয়মে। এই ভিজুয়াল-স্পেশিয়াল কল্পনার জন্যই সুডোকু মেলালে তাঁর খিঁচুনি হতো।
এরপর ডাক্তাররা তাঁকে এলোমেলো সংখ্যা ছোট থেকে বড় ক্রমে সাজাতে দিলেন। তখনও একই ঘটনা ঘটল। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই রোগকে বলা হয় রিফ্লেক্স এপিলেপ্সি। অর্থাৎ বিশেষ কোনো কাজ বা দৃশ্য দেখলে খিঁচুনি শুরু হওয়া।
অবশেষে ওষুধের মাধ্যমে তাঁর চিকিৎসা করা হয়। ফিজিওথেরাপি দিয়ে হাঁটা ও কথা বলার সমস্যাও অনেকটা কমিয়ে আনা হয়। ২০১৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, তিনি ৫ বছর ধরে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন এবং তাঁর আর কোনো খিঁচুনি হয়নি। তবে সুস্থ থাকার জন্য তাঁকে একটা বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। ডাক্তারদের কড়া নির্দেশে আর কখনো সুডোকু খেলেননি তিনি। প্রিয় খেলাটিকে চিরতরে বিদায় জানাতে হয়েছে।
এমন মানুষ কিন্তু আরও আছে। কিছু মানুষ দাবা খেললে বা কার্ড খেললে খিঁচুনি শুরু হয়। চীনে ১৯-৪৪ বছর বয়সী এমন পাঁচজন রোগীর খোঁজ পাওয়া গেছে। আসলে আমাদের মস্তিষ্ক যে কত বিচিত্র ও রহস্যময়, এই ঘটনাটি তারই এক অদ্ভুত প্রমাণ!
সূত্র: লাইভ সায়েন্স