অতিরিক্ত রাত জাগলে কী ক্ষতি

অতিরিক্ত রাত জাগলে আমাদের শরীরের টিস্যুগুলো আর ঠিকমতো কাজ করতে পারে নামিডজার্নি

বেশি রাত জেগে বই পড়ো? অনেক রাতেও রিলস দেখো বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্কের ঝড় তোলো? ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে ঘুমের নিশ্চয়ই বারোটা বাজছে!

আমরা অনেকেই ভাবি, এতে শরীরটা হয়তো একটু ক্লান্ত হয়, এই যা। একটু ঘুমিয়ে নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির নতুন এক গবেষণা বলছে, ব্যাপারটা মোটেও এত সহজ নয়। অনিয়মিত ঘুমের এ অভ্যাস আমাদের স্বাভাবিক দেহঘড়ি ওলটপালট করে দিতে পারে। এর ফল হতে পারে মারাত্মক। শরীরে দানা বাঁধতে পারে ব্রেস্ট ক্যানসার।

এত দিন বিজ্ঞানীরা জানতেন, রাত জাগলে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। কিন্তু ঠিক কীভাবে বা কেন এই ঝুঁকি বাড়ে, তা ছিল এক বড় রহস্য। এবার সেই রহস্যের জট খুললেন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির গবেষক তাপশ্রী রায় সরকার ও তাঁর দল।

আমাদের সবার দেহে ২৪ ঘণ্টার একটা অদৃশ্য ঘড়ি আছে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে সার্কাডিয়ান রিদম। এটাকেই আমরা সাহিত্য করে বলছি দেহঘড়ি। এই ঘড়ি শুধু আমাদের ঘুমই নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং শরীরের হরমোন নিঃসরণ, টিস্যু মেরামত এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার পাহারাদারের কাজও করে।

আরও পড়ুন

যখন এই দেহঘড়ির ছন্দপতন হয়, তখন আমাদের শরীরের টিস্যুগুলো আর ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। ইমিউন সিস্টেম ব্যবস্থাও বিপদ চিনতে ভুল করে। ফলাফল হয় ভয়াবহ।

গবেষকেরা ল্যাবে কিছু ইঁদুরের জিন পরিবর্তন করে পরীক্ষা চালিয়েছেন। এই বিশেষ ইঁদুরের ব্রেস্ট ক্যানসার হওয়ার প্রবণতা আছে। এদের দুটি দলে ভাগ করা হয়। এক দলকে রাখা হয় স্বাভাবিক দিন-রাতের নিয়মে। অন্য দলকে রাখা হয় অনিয়মিত আলোর চক্রে, যাতে ওদের দেহঘড়ি পুরোপুরি ওলটপালট হয়ে যায়।

ফলাফল ছিল চমকে দেওয়ার মতো! স্বাভাবিক নিয়মে থাকা ইঁদুরদের শরীরে ক্যানসার দেখা দিল ২২ সপ্তাহ পর। অথচ যাদের ঘুমের নিয়ম ওলটপালট করা হয়েছিল, সেগুলোর ক্যানসার ধরা পড়ল ১৮ সপ্তাহেই!

শুধু তা-ই নয়, অনিয়মিত রুটিনে থাকা ইঁদুরদের টিউমারগুলো ছিল অনেক বেশি আগ্রাসী। সেগুলো দ্রুত ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়ছিল। এটি ব্রেস্ট ক্যানসার রোগীদের জন্য অত্যন্ত খারাপ লক্ষণ।

কিন্তু অনিমিয়ত ঘুমালে শরীরের ভেতরে কী ঘটে? গবেষকেরা দেখেছেন, দীর্ঘদিনের অনিয়মিত রুটিনের কারণে স্তনের সুস্থ টিস্যুর গঠন বদলে যায়। আর এই ক্যানসার কোষগুলোকে সাহায্য করার জন্য কাজ করছে ‘LILRB4’ নামের একটি বিশেষ অণু।

আরও পড়ুন

স্বাভাবিক অবস্থায় এই অণু শরীরের প্রদাহ কমায়। কিন্তু ক্যানসারের ক্ষেত্রে এটি ভিলেন হয়ে যায়। ইমিউন সিস্টেমের একটি ‘চেকপয়েন্ট’ হিসেবে কাজ করে এটি। অর্থাৎ শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখে, যাতে ক্যানসার কোষগুলো নির্বিঘ্নে বেড়ে উঠতে পারে।

তবে এটুকু পড়েই ভয়ের কিছু নেই। কারণ, আশার কথাও শুনিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা দেখেছেন, যখন এই ‘LILRB4’ অণুটিকে অকেজো করে দেওয়া হয়, তখন ইমিউন সিস্টেম আবার জেগে ওঠে। অনিয়মিত ঘুমের মধ্যে থাকলেও তখন ক্যানসার আর আগের মতো দ্রুত ছড়াতে পারে না।

বিশ্বের অনেক মানুষ এখন নাইট শিফটে কাজ করেন। ফলে চাইলেও তাঁরা কাজ না করে থাকতে পারবেন না। এই গবেষণা তাঁদের জন্য তো বটেই, তোমরা যারা অযথা রাত জাগো, তাদের জন্যও সতর্কবার্তা। বিজ্ঞানীরা এখন চেষ্টা করছেন, মানুষের শরীরেও কীভাবে এই ক্ষতি পূরণ করা যায়, তার উপায় বের করতে। ক্যানসার হয়তো সময়ের তোয়াক্কা করে না, কিন্তু আমরা যদি আমাদের দেহঘড়িটা ঠিক রাখতে পারি, তবে হয়তো এই মারণব্যাধিকে রুখে দেওয়ার চাবিটা আমাদের হাতেই থাকবে!

সূত্র: টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি ও ফিচারিটি ডটকম

আরও পড়ুন