মাত্র ৮৮ ঘণ্টায় ৯০ বছরের পুরোনো মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেম সমাধান করল এআই

এটি গণিত সবচেয়ে বড় সাতটি অমীমাংসিত সমস্যার একটি, যা ‘মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেম’ নামে পরিচিত

সম্প্রতি ওপেনএআই গণিতবিদদের অবাক করে দিয়ে একটি বড় খবর জানিয়েছে। গণিতের জটিল এক সমস্যার পেছনে বিপুল অর্থ খরচের পর তারা দাবি করেছে, বহু বছরের পুরোনো একটি গাণিতিক সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।

প্রায় এক শতাব্দী ধরে এই কঠিন অঙ্কটি মানুষকে বিভ্রান্ত করে রেখেছিল। চ্যাটজিপিটির নির্মাতা এই প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের ১০ হাজার এআই সিস্টেম একযোগে কাজ করে মাত্র ৮৮ ঘণ্টাতেই বিখ্যাত ‘নাভিয়ার-স্টোকস’ সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে। এটি গণিত সবচেয়ে বড় সাতটি অমীমাংসিত সমস্যার একটি, যা ‘মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেম’ নামে পরিচিত।

তবে ওপেনএআইয়ের এই দাবি নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গণিতবিদ ট্রিস্টান বাকমাস্টার জানান, তিনি ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের একজন গবেষক একই সমস্যা নিয়ে গবেষণায় বড় সাফল্যের কাছাকাছি ছিলেন। সেই খবর পাওয়ার পরপরই ওপেনএআই তাড়াহুড়া করে তাদের কাজের গতি বাড়িয়ে এই ঘোষণা দিয়েছে।

আরও পড়ুন

গবেষণার তথ্য চুরি, নাকি নতুন আবিষ্কার

গণিতবিদ ট্রিস্টান বাকমাস্টার আরও একটি আশঙ্কার কথা জানান। তাঁদের অসমাপ্ত কাজটি ওপেনএআইয়ের ‘কোডেক্স’ মডেলে জমা ছিল। কোডেক্স হলো এমন এক এআই, যা দিয়ে কোড লেখা হয়। ফলে ওপেনএআই দলের কাছে সেই গবেষণার তথ্য সহজেই পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ ছিল।

নিজের ওয়েবসাইটে এক লেখায় তিনি বলেন, ওপেনএআইয়ের মডেলটি কীভাবে কাজ করেছে, তা আমার জানা নেই। আমাদের ডেটা তারা ব্যবহার করেছে কি না, তা-ও জানি না। তবে আমি কাউকেই কোনো কিছুর জন্য সরাসরি দোষ দিচ্ছি না।

এক সংবাদ সম্মেলনে ওপেনএআইয়ের গবেষক সেবাস্টিয়ান বুবেক এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি জানান, তারা ওই দুই গবেষকের তথ্য বা সার্ভারের কোনো ডেটা ব্যবহার করেননি।

তবে যুগান্তকারী এই সাফল্যের ঘোষণায় ওপেনএআই স্বীকার করেছে, গণিতের মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেম নিয়ে অন্যরা কাজ করছে শুনেই তারা এই প্রজেক্টে কাজ শুরু করে। এমনকি ওই গবেষকেরা যখন তাদের এআই ব্যবহার করছিলেন, তখন জমা হওয়া ডেটা ওপেনএআইয়ের মডেলকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে থাকতে পারে। এমন সম্ভাবনাও তারা একেবারে উড়িয়ে দেয়নি।

আরও পড়ুন
নাভিয়ার-স্টোকস সমস্যাটি মূলত জানতে চায়, বাতাস বা পানির মতো তরল পদার্থের গতি বোঝাতে যেসব সমীকরণ ব্যবহার করা হয়, তা কোনো বিশেষ অবস্থায় অকার্যকর হয়ে পড়ে কি না

জিটিপি-৬ ও ১০ হাজার এআই এজেন্ট

ওপেনএআই জানিয়েছে, তারা জিটিপি-৬ অ্যাস্ট্রা মডেলের চেয়েও শক্তিশালী এক গোপন এআই সিস্টেম দিয়ে এই নাভিয়ার-স্টোকস অঙ্কের সমাধান করেছে। এই কাজে প্রায় ১০ হাজার এআই এজেন্ট বা স্বয়ংক্রিয় এআই রোবট একসঙ্গে একযোগে কাজ করেছে। আর মাত্র ৮৮ ঘণ্টার মধ্যেই এরা অঙ্কটি মিলিয়ে ফেলেছে।

একটি ব্লগ পোস্টে ওপেনএআইয়ের গবেষকেরা লিখেছেন, ‘আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো বিজ্ঞানীদের কাজ সহজ করা। যাতে পুরো মানবজাতির উপকার হয়। এআই কতটা দ্রুত এগোচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কেমন মডেল আসতে চলেছে, সে সম্পর্কে বিশ্বকে জানানো প্রয়োজন।’

গণিতের দুনিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কতটা দ্রুত প্রভাব ফেলছে, এই ঘটনা তার একটি বড় প্রমাণ। এর আগে মে মাসে ওপেনএআই ৮০ বছরের পুরোনো একটি অঙ্কের সমাধান করার দাবি করে। অন্যদিকে গুগল ডিপমাইন্ডের এআইও গণিতে বড় সাফল্যের খবর দিয়েছে।

গণিতবিদ ট্রিস্টান বাকমাস্টার বলেন, ‘নাভিয়ার-স্টোকস সমস্যার সমাধানটি গত ১২ মাসে আমাদের অর্জিত সমস্ত সাফল্যের এক অসাধারণ সমাপ্তি।’

আরও পড়ুন
চ্যাট জিপিটির নতুন মডেল ‘শুনতেও’পায়
ছবি: রয়টার্স

নাভিয়ার-স্টোকস সমস্যাটি মূলত জানতে চায়, বাতাস বা পানির মতো তরল পদার্থের গতি বোঝাতে যেসব সমীকরণ ব্যবহার করা হয়, তা কোনো বিশেষ অবস্থায় অকার্যকর হয়ে পড়ে কি না। ওপেনএআইয়ের প্রমাণ থেকে দেখা যায়, কোনো কোনো পরিস্থিতিতে এসব সমীকরণ আর কাজ করে না। বিশেষ করে তরলের গতি যখন অসম্ভব রকমের বেড়ে যায়, তখন সমীকরণগুলো ঠিক থাকে কি না। তাদের এই সমাধানটি সঠিক কি না, তা পরীক্ষা করতে জিটিপি-৬ অ্যাস্ট্রা মডেলের প্রায় ১৭ ঘণ্টা সময় লেগেছে।

সহস্রাব্দের সাতটি জটিল অঙ্কের যেকোনো একটি মেলাতে পারলে ‘ক্লে ম্যাথমেটিকস ইনস্টিটিউট’ থেকে ১০ লাখ ডলার পুরস্কার পাওয়া যায়। ওপেনএআই নিজেদের শেয়ারবাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা সফল হলে তাদের বাজারমূল্য হবে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার। তাই বিশাল এই প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারা পুরস্কারের টাকা দাবি করবে না।

গবেষণার তথ্য নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এই বড় আবিষ্কার ওপেনএআইকে নিজেদের ভালো দিকটি তুলে ধরার সুযোগ দিয়েছে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে অনেকেই চিন্তিত ছিলেন। গত জুলাই মাসে নিরাপত্তামূলক পরীক্ষার সময় কিছু এআই এজেন্ট ‘হাগিং ফেস’ নামের একটি সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্মে হ্যাক করে ফেলেছিল।

এই ধরনের ঘটনার পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লাগাম টানার দাবি আবার নতুন করে জোরালো হচ্ছে। গত সপ্তাহে মার্কিন আইনপ্রণেতারা এআইয়ের ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ তৈরি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। যাতে মানুষের চেয়ে শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান কোনো যন্ত্র তৈরি হয়ে বিপদের কারণ না হয়।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
আরও পড়ুন