চাঁদের পাশে শুক্র গ্রহ কেন দেখা গেল

অমাবস্যার পর ঢাকার আকাশে চাঁদের চিকন ফালি। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় তোলা ছবিতে চাঁদের ওপরে দেখা যায় উজ্জ্বল শুক্র গ্রহছবি: শুভ্র কান্তি দাস

সন্ধ্যার আকাশে চিকন একফালি চাঁদ। তার একেবারে পাশে জ্বলজ্বল করছে আরেকটি উজ্জ্বল আলো। দূর থেকে দেখে মনে হতে পারে, চাঁদের পাশে বুঝি একটি তারা ঝুলছে! ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় এমন দৃশ্য দেখেছেন অনেকেই। তবে চাঁদের পাশে যে উজ্জ্বল বস্তুটি দেখা যাচ্ছিল, সেটি কোনো তারা নয়। সেটি ছিল শুক্র গ্রহ। যাকে আমরা শুকতারা নামেও চিনি।

সেদিন চাঁদ ছিল অমাবস্যার মাত্র তিন দিন পরের সরু চাঁদ। তাই চাঁদের সামান্য অংশই সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল ছিল। ঢাকার আকাশে সূর্য ডোবার পর পশ্চিম আকাশে চাঁদ ও শুক্রকে কাছাকাছি দেখা যাচ্ছিল। দুটিই দিগন্তের কাছাকাছি ছিল এবং বেশিক্ষণ দেখা যায়নি। ফলে সন্ধ্যার অল্প সময়ের জন্য আকাশে তৈরি হয়েছিল দারুণ সুন্দর এক দৃশ্য। এই দৃশ্য অনেকেই ছবি তুলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন। ওই সন্ধ্যায় এই ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছিল। কেন এমন দৃশ্য দেখা গেল, তা জানতে এই লেখা।

আরও পড়ুন

শুকতারা আসলে কী

নাম শুকতারা হলেও এটি কোনো তারা নয়। শুকতারা হলো শুক্র গ্রহ। সূর্যের আলো শুক্রের ঘন মেঘের স্তরে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে পৌঁছায়। তাই রাতের আকাশে এটি এত উজ্জ্বল দেখায়। শুক্রকে কখনো সন্ধ্যার আকাশে দেখা যায়, আবার কখনো ভোরের আকাশে। এ কারণেই একে ‘সন্ধ্যাতারা’ বা ‘ভোরের তারা’ও বলা হয়।

তবে শুক্র নিজে আলো তৈরি করে না। সূর্যের আলো প্রতিফলিত করেই এই গ্রহ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

চাঁদ আর শুক্র কি সত্যিই পাশাপাশি ছিল?

আকাশে কাছাকাছি দেখালেও চাঁদ আর শুক্র আসলে একে অপরের খুব কাছে ছিল না। এরা পৃথিবী থেকে অনেক দূরে ভিন্ন ভিন্ন পথে ঘুরছে। পৃথিবী থেকে আমরা যে দিক দিয়ে এদের দেখি, সেই দিকের মিলের কারণেই সেদিন এদের পাশাপাশি মনে হয়েছে।

১৪ সেপ্টেম্বর চাঁদ ও শুক্রের মধ্যে আকাশে দূরত্বও খুব কম ছিল। মাত্র আধা ডিগ্রি কৌণিক দূরত্ব। সেদিন পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব ছিল প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজার কিলোমিটার। আর শুক্র ছিল প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ কিলোমিটার দূরে। এত বিশাল দূরত্বের ব্যবধান সত্ত্বেও পৃথিবী থেকে দেখলে দুটিকে আকাশে মাত্র আধা ডিগ্রির মতো দূরে মনে হচ্ছিল। এই ধরনের ঘটনাকে বলা হয় কনজাংশন বা সংযোগ।

তাহলে ‘চাঁদ শুক্রকে ঢেকে ফেলেছিল’ কথাটা কেন এল?

১৪ সেপ্টেম্বর আরও একটি বিশেষ ঘটনা ঘটেছে। পৃথিবীর কিছু অঞ্চল থেকে চাঁদকে শুক্রের সামনে দিয়ে যেতে দেখা গেছে। ফলে কিছু জায়গা থেকে শুক্র কিছু সময়ের জন্য চাঁদের আড়ালে চলে গেছে। এই ঘটনাকে বলা হয় লুনার অকালটেশন। বাংলায় বলা যায় চাঁদের আড়ালে শুক্রের ঢাকা পড়া।

সহজ করে বললে, ধরো দূরে একটি বাতি জ্বলছে। তার সামনে হাত ধরলে বাতিটি কিছু সময়ের জন্য চোখের আড়ালে চলে যাবে। এখানেও অনেকটা তেমনই ঘটেছে। শুক্র অনেক দূরে, আর চাঁদ পৃথিবীর তুলনায় অনেক কাছে। তাই পৃথিবী থেকে দেখার সময় চাঁদ যখন শুক্রের সামনে চলে আসে, তখন শুক্রকে কিছু সময়ের জন্য ঢাকা পড়তে দেখা যায়।

তবে পৃথিবীর সব জায়গা থেকে এই ঘটনা দেখা যায়নি। কোথাও শুধু চাঁদ ও শুক্রকে পাশাপাশি দেখা গেছে, আবার নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে শুক্রকে চাঁদের আড়ালে যেতে দেখা গেছে। কারণ, পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে আকাশের বস্তুগুলোর অবস্থান সামান্য ভিন্নভাবে দেখা যায়।

আরও পড়ুন
সোমবার সন্ধ্যায় পাবনার গোপালপুরের মাটি সড়ক এলাকায় ৬টা ৫৮ মিনিটে চাঁদ ও শুক্র গ্রহের মেলবন্ধন
ছবি: হাসান মাহমুদ

ঢাকার আকাশে কি দেখা গিয়েছিল

ঢাকাতেও ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার আকাশে চিকন চাঁদ আর উজ্জ্বল শুক্রকে কাছাকাছি দেখা গেছে। সূর্যাস্তের পর পশ্চিম আকাশে দুটিই ছিল দিগন্তের দিকে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা আরও নিচে নেমে যায়। তাই দেখার জন্য সূর্য ডোবার পরপরই পশ্চিম আকাশের দিকে তাকানোই ছিল ভালো সময়।

চাঁদ তখন দেখতে মনে হয়েছিল খুব সরু। অন্যদিকে শুক্র ছিল খুব উজ্জ্বল। এই দুইয়ের বৈপরীত্যই দৃশ্যটিকে আরও সুন্দর করে তুলেছিল। ঢাকার আকাশে এই জোড়ার ছবি নিয়ে বেশ আলাপ উঠেছিল। মানুষ প্রিয়জনকে ছবি পাঠিয়েছে।

এমন দৃশ্য এত সুন্দর লাগে কেন

চাঁদকে আমরা প্রায়ই দেখি। শুক্রকেও বছরের বিভিন্ন সময়ে সন্ধ্যা বা ভোরের আকাশে দেখা যায়। কিন্তু দুটিকে যখন একই সময়ে আকাশের খুব কাছাকাছি দেখা যায়, তখন দৃশ্যটি অন্য রকম হয়ে ওঠে।

তার ওপর সেদিন চাঁদ ছিল একেবারে চিকন একফালি। তার পাশে ছিল উজ্জ্বল শুক্র। মনে হচ্ছিল, কালো আকাশে কেউ যেন সরু একটি রুপালি চাঁদের পাশে ছোট্ট একটি বাতি জ্বেলে দিয়েছে।

আসলে মহাকাশে কোনো অদ্ভুত বিস্ফোরণ বা বিশেষ কোনো আলো তৈরি হয়নি। পৃথিবী, চাঁদ ও শুক্র নিজেদের কক্ষপথে চলতে চলতে এমন একটি অবস্থানে এসেছিল, যেখান থেকে পৃথিবীর মানুষের চোখে তাদের খুব কাছাকাছি মনে হয়েছে।

মহাকাশে তারা হয়তো অনেক দূরে দূরে। কিন্তু পৃথিবী থেকে তাকালে কখনো কখনো মনে হয়, চাঁদ আর শুক্র যেন একই আকাশে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। ১৪ সেপ্টেম্বরের সন্ধ্যায় ঠিক তেমনই একটি সুন্দর দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিলাম আমরা।

আরও পড়ুন