আতশবাজির কারণে যে ক্ষতি হলো
আজ পহেলা জানুয়ারি ২০২৬। বিগত বছরগুলোর তুলনায় সবাই এবার ভেবেছিলেন নতুন বছরের উদযাপনটা একটু ভিন্ন হবে। থার্টি ফার্স্ট নাইটে আতশবাজি ও ফানুস না ওড়ানোর ব্যাপারে এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই বেশ সোচ্চার ছিলেন। তার ওপর দেশ চলছে রাষ্ট্রীয় শোক। সেই সবকিছু উপেক্ষা করেই অনেক জায়গায় আতশবাজি ফোটানো হয়েছে এবারও। কিন্তু এই সাময়িক আনন্দ আমাদের পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ভয়ংকর ঝুঁকি বয়ে আনছে, তা কি আমরা একবারও ভেবে দেখেছি?
আতশবাজির ঝলমলে আলো সারা বিশ্বেই এখন উদযাপনের প্রধান অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। থার্টি ফার্স্ট নাইট, দীপাবলি বা বিশেষ কোনো উৎসব সবখানেই এখন আতশবাজির দেখা মেলে। আকাশভরা সেই রঙিন আলো আর শব্দের কোলাহল আমাদের মনে আনন্দ দিলেও, অবুঝ প্রাণীদের জন্য এটি চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করে। শুধু তাই নয়, আতশবাজি পোড়ানোর পর পরিবেশে এমন কিছু বিষাক্ত উপাদান ও দূষণ রয়ে যায়, যা আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
আতশবাজির তীব্র শব্দ আর ঝলমলে আলো আমাদের আনন্দ দিলেও পশুপাখিদের জন্য তা এক বিভীষিকা। হঠাৎ এই বিকট শব্দে পোষা বিড়াল কুকুর থেকে শুরু করে চিড়িয়াখানার প্রাণীরাও প্রচণ্ড মানসিক চাপে ভোগে। আতশবাজি শুরু হলে বন্য প্রাণীরা ভয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে। গবেষণায় দেখা গেছে, হাজার হাজার পাখি আতঙ্কে একসঙ্গে উড়াল দেয়, এমনকি সমুদ্রের সীল মাছেরাও প্রাণভয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে যায়।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই পালানোর চেষ্টায় প্রাণীদের শরীরের প্রচুর শক্তি নষ্ট হয়। অনেক সময় এরা ভয় পেয়ে নিজেদের চেনা এলাকা ছেড়ে চলে যায়। এতে খাবার খুঁজে পাওয়া বা টিকে থাকা এদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে প্রজনন ঋতুতে পাখিরা আতশবাজির শব্দে ভয় পেয়ে বাসা ছেড়ে পালালে এদের ডিম বা ছানারা অরক্ষিত হয়ে পড়ে এবং মারা যায়।
কখনো কখনো এই আতঙ্ক গণমৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ২০১১ ও ২০১২ সালে নববর্ষের আতশবাজির পর হাজার হাজার পাখি মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। আসলে বেশিরভাগ পাখি রাতে চোখে ভালো দেখে না। তাই আতশবাজির প্রচণ্ড আলো আর শব্দে দিশেহারা হয়ে উড়তে গিয়ে এরা দালান বা গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে প্রাণ হারায়।
আতশবাজি কেবল শব্দদূষণই করে না, এটি আমাদের বাতাস, মাটি ও পানিকেও বিষাক্ত করে তোলে। আতশবাজি পোড়ানোর পর যে ঘন ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়, তাতে ক্ষতিকর গ্যাস ও ধাতব কণা মিশে থাকে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আতশবাজির কারণে কয়েক ঘণ্টা বাতাসের মান এত খারাপ থাকে যে তা হৃদরোগ ও ফুসফুসের রোগীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি এই বিষাক্ত রাসায়নিকগুলো বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে আমাদের নদী ও পুকুরের পানিকেও দূষিত করে।
আতশবাজির আরেকটি বড় বিপদ হলো প্লাস্টিক দূষণ। আতশবাজির প্যাকেটে থাকা প্লাস্টিকগুলো পরে ছোট ছোট টুকরো বা ‘মাইক্রোপ্লাস্টিকে’ পরিণত হয়। বন্য প্রাণীরা অনেক সময় খাবারের সঙ্গে এই বিষাক্ত প্লাস্টিক খেয়ে ফেলে, যা এদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। লন্ডনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, উৎসবের পর পরিবেশে এই মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ, আমাদের কিছুক্ষণের আনন্দ আসলে প্রকৃতি ও স্বাস্থ্যের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি।
উৎসবের আনন্দ ঠিক রেখে ক্ষতি কমানোর উপায়
উৎসবের আমেজ বজায় রেখেও মানুষ ও প্রাণীদের ঝুঁকি কমানোর জন্য এখন বিশ্বজুড়ে আধুনিক কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতাল বা বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থলের আশেপাশে আতশবাজি ফোটানো বন্ধ করা।
সবাই মিলে আলাদাভাবে আতশবাজি না ফুটিয়ে কেবল বড় কোনো খোলা জায়গায় সরকারি বা সামাজিকভাবে একটি প্রদর্শনী করা। এতে পশুপাখির ওপর প্রভাব কম পড়ে এবং আগুন লাগার ঝুঁকি কমে।
বর্তমানে অনেক দেশ আতশবাজির বদলে ‘ড্রোন লাইট শো’ বেছে নিচ্ছে। ড্রোনের প্রদর্শনীতে কোনো বিষাক্ত ধোঁয়া বা কান ফাটানো শব্দ হয় না।
রাসায়নিকের পরিমাণ কমিয়ে তৈরি করা পরিবেশবান্ধব আতশবাজি ব্যবহার করা।
বিজ্ঞানীদের মতে, আতশবাজি দেখতে সুন্দর হলেও এর বিকল্প থাকলে আমাদের অবশ্যই তা গ্রহণ করা উচিত। সম্প্রতি আমেরিকার একটি শহর ড্রোনের মাধ্যমে উৎসব পালন করেছে শুধু একটি বিশেষ প্রজাতির পাখির বাসা রক্ষা করার জন্য। উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আনন্দ ভাগ করে নেওয়া, কাউকে বিপদে ফেলা নয়।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস