প্রতিদিন অন্তত ৬ থেকে ৮ গ্লাস পানি কি খেতেই হবে
আজকাল স্কুল-কলেজে বা রাস্তায় বের হলে একটা দৃশ্য মাঝেমধ্যে চোখে পড়ে। সবার হাতে বিশাল সাইজের সব পানির বোতল। কেউ কেউ আবার বোতলের গায়ে সময় লিখে রাখে, যাতে কোনোভাবেই পানি পানের টার্গেট মিস না হয়! অনেকে মুঠোফোনে অ্যালার্ম দিয়ে রাখে, নানা অ্যাপস ব্যবহার করে। কারণ একটাই, চারপাশের সবাই বলছে দিনে প্রচুর পানি খেতে হবে। পানি বেশি পান করলে নাকি ত্বক ঝকঝকে হবে, ব্রেন কম্পিউটারের মতো ফাস্ট কাজ করবে, খেলাধুলায় ফার্স্ট হওয়া যাবেসহ আরও কত কী! কিন্তু সত্যিই কি প্রতিদিন এত লিটার লিটার পানি পানের দরকার আছে? বেশি পানি পান করলে কি কোনো ক্ষতি হতে পারে?
এই ভীষণ কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়গুলো নিয়ে গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে গবেষণা করছেন তামারা হিউ-বাটলার নামের একজন ফিজিওলজিস্ট। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়েস্টার্ন স্টেটস এন্ডুরেন্স রানের চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণার পরিচালক। এটি পৃথিবীর অন্যতম কঠিন একটি আলট্রাম্যারাথন, যেখানে কখন কতটুকু পানি পান করতে হবে, তার খুব নিখুঁত হিসাব রাখতে হয়। তিনি আমাদের জানিয়েছেন, পানি পান নিয়ে মানুষের চারটি বড় ভুল ধারণার কথা। চলো, একে একে সেই ভুলগুলো ভেঙে ফেলা যাক!
ভুল ধারণা ১: প্রতিদিন অন্তত ৬ থেকে ৮ গ্লাস পানি পান করতেই হবে
অনেকেই বলে, সুস্থ থাকতে হলে দিনে অন্তত দুই লিটার বা আট গ্লাস পানি পান করতে হবে। কিন্তু তামারা বলছেন, এই নিয়মের আসলে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সবার পানির চাহিদা এক নয়। এমনকি একজন মানুষেরও প্রতিদিন একই পরিমাণ পানির দরকার হয় না।
একটু যুক্তি দিয়ে ভেবে দেখো। তোমার ওজন যদি হয় ৪৫ কেজি এবং তুমি যদি সারা দিন এসির নিচে বসে গল্পের বই পড়ো, তবে তোমার পানির চাহিদা নিশ্চয়ই একজন ১০০ কেজি ওজনের বিশালদেহী রাগবি খেলোয়াড়ের সমান হবে না! যে খেলোয়াড়টি সারা দিন কড়া রোদে দৌড়াদৌড়ি করে ঘাম ঝরাচ্ছে, তার স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি পানি লাগবে।
তাহলে তুমি বুঝবে কীভাবে তোমার কতটুকু পানি দরকার? তোমার শরীর সারা দিনে ঠিক যতটুকু পানি হারাচ্ছে, তোমার ঠিক ততটুকুই খাওয়া উচিত। এই চমৎকার হিসাবটা কিন্তু তোমার মস্তিষ্ক নিজে থেকেই করে ফেলে! ব্রেন সব সময় তোমার রক্ত পরীক্ষা করে দেখে, সেখানে পানির অভাব আছে কি না। পানির অভাব হলেই সে তোমাকে তৃষ্ণা বা পিপাসার অনুভূতি দেয়। ফলে তুমি পানি পান করো এবং পানিশূন্যতার হাত থেকে বেঁচে যাও।
অনেকে আবার একটা অদ্ভুত কথা বলেন! তাঁরা বলেন, তোমার যখন পিপাসা পায়, তখন নাকি অনেক দেরি হয়ে গেছে, শরীর নাকি ততক্ষণে শুকিয়ে কাঠ! তামারা বলেছেন, এই ধারণাটি একেবারেই ভুল। পিপাসা পাওয়ার মানে, তোমার শরীরে ঠিক এই মুহূর্তে একটু পানি দরকার, ব্যস। তামারা নিজেও কেবল পিপাসা পেলেই পানি পান করেন। সাধারণ হিসাব হলো, পৃথিবীর ৯৮ শতাংশ মানুষের জন্যই শুধু পিপাসা পেলে পানি পানের এই নিয়মটা দারুণ কাজ করে!
ভুল ধারণা ২: কফির চেয়ে সাধারণ পানি বেশি উপকারী
অনেকে মনে করেন, চা বা কফি পান করলে নাকি শরীর শুকিয়ে যায়। কারণ, কফিকে বলা হয় ডাইইউরেটিক বা এমন জিনিস যা খেলে বেশি প্রস্রাব হয়। কিন্তু তামারা বলছেন, এটি একটি মস্ত বড় ভুল ধারণা। কফি আসলে কোনো ডাইইউরেটিক নয়। কফিতে থাকা ক্যাফেইনের কারণে তোমার প্রস্রাব পায় না, বরং এক কাপ কফিতে যেটুকু সাধারণ পানি মেশানো থাকে, সেটার কারণেই প্রস্রাব পায়। তবে অ্যালকোহলের বিষয়টা আলাদা, সেটি সত্যিই ডাইইউরেটিক।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার কী জানো? তামারা নিজে সাধারণ পানি পান করতেই পছন্দ করেন না! তিনি সকালে দুই কাপ কফি পান করেন। সারা দিন স্যুপ, ফলমূল, শাকসবজি আর স্মুদি খান। এগুলোর সব কটির মধ্যেই প্রচুর পানি থাকে। তরমুজ, শসা বা কমলালেবুর মতো ফলে তো পানির ছড়াছড়ি। তিনি শুধু তখনই গ্লাসে ঢেলে সাধারণ পানি পান করেন, যখন তিনি বাড়ির বাইরে কড়া রোদে থাকেন। তাঁর প্রচণ্ড পিপাসা পায় এবং হাতের কাছে খাওয়ার মতো আর কোনো রসালো ফল বা তরল থাকে না। অর্থাৎ তুমি সারা দিন যেসব ফল বা খাবার খাচ্ছ, সেখান থেকেও তোমার শরীর তার প্রয়োজনীয় পানি পেয়ে যাচ্ছে।
ভুল ধারণা ৩: পিপাসা না পেলেও বেশি পানি পান করলে অনেক উপকার
তোমার একটুও পিপাসা নেই, কিন্তু জোর করে গাদা গাদা পানি খাচ্ছ! ভাবছ, এতে ত্বক সুন্দর হবে, পেট পরিষ্কার হবে বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়বে? তামারা বলছেন, বিজ্ঞানে এর কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। পিপাসা না থাকা সত্ত্বেও জোর করে পানি পান করলে শুধু একটা উপকারই হতে পারে, তোমার পেট ভরা থাকবে, ফলে তুমি খাবার কম খাবে এবং হয়তো তোমার ওজন একটু কমবে। এর বাইরে আসলে তেমন কোনো লাভ নেই।
তোমার শরীর খুব কঠোরভাবে তার ভেতরের পানির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে। তুমি যদি একটু বেশি পানি পান করেও ফেলো, শরীর প্রস্রাবের মাধ্যমে সেটা বের করে দেবে। তবে অতিরিক্ত পানি পান কিন্তু মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়, উল্টো মারাত্মক বিপদের কারণ!
তামারা পানি নিয়ে গবেষণা শুরুই করেছিলেন একটি মর্মান্তিক ঘটনার পর। ম্যারাথনে দৌড়ানোর সময় অতিরিক্ত পানি পানের কারণে দুজন অ্যাথলেটের মৃত্যু হয়েছিল! তুমি যদি খুব কম সময়ে মাত্রাতিরিক্ত পানি খেয়ে ফেলো, তবে তোমার রক্তের সোডিয়াম অতিরিক্ত পাতলা হয়ে যায়। এই অবস্থাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে হাইপোনাট্রেমিয়া। এর ফলে মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব এবং পেট ফাঁপার মতো সমস্যা হতে পারে। আর পরিস্থিতি খুব খারাপ হলে তোমার মস্তিষ্ক ফুলে যেতে পারে। মাথার খুলির ভেতর জায়গা তো নির্দিষ্ট, তাই ব্রেন ফুলে গেলে একসময় মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে! হিসাব করে দেখা গেছে, এক ঘণ্টার মধ্যে ৩ থেকে ৪ লিটার পানি খেয়ে ফেললে এই হাইপোনাট্রেমিয়ার লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
ভুল ধারণা ৪: ব্যায়ামের সময় স্পোর্টস ড্রিংকস পান করতেই হবে
টিভি বিজ্ঞাপনে আমরা প্রায়ই দেখি, খেলোয়াড়েরা ঘাম ঝরাচ্ছেন আর রঙিন সব স্পোর্টস ড্রিংকস ঢকঢক করে গিলছেন। অনেকেই মনে করেন, একটু দৌড়ঝাঁপ বা ব্যায়াম করলেই বোধ হয় স্পোর্টস ড্রিংকস পান করতে হবে। ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে সোডিয়াম, পটাশিয়ামের মতো যেসব ইলেকট্রোলাইট বেরিয়ে যায়, এই পানীয়গুলো নাকি সেগুলো পূরণ করে দেয়।
কিন্তু বেশির ভাগ গবেষণাই বলছে, তোমার এই বাড়তি ইলেকট্রোলাইটের কোনো দরকারই নেই! এগুলো শুধু তাঁদেরই লাগে, যাঁরা চরম মাত্রার কোনো ব্যায়াম করছেন। যেমন কেউ হয়তো প্রচণ্ড গরম আবহাওয়ার মধ্যে একটানা ১৭ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে দৌড়াচ্ছেন! তুমি যদি দিনে দুই, তিন বা চার ঘণ্টাও সাধারণ ব্যায়াম বা খেলাধুলা করো, তবে ঘামের সঙ্গে যেটুকু ইলেকট্রোলাইট বের হয়, তা তোমার রোজকার খাবার থেকেই খুব সহজে পূরণ হয়ে যায়। স্পোর্টস ড্রিংকসে কার্বোহাইড্রেটও থাকে, যা চরম ব্যায়ামের সময় শরীরকে শক্তি জোগাতে কাজে লাগে। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের আসলে এসবের কোনো প্রয়োজনই নেই।
তাই অযথাই বিশাল সাইজের বোতল নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর কোনো দরকার নেই। তোমার শরীরটাই হলো সবচেয়ে চমৎকার ও স্মার্ট মেশিন। যখন পিপাসা পাবে, তখন তৃপ্তি করে পানি পান করবে। আর যখন পিপাসা পাবে না, তখন শুধু শুধু অন্যের কথা শুনে জোর করে পানি পানের কোনো মানেই হয় না। প্রকৃতির এই সহজ নিয়মটা মেনে চললেই তুমি থাকবে একদম চনমনে আর সুস্থ!