প্রজাপতি কমে যাওয়ার সঙ্গে তাপমাত্রার কী সম্পর্ক
বাসার বাগান কিংবা গাছে ভরা ব্যালকনিতে হঠাৎ নতুন কোনো প্রজাপতি দেখলে মন আনন্দে ভরে ওঠার কথা। তবে সেই প্রজাপতিটি আসার আসল কারণ যদি হয় তীব্র গরম, তবে কিন্তু বিষয়টি বেশ চিন্তার। হয়তো এর আগের থাকার জায়গাটি অতিরিক্ত উষ্ণ, শুষ্ক বা নষ্ট হয়ে গেছে। তাই বাধ্য হয়েই এটা নতুন আশ্রয়ের খোঁজে ব্যালকনিতে চলে এসেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে অনেক প্রজাতির প্রজাপতি এভাবে নতুন বাসস্থানের খোঁজে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে। প্রাণিবিজ্ঞানীরা একে বলছেন প্রজাতির বিচরণক্ষেত্র পরিবর্তন। তাপমাত্রা, বৃষ্টি ও পরিবেশ বদলানোর কারণে প্রজাপতিরা এখন অনেক দূর পাড়ি দিচ্ছে। এমনকি টিকে থাকার জন্য এরা উঁচু পাহাড়েও উঠে যাচ্ছে।
সম্প্রতি করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিচিত প্রজাতির প্রজাপতিগুলোর মধ্যে প্রতি ১০টির মধ্যে ১টি ইতিমধ্যে নিজের পুরোনো বাসস্থান বদলে ফেলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এরা শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে? আর কেনই–বা যাচ্ছে?
প্রজাপতিদের স্থান বদল বিজ্ঞানীরা কীভাবে জানলেন
বিজ্ঞানীরা বিশাল এক গবেষণার মাধ্যমে প্রজাপতিদের এই স্থান পরিবর্তনের কথা জানতে পেরেছেন। এই কাজে ৫৬৫টি গবেষণা ও ৬৮ জন বিশেষজ্ঞের মতামত বিশ্লেষণ করা হয়। সব মিলিয়ে ১০৫টি দেশের ১ হাজার ৭৫৮টি প্রজাতির প্রজাপতির ৬ হাজার ১৮০টির বেশি তথ্য জড়ো করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, পরিচিত প্রজাতির প্রায় ৮০ শতাংশ প্রজাপতিই নিজেদের থাকার জায়গা উত্তর-দক্ষিণ কিংবা পূর্ব-পশ্চিমে ছড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে ২৭ শতাংশ প্রজাতির বিচরণক্ষেত্র আগের চেয়ে ছোট হয়ে এসেছে। আবার ২২ শতাংশ প্রজাতির প্রজাপতি পাহাড়ে ওপরে বা নিচের দিকে সরে গেছে। এমনকি অনেক প্রজাপতির ক্ষেত্রে এসব ঘটনার একাধিক পরিবর্তন একসঙ্গে ঘটতে দেখা গেছে।
শুধু নতুন জায়গার উপযুক্ত তাপমাত্রা পেলেই কিন্তু প্রজাপতিরা টিকে থাকতে পারে না। প্রজাপতির শুঁয়াপোকাগুলো নির্দিষ্ট কিছু গাছের পাতার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। আবার পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতির দরকার হয় ফুলের মধু, নিরাপদ আশ্রয় আর ডিম পাড়ার সঠিক পরিবেশ। এর পাশাপাশি প্রজাপতিদের যোগাযোগের জন্য এক জায়গার সঙ্গে অন্য জায়গার পরিবেশের সংযোগ থাকতে হয়। যেন এরা সহজে এক বন থেকে অন্য বনে যাতায়াত ও বংশবৃদ্ধি করতে পারে।
পরিবর্তন দ্রুত ঘটতে পারে
কিছু প্রজাতির দিকে তাকালে বোঝা যায় বাসস্থানের এই পরিবর্তন কতটা দ্রুত হতে পারে। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রজাপতি ‘টনি কস্টার’ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে একেবারে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। ব্রাজিলের ‘গোডার্টিয়ানা বাইসেস’ নামের প্রজাপতিও জলবায়ু উষ্ণতার কারণে রিও ডি জেনিরো থেকে সাও পাওলো পর্যন্ত নতুন বাসস্থান গড়ে তুলেছে।
তবে সব প্রজাপতির চিত্র কিন্তু এক নয়। যুক্তরাজ্যে গত ১৫০ বছরে ‘স্মল ব্লু’ প্রজাপতি এর ৪০ শতাংশ থাকার জায়গা হারিয়েছে। জার্মানির জলাভূমি শুকিয়ে ফেলায় জায়গা হারিয়েছে ‘ক্র্যানবেরি ফ্রিটিলারি’। আবার রোমানিয়ায় কৃষিকাজ বাড়ায় ‘ড্যানিউব ক্লাউডেড ইয়েলো’ প্রজাপতির বিচরণক্ষেত্র অনেকটাই কমে গেছে।
এমনকি পাহাড়ে এদের স্থান পরিবর্তনও কিন্তু একই নিয়মে ঘটে না। মেক্সিকোতে ১৯৮৮ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে ‘পেইন্টেড লেডি’ প্রজাপতি প্রতিবছর প্রায় ৮৩ মিটার হারে পাহাড়ের ওপরের দিকে উঠে গেছে। অন্যদিকে একই সময়ে ‘কুইন বাটারফ্লাই’ প্রতিবছর প্রায় ৩২ মিটার হারে পাহাড়ের নিচের দিকে নেমে এসেছে।
শ্রীলঙ্কায় ‘চকলেট অ্যালবাট্রস’ প্রজাপতির বাস করার জায়গা কখনো বেড়েছে, আবার কখনো কমেছে। তবে তাইওয়ানে এই প্রজাপতি উঁচু পাহাড় থেকে নিচে নেমে এসেছে। এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, পরিবর্তনগুলো কেবল মেরু অঞ্চলের দিকে সরে যাওয়ার মতো সহজ কোনো বিষয় নয়।
এই পরিবর্তনের কারণ কী
বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তন আর আবহাওয়ার চরম রূপ প্রজাপতিদের স্থান বদলের প্রধান কারণ। তবে জলবায়ু একমাত্র কারণ নয়। কৃষিকাজ, বন উজাড়, নগরায়ণ আর প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের কারণেও প্রজাপতির প্রজনন কেন্দ্রগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মানুষের এসব কাজের ফলে উদ্ভিদের ক্ষতি হচ্ছে ও প্রজাপতিদের বিশাল বনভূমি ছোট ছোট খণ্ডে ভাগ হয়ে পড়ছে, যা এদের টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়।
ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় অনেক আগে থেকেই স্বেচ্ছাসেবক ও শখের বিজ্ঞানীরা প্রজাপতি পর্যবেক্ষণ করে আসছেন। তথ্যে দেখা গেছে, ইউরোপের কিছু দেশে অর্ধেকের বেশি প্রজাতির প্রজাপতি এদের বিচরণক্ষেত্র বদলে ফেলেছে। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশে ১০ শতাংশ প্রজাতি নিয়েও এমন কোনো তথ্য নেই।
আমাজন অববাহিকা, মধ্য আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও নিউ গিনির মতো যেসব অঞ্চলে জীববৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি, সেখানকার প্রজাপতি সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানি। এসব অঞ্চলের প্রজাপতিরা বর্তমানে সহনসীমার শেষ প্রান্তে অবস্থান করছে। তাই সামান্য তাপমাত্রা বাড়লেও এদের বাসস্থান বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে উঠতে পারে।
এই প্রজাতিগুলোকে রক্ষা করতে হলে সেসব দেশে বিশেষজ্ঞ ও স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে প্রজাপতি পর্যবেক্ষক দলভিত্তিক উদ্যোগ গড়ে তোলা জরুরি।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
মানুষের কেন এই বিষয়ে ভাবা উচিত? কারণ, প্রজাপতি আমাদের প্রকৃতির এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতিরা ফুল থেকে ফুলে ঘুরে পরাগায়নে সাহায্য করে। আবার এদের শুঁয়াপোকাগুলো পাখি, মাকড়সা ও অন্যান্য পোকামাকড়ের খাবার হিসেবে কাজ করে। ফলে পরিবেশ থেকে প্রজাপতি হারিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো সেখানকার গাছপালা, তৃণভূমি বা বনভূমিও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য এই বিষয় জানা খুবই জরুরি। অতীতের মানচিত্র দেখে কোথায় কোন প্রজাতি বাস করত, সেই অনুযায়ী সংরক্ষিত এলাকা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু প্রজাপতি বা অন্যান্য প্রাণী যদি নিজেদের স্থান বদলে ফেলে তবে সেই পুরোনো মানচিত্র দিয়ে আর কাজ হবে না।
সহজ কথা হলো সংরক্ষণ শুধু পুরোনো বাসস্থানের মধ্যেই আটকে রাখলে চলবে না। প্রাণীরা নতুন যেসব জায়গায় যাচ্ছে এবং যেসব পথ ধরে যাতায়াত করছে, সেগুলোকেও সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে।