প্রাইমারি স্কুলেই যেভাবে বড়বেলার বন্ধু খুঁজে পাওয়া যায়

সন্তানকে বলুন, স্কুলে বন্ধু তৈরি হয়ছবি: প্রথম আলো

প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় আমরা বন্ধু বানাতাম খুব অদ্ভুত ও সহজ উপায়ে। ধরো, ক্লাসের নতুন ছেলেটার জ্যামিতি বক্সটা দারুণ। ব্যস, ওটাই বন্ধু হওয়ার জন্য যথেষ্ট! অথবা টিফিন পিরিয়ডে মাঠে দৌড়াতে গিয়ে দুজনেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে হাঁটু ছিলে ফেললে, তারপর একে অপরের দিকে তাকিয়ে খিকখিক করে হাসলে। পরদিন থেকেই তোমরা বেস্ট ফ্রেন্ড। ওই বয়সে পড়ে গেলে মানসম্মান যাওয়ার ভয় থাকে না।

কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থাৎ তুমি যত বড় হচ্ছো, এই সহজ সমীকরণটা ততই জটিল হতে থাকে। ধরো, তুমি কোনো গিটার ক্লাসে বা কোচিং সেন্টারে ছয় মাস ধরে যাচ্ছ। তোমার পাশের সিটে বসা মানুষটার কলমের কালি ফুরিয়ে গেলে তুমিই তাকে নিজেরটা দাও। সে নতুন জুতো পরলে তুমি ঠিকই খেয়াল করো। অথচ ছয় মাসে তোমাদের মধ্যে হাই-হ্যালো ছাড়া আর কোনো কথাই হয়নি!

কেন এমন হয়? কীভাবে এই অস্বস্তিকর নীরবতা ভেঙে নতুন বন্ধু বানানো যায়? মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর সমাধান লুকিয়ে আছে সেই প্রাইমারি স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে! চলো, ব্যাপারটা একটু গভীরে গিয়ে বোঝা যাক।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

বড় হয়ে বন্ধু বানানো এত কঠিন কেন

দ্য ফ্রেন্ডশিপ ফর্মুলা বইয়ের লেখক ও মনোবিজ্ঞানী কাইলার শুমওয়ের মতে, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা বন্ধু বানানোর প্রক্রিয়াটাকে নিজেরাই অনেক কঠিন করে ফেলি। ছোটবেলায় আমাদের জীবনটা একটা রুটিনে বাঁধা থাকে। সেখানে প্রতিদিন একই বয়সের, একই ক্লাসের মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়াটা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বড় হলে সেই সুযোগ কমতে থাকে। আমরা নিজেদের খোলসের ভেতর ঢুকে যাই। কেউ পাত্তা না দেওয়ার ভয়ে নতুন করে কাউকে বন্ধু বানাতে এগিয়ে যাই না।

অথচ মানুষের সঙ্গে মানুষের এই সম্পর্কটা আমাদের বেঁচে থাকার জন্যই জরুরি। ১৯৭৯ সালে প্রায় ৭ হাজার মানুষের ওপর করা একটি যুগান্তকারী গবেষণায় দেখা যায়, যাদের সামাজিক সম্পর্ক বা বন্ধুমহল ছোট, তাদের মৃত্যুঝুঁকি অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি। এমনকি তারা শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ থাকলেও মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে! এর পর থেকে যত গবেষণা হয়েছে, সবই এই একই কথা প্রমাণ করেছে।

কিন্তু শৈশবের কী সেই কৌশল, যা দিয়ে তুমি খুব সহজেই নতুন বন্ধু বানাতে পারো? উত্তরটা হলো, একই টেবিলে বসা।

আক্ষরিক অর্থে তোমাকে প্রতিদিন একই লাঞ্চ টেবিলে বসতে হবে না। একে বলা যায় লাঞ্চ টেবিল থিওরি। নিয়মটা খুব সহজ। যেকোনো একটা জায়গা বেছে নাও। সেটা হতে পারে কোনো বই পড়ার আড্ডা, খেলাধুলার ক্লাব, আর্ট স্কুল বা ভলান্টিয়ারিং গ্রুপ। সেখানে নিয়মিত যাও। চারপাশের মানুষগুলোকে খেয়াল করো এবং নিজের মনের ভাবটা একে অপরের সঙ্গে প্রকাশ করো।

শুমওয়ে বলেন, ছোটরা তাদের সঙ্গেই বন্ধু পাতিয়ে ফেলে, যাদের পাশে তারা প্রতিদিন বসে। এখানে মূলত তিনটি জিনিস কাজ করে—জড়িত হওয়া, একসঙ্গে সময় কাটানো এবং আবেগের আদান-প্রদান। একই জায়গায় বারবার গেলে প্রথম দুটো কাজ আপনা–আপনিই হয়ে যায়।

বিজ্ঞানও ঠিক একই কথা বলছে। ক্যানসাস ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দুজন অচেনা মানুষকে মোটামুটি বন্ধু হতে অন্তত ৫০ ঘণ্টা একসঙ্গে কাটাতে হয়। ভালো বন্ধু হতে লাগে ৯০ ঘণ্টা আর একদম ক্লোজ ফ্রেন্ড হতে লাগে ২০০ ঘণ্টার বেশি সময়। হিসাব করে দেখলে, এই ৯০ ঘণ্টা হলো প্রাইমারি স্কুলের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার টিফিন পিরিয়ডের সমান!

তবে এখানে একটা ছোট শর্ত আছে। স্কুল বা কাজের জায়গায় বাধ্য হয়ে একসঙ্গে বসে থাকলে কিন্তু কাজ হবে না। যে সময়টুকু তুমি নিজের ইচ্ছায় আনন্দের সঙ্গে কাটাচ্ছ, সেটাই আসলে বন্ধুত্ব তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

আরও পড়ুন
বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা উপলক্ষে শারীরিক কসরতের মহড়া দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা

নিজের খোলস ছেড়ে বের হতে হবে

একই টেবিলে বসলেই তো আর হবে না, কাউকে না কাউকে তো কথা শুরু করতেই হবে! আর এখানেই আমরা সবচেয়ে বেশি ভয় পাই। মাউন্ট সিনাইয়ের আইকান স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক অ্যালান রোজানস্কির মতে, ছোটরা খুব সহজেই নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু বড়রা ভাবে, গায়ে পড়ে কথা বলতে গেলে যদি সম্মান কমে যায়! অথচ একটু দুর্বলতা প্রকাশ করলে বা খোলস ছেড়ে বের হলেই হয়তো তোমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে যাবে।

মনোবিজ্ঞানী শুমওয়ের নিজের জীবনের একটা দারুণ উদাহরণ আছে। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় ড্যান নামের এক সহপাঠীর সঙ্গে তিনি লাঞ্চ করতেন। কিন্তু কিছুদিন পর তাঁদের মধ্যে কথার রসদ ফুরিয়ে গেল। দুজনের মধ্যে নেমে এল অদ্ভুত এক অস্বস্তিকর নীরবতা। শুমওয়ে তখন সোজা বলে বসলেন, ‘ড্যান, আমি আসলে জানি না কীভাবে নতুন বন্ধু বানাতে হয়। আমার খুব বেশি বন্ধু নেই। কিন্তু মানুষ হিসেবে তুমি দারুণ, আর আমি তোমার বন্ধু হতে চাই।’

ড্যান শুনে মুচকি হেসে বলল, ‘আমি তো ভাবতে শুরু করেছিলাম তুমি আমাকে পছন্দই করো না!’ সেই ড্যান এখন শুমওয়ের বেস্ট ফ্রেন্ড!

মস্তিষ্কের ভেতরে কী ঘটে

তুমি যখন বারবার একই জায়গায় যাও এবং একই মানুষদের দেখো, তখন তোমার মস্তিষ্ক তাদের অপরিচিত ও সম্ভাব্য বিপজ্জনক তালিকা থেকে সরিয়ে পরিচিত ও নিরাপদ তালিকায় রাখে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে মিয়ার-এক্সপোজার ইফেক্ট। অর্থাৎ কোনো কিছু বারবার দেখলে তার প্রতি আমাদের এমনিতেই একটা মায়া জন্মে যায়।

এর সঙ্গে যখন তোমরা একসঙ্গে কোনো মজার কাজ করো বা হাসাহাসি করো, তখন মস্তিষ্কে অক্সিটোসিন নামের হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোনই মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও ভরসা তৈরি করে।

আরও পড়ুন

বন্ধু বানানোর সিক্রেট রেসিপি

বিশেষজ্ঞরা এই থিওরি কাজে লাগানোর জন্য দারুণ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। সামাজিক মেলামেশা অনেক সময় ব্রকলি খাওয়ার মতো বিরক্তিকর লাগতে পারে! তাই এমন জায়গা বেছে নাও, যেটা তুমি এমনিতেই পছন্দ করো। যদি বই পড়তে ভালোবাসো, তবে বুক ক্লাবে যাও। যদি বন্ধু না–ও জোটে, অন্তত নিজের পছন্দের কাজটা তো করা হলো! আবার কোথাও গিয়ে শুধু পরিচিতদের জন্যই জায়গা আটকে রেখো না। নতুন কেউ এসে বসতে চাইলে তাকে স্বাগত জানাও। ‘আজ বড্ড গরম পড়েছে, তাই না?’—এমন কথার চেয়ে একটু গভীরে কথা বলা ভালো। যেমন জিজ্ঞেস করতে পারো, ‘এই সপ্তাহে নতুন কী মুভি বা সিরিজ দেখলে?’

শুধু তোমার যাকে পছন্দ তাকেই নয়, আশপাশের সবাইকে অন্তত হাসিমুখে একটা হ্যালো বলার অভ্যাস করো। একবার গিয়েই যদি দেখো কেউ তেমন পাত্তা দিচ্ছে না, তবেই হাল ছেড়ো না। শুমওয়ের নিয়ম হলো, অন্তত তিনবার চেষ্টা করো। তৃতীয়বারেও যদি বুঝতে পারো, অপর দিকের মানুষটা আগ্রহী নয়, তবেই পিছু হটো।

যেসব ভুল একেবারেই করা যাবে না

চারপাশে এত মানুষ, আর তুমি যদি মোবাইল স্ক্রিনে মুখ গুঁজে রাখো, তবে তো কেউ তোমার সঙ্গে কথা বলতে আসবে না। তাই ফোন নামের যন্ত্রটাকে পকেটে চালান করো। ডা. রোজানস্কি বলেছেন, ‘অন্যকে নিয়ে বদনাম করে হয়তো খুব দ্রুত সাময়িক একটা আড্ডা জমানো যায়, কিন্তু এতে কেউ কাউকে ভেতর থেকে বিশ্বাস করতে পারে না।’ তাই অন্যকে নিয়ে সমালোচনা না করে স্বাভাবিক কথাবার্তা বলতে পারো। নিজেকে নিখুঁত প্রমাণ করার কোনো দরকার নেই। তুমি যেমন, ঠিক তেমনই থাকো। নিখুঁত মানুষদের সবাই সমীহ করে, বন্ধু বানায় না।

কোথায় কাজে লাগাবে এই কৌশল

এমন জায়গা বেছে নাও, যেখানে একই মানুষদের বারবার দেখার সুযোগ আছে। যেমন কোনো ভলান্টিয়ারিং সংগঠন, আর্ট বা মিউজিক ক্লাস, মহল্লার খেলার মাঠ বা লাইব্রেরি। কিন্তু এমন জায়গায় যেয়ো না, যেখানে একবারের বেশি আর দেখা হওয়ার সুযোগ নেই। যেমন অপরিচিত কারও বিয়ের দাওয়াত বা কোনো কনসার্টে গিয়ে এই কৌশল প্রয়োগ করলে ভালো কাজ করবে না। কারণ ওই যে, বন্ধুত্বের ম্যাজিকটা তো লুকিয়ে আছে বারবার দেখা হওয়ার মধ্যে!

তাই কাউকে বন্ধু বানাতে চাইলে মোবাইলে মুখ গুঁজে না থেকে সাহস করে বলে ফেলো, ‘এক মাস ধরে আমরা পাশাপাশি বসছি, অথচ নামটাই জানা হলো না! আমি অমুক...।’

সবচেয়ে খারাপ কী হতে পারে? হয়তো তিন সেকেন্ডের জন্য একটু অস্বস্তি হবে। আর সবচেয়ে ভালো কী হতে পারে? হয়তো তুমি সারা জীবনের জন্য দারুণ একটা বন্ধু পেয়ে যাবে!

আরও পড়ুন