কম্বোডিয়ার গুহায় পাওয়া গেছে নতুন জাতের পিট ভাইপার সাপ
কম্বোডিয়ার কার্স্ট অঞ্চলে আছে প্রাচীন চুনাপাথরের পাহাড়। আছে চোখের আড়ালে থাকা গুহা। সম্প্রতি এ অঞ্চলে আবিষ্কৃত হয়েছে ১১টি নতুন জাতের প্রাণী। পাওয়া গেছে পিট ভাইপার সাপ। এই সাপের এখনো আনুষ্ঠানিক নাম ঠিক হয়নি। তবে পিট শব্দটি এসেছে সাপের মাথার তাপ সংবেদনশীল অঙ্গ থেকে। মাথার এই অঙ্গ ব্যবহার করে পিট ভাইপার উষ্ণ রক্তের শিকার শনাক্ত ও অনুসরণ করে।
কম্বোডিয়ার বেশির ভাগ অনাবিষ্কৃত চুনাপাথরের গুহাগুলো হাজার হাজার মাইলজুড়ে বিস্তৃত। এগুলো অসংখ্য অজানা প্রজাতির আবাসস্থল। এখানে এমন সব বাস্তুতন্ত্র আছে, যেখানে এমন সব প্রাণীর আবাস, যাদের পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না।
কম্বোডিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বাত্তামবাং অঞ্চলের গুহাগুলোয় পরিচালিত হয়েছে এক নতুন জরিপে। বিজ্ঞানীরা এমন একাধিক প্রাণীর সন্ধান পেয়েছেন, যেগুলো একেবারেই নতুন। এর মধ্যে আছে একটি নীলাভ পিট ভাইপার, একটি উড়ন্ত সাপ, কয়েকটি গেকো, দুটি ক্ষুদ্র শামুক এবং দুটি মিলিপিড বা কেন্নো পোকা।
ভাইপার সাপ এবং নতুন আবিষ্কৃত হওয়া তিনটি গেকো প্রজাতির আনুষ্ঠানিক নামকরণ ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের কাজ চলছে। অন্য আবিষ্কারগুলো এরই মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই জীববৈচিত্র্য জরিপে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ১০টি পাহাড়ের ৬৪টি গুহা অনুসন্ধান করা হয়। এর ফলাফল সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা ফনা অ্যান্ড ফ্লোরা কম্বোডিয়ার পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও মাঠপর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মিলে এই গবেষণা পরিচালনা করেছে।
পাওয়া গেছে একটি উড়ন্ত সাপ
বিবর্তন জীববিজ্ঞানী লি গ্রিসমার এই গবেষণায় কাজ করেছেন। তিনি সিএনএনকে বলেছেন, ‘আমরা এই বিচ্ছিন্ন জায়গাগুলোয় গিয়ে প্রজাতিগুলোর ডিএনএ বিশ্লেষণ করেছি। এখানে কিছু প্রাণী দেখতে একই রকম, কিছু আলাদা।’
সাম্প্রতিক এই জরিপে এ অঞ্চলে বিশ্বব্যাপী হুমকির মুখে থাকা কিছু প্রাণীরও দেখা মিলেছে। যেমন সুন্ডা প্যাঙ্গোলিন, সবুজ ময়ূর, লম্বা লেজযুক্ত বানর এবং নর্দার্ন পিগ-টেইলড ম্যাকাক।
অনুসন্ধান আরও বাকি
গবেষকদের জন্য প্রাণী অনুসন্ধানের মজার অংশ ঘটেছে রাতে। যখন সাপ ও গেকোর মতো প্রাণীরা সবচেয়ে সক্রিয় থাকে। রাতে এদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হতো।
গবেষক দলটি সূর্যাস্তের পর বেরিয়ে পড়তেন। টর্চ হাতে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ‘ধারালো পাথুরে ভূখণ্ড’ পাড়ি দিতেন। তাঁরা প্রতিটি ফাটল, গুহা, পাথর, গাছের ডাল, গাছপালা—সব জায়গায় খুঁজে দেখতেন।
এ অঞ্চলের কিছু গুহায় প্রায় ১০ লাখ পর্যন্ত বাদুড় বাস করে। তবে স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে গবেষক দল বড় বাদুড় কলোনিযুক্ত গুহাগুলোয় প্রবেশ করেনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কম্বোডিয়ার প্রায় ৯ শতাংশ ভূমি এই কার্স্ট ভূপ্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত, যা প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এর বড় একটি অংশ এখনো আমাদের কাছে অজানা।
এই অনুসন্ধানে ব্যানান অঞ্চলের একটি কার্স্ট পাহাড়ে ১৪টি নতুন গুহা নথিভুক্ত করা হয়েছে। যেগুলো আগে কখনো জরিপ করা হয়নি। এখানে আরও অনেক অনুসন্ধান বাকি আছে।
এই গুহাগুলোয় শুধু প্রাণীর বসবাস না। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো পূজা, ধ্যান বা অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরাও এখানে আসেন।
তবে এসব কার্স্ট বাসস্থান এখন হুমকির মুখে। অপরিকল্পিতভাবে সিমেন্ট তৈরির জন্য চুনাপাথর উত্তোলন, অতিরিক্ত পর্যটন, বন্য প্রাণী শিকার, বন উজাড় এবং দাবানল—সব মিলিয়ে এই পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ছে।
যদি এমন কোনো এলাকা ধ্বংস করা হয় যেখানে নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির প্রাণী বাস করে, এরা যদি পৃথিবীর আর কোথাও না থাকে, তাহলে তা সরাসরি প্রাণীগুলোর বিলুপ্তির কারণ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এমন প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে, যারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতিই পায়নি।
সূত্র: সিএনএন