শিলাবৃষ্টি কেন হয়, কেন বিপজ্জনক
আকাশ কালো হয়ে এল, হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়া, তারপর বৃষ্টি—এ পর্যন্ত তো স্বাভাবিক। কিন্তু হঠাৎ যদি দেখো, বৃষ্টির ফোঁটার বদলে আকাশ থেকে পড়ছে বরফের ছোট ছোট বল! এগুলোই শিলা, আর এ ঘটনাকেই বলা হয় শিলাবৃষ্টি। আমাদের দেশে বসন্তকালে অনেকেই এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শিলাবৃষ্টি কেন হয়? আকাশে কী এমন ঘটে যে পানি বরফ হয়ে মাটিতে পড়ে?
চলো, পুরো ব্যাপারটা সহজভাবে বুঝে নেওয়া যাক।
বজ্রঝড়ের ভেতরের রহস্য
শিলাবৃষ্টি সাধারণ কোনো বৃষ্টির ফল নয়। এর জন্য দরকার শক্তিশালী বজ্রঝড়। এই ঝড়ের সময় আকাশে যে বড় বড় মেঘ তৈরি হয়, সেগুলোকে বলে কিউমুলোনিম্বাস মেঘ। এই মেঘগুলো অনেক উঁচু পর্যন্ত উঠে যায়। কখনো ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত!
এই মেঘের ভেতরে বাতাস খুব জোরে ওপরের দিকে উঠতে থাকে। একে বলা হয় ‘আপড্রাফট’ বা ঊর্ধ্বমুখী বাতাস। এই বাতাস এত শক্তিশালী হয় যে ছোট ছোট পানির ফোঁটাকে মেঘের অনেক ওপরে ঠেলে নিয়ে যেতে পারে।
এখানেই শুরু হয় আসল খেলা।
মেঘের নিচের অংশ গরম হলেও ওপরের অংশ খুব ঠান্ডা—শূন্য ডিগ্রির অনেক নিচে। যখন পানির ফোঁটাগুলো এই ঠান্ডা জায়গায় পৌঁছে যায়, তখন সেগুলো বরফে পরিণত হয়। এভাবেই তৈরি হয় ছোট ছোট বরফকণা। যেগুলোকে আমরা শিলার বীজ বলতে পারি।
ছোট কণা থেকে বড় শিলা
প্রথমে এই বরফকণাগুলো খুব ছোট থাকে। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।
ঝড়ের ভেতরে এই কণাগুলো বারবার ওপরে-নিচে ওঠানামা করতে থাকে। ওপরে গেলে ঠান্ডায় জমে, আর নিচে নামলে তুলনামূলক গরম অংশে এসে আবার পানির ফোঁটা লেগে যায়। তারপর আবার ওপরে উঠলে সেই পানি জমে নতুন বরফের স্তর তৈরি করে।
এভাবে প্রতিবার ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে শিলার গায়ে নতুন নতুন স্তর জমতে থাকে।
ভাবতে পারো, যেন একটা পেঁয়াজ। একটার ওপর আরেকটা লেয়ার!
এই প্রক্রিয়া যত বেশি সময় ধরে চলবে, শিলাটাও তত বড় হবে। কখনো ছোট মটরদানার মতো থাকে, আবার কখনো টেনিস বলের মতো বড়ও হতে পারে।
শিলার ভেতরের চমক
তুমি যদি কখনো একটা শিলা কেটে ভেতরটা দেখো, তাহলে অবাক হবে। ভেতরে দেখা যাবে অনেকগুলো স্তর। একটা স্বচ্ছ, একটা সাদা—এভাবে একটার পর একটা।
এই স্তরগুলো কেন হয়? কারণ, যখন পানি ধীরে ধীরে জমে, তখন তৈরি হয় স্বচ্ছ বরফ। আর যখন দ্রুত জমে, তখন ভেতরে ছোট ছোট বাতাস আটকে যায়। তখন সেটা সাদা বা অস্বচ্ছ দেখায়। এই দুই ধরনের জমাট বরফ একসঙ্গে মিলে শিলার ভেতরে তৈরি করে সুন্দর লেয়ার।
কখন মাটিতে পড়ে
ঝড়ের ভেতরে যতক্ষণ বাতাস শক্তিশালী থাকে, ততক্ষণ শিলাগুলো মেঘের ভেতরেই ঘুরতে থাকে। কিন্তু একসময় শিলাগুলো এত বড় ও ভারী হয়ে যায় যে বাতাস আর তাদের ধরে রাখতে পারে না। তখনই তারা মাটির দিকে পড়ে—এটাই শিলাবৃষ্টি।
বাংলাদেশে কখন বেশি হয়
বাংলাদেশে শিলাবৃষ্টি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বসন্তকালে, অর্থাৎ মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে। এই সময়টাকে অনেকেই চেনে কালবৈশাখীর মৌসুম হিসেবে।
কেন এই সময়
কারণ, তখন মাটির কাছাকাছি বাতাস খুব গরম থাকে, কিন্তু আকাশের ওপরের অংশ থাকে ঠান্ডা। এই গরম আর ঠান্ডা বাতাসের সংঘর্ষে তৈরি হয় শক্তিশালী বজ্রঝড়। আর এই বজ্রঝড়ই শিলাবৃষ্টির জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে।
বসন্তের শেষ দিক থেকে বর্ষা শুরুর আগপর্যন্তও মাঝেমধ্যে শিলাবৃষ্টি হতে পারে।
কোথায় বেশি দেখা যায়
বাংলাদেশের সব জায়গায় শিলাবৃষ্টি হতে পারে, তবে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, যেমন রাজশাহী বা রংপুর অঞ্চলে শিলাবৃষ্টি একটু বেশি দেখা যায়। খোলা সমতল এলাকাগুলোতেও শিলাবৃষ্টির প্রভাব বেশি বোঝা যায়।
শিলাবৃষ্টি কেন বিপজ্জনক
শিলাবৃষ্টি দেখতে যতই মজার লাগুক, এটি কিন্তু বেশ ক্ষতিকর হতে পারে। বড় শিলা ফসল নষ্ট করে দিতে পারে, টিনের ছাদে গর্ত করতে পারে, কখনো কখনো মানুষ বা গবাদিপশুও আহত হতে পারে। তাই শিলাবৃষ্টি শুরু হলে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা খুব জরুরি।
সংক্ষেপে বুঝে নিতে পারো এভাবে
শিলাবৃষ্টি হতে হলে শক্তিশালী বজ্রঝড় দরকার। ঠান্ডা মেঘের অংশে পানি বরফে পরিণত হয়। বারবার ওঠানামার ফলে শিলা বড় হয়। ভারী হয়ে গেলে মাটিতে পড়ে।
প্রকৃতির এই খেলাটা একদিকে যেমন দারুণ, তেমনি একটু ভয়ংকরও। তাই আকাশে কালো করে মেঘ জমলে আর ঝোড়ো হাওয়া উঠলে শুধু বৃষ্টির কথা ভাবলেই হবে না, হয়তো আসছে শিলাবৃষ্টিও!
তথ্যসূত্র: ইম্ফল টাইমস, এবিসি নিউজ