পেটেন্ট অফিসে যেভাবে কেরানির চাকরি পেয়েছিলেন আইনস্টাইন

১৯০০ সালের আগস্টে জুরিখ পলিটেকনিক থেকে স্নাতক পাশ করলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। শিক্ষক হওয়ার পরিকল্পনা আগেই ছিল। কিন্তু সে জন্য দরকার ছিল কোনো শিক্ষকের সহকারী হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা। ভেবেছিলেন কাজটা সহজেই মিলবে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর হয় আরেক। 

পলিটেকনিকে পড়ার সময় আইনস্টাইন বেশ জেদি আর বিদ্রোহী স্বভাবের ছিলেন। ফলে বেশিরভাগ অধ্যাপক তাঁকে পছন্দ করতেন না। অথচ পাশ করার পর চাকরির জন্য সেই অধ্যাপকদের সুপারিশই সবচেয়ে জরুরি ছিল। অথচ তাঁর পক্ষে কেউ ছিলেন না। 

আইনস্টাইন প্রথমে পলিটেকনিকেই একটি সহকারী পদের জন্য চেষ্টা করলেন। কিন্তু কেউই তাঁর ওপর ভরসা করতে পারলেন না। সহকারী হওয়ার পর যদি উল্টোপাল্টা করে বসেন! অথচ তখন পলিটেকনিকেও সহকারী নেওয়ার দরকার ছিল। চাইলেই দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে পারতেন কোনো অধ্যাপক। কিন্তু আইনস্টাইনের জেদের কারণে তাঁর ওপর ভরসা করতে সাহস পেলেন না। 

পলিটেকনিকের আশা ছেড়ে বিভিন্ন স্কুলে চিঠি লেখা শুরু করলেন। কিন্তু এখানেই সমস্যা তাঁর পিছু ছাড়ে না। যারা তাঁকে চাকরি দেওয়ার কথা ভাবতেন, শেষ পর্যন্ত তারাও পলিটেকনিকের অধ্যাপকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। স্বাভাবিকভাবেই, সেখান থেকে ইতিবাচক মন্তব্য আসত না। ফলে সবখানেই তাঁর আবেদন বাতিল হয়ে যেত। এভাবে দুই বছর ধরে চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেও কোনো লাভ হলো না। 

আরও পড়ুন

ঠিক তখনই এক বন্ধু আশার আলো হয়ে এলেন। তিনি সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরে পেটেন্ট অফিসে কেরানির চাকরির খবর দিলেন। পেটেন্ট অফিসে কেরানির কাজ হলো, নতুন কোনো আবিষ্কারের আবেদনপত্র দেখা। কোনো আবিষ্কারকে সরকারিভাবে পেটেন্ট বা স্বত্বাধিকার দেওয়া হবে কিনা, তা যাচাই করা। তিনি পরীক্ষা করে দেখেন, নতুন আবিষ্কারটি আগে থেকেই পেটেন্ট হওয়া কোনো জিনিসের সঙ্গে মেলে কিনা। আবিষ্কারটি যেভাবে কাজ করার কথা, সেভাবেই কাজ করে কিনা। 

যাহোক, আইনস্টাইন কিছুটা ভরসা পেলেন। কিন্তু চাকরির বিজ্ঞপ্তি কবে হবে, আর চাকরি কবে মিলবে, তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। এদিকে আইনস্টাইনের দিন চালানো খুব কঠিন পড়ল। বাধ্য এক স্কুল শিক্ষার্থীকে পড়ানোর কাজ নিলেন। সামান্য সেই টাকায় কোনো রকমে দিন চলে যায়। কিন্তু অপেক্ষায় ছিলেন বন্ধুর দেওয়া চাকরির খবরের জন্য। চাকরিটা তাঁর হবে কিনা, তাও জানেন না তিনি। 

এরপর একদিন পেটেন্ট অফিসে চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। শর্তগুলো দেখে মনে হলো, সবই তাঁর সঙ্গে মিলে যায়। বুঝলেন, বন্ধুর সুপারিশে বিজ্ঞপ্তিটা এমনভাবে লেখা হয়েছে যাতে তাঁরই চাকরি হয়। এবার কিছুটা নিশ্চিন্ত হলেন। তাঁর চাকরিতে যোগদানের আগে এখনো সময় বাকি। এরমাঝেই প্রাইভেট পড়ানো বন্ধ হয়ে গেল। শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো থাকলেও, সেই স্কুলের শিক্ষকের সঙ্গে মনোমালিন্য হয়। আইনস্টাইন নিয়মের তোয়াক্কা না করে নিজের মতো পড়াতেন। শিক্ষার্থীর সঙ্গে ছিলেন বন্ধুর মতো। স্কুল শিক্ষক এটা পছন্দ করতেন না। তাছাড়া শিক্ষার্থীর পরিবার যে বেতন দিত, তার অর্ধেকও পেতেন না আইনস্টাইন। 

টিউশনি চলে যাওয়ার পর আইনস্টাইন চাকরির আগেই বার্নে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেখানে গিয়ে বিজ্ঞাপন দিলেন—প্রতি ক্লাসের ভিত্তিতে পড়াবেন। মানে প্রতিটা ক্লাসের জন্য অল্প অল্প টাকা নেবেন। প্রথমে কাউকে পেলেন না, পরে একজন এলেন যিনি পরে শিক্ষার্থী থেকে বন্ধু হয়ে যান।

আরও পড়ুন

এরপর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আইনস্টাইন পেটেন্ট অফিসের চাকরিটা পেলেন। কিছুদিন পরেই তাঁর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছুটে যান বাবার কাছে। মৃত্যুশয্যায় বাবা তাঁকে মিলেইভাকে বিয়ের করার অনুমতি দেন। মায়েরও আর আপত্তি করার সুযোগ রইল না। কিছুদিন পরে বাবা মারা গেলেন। আইনস্টাইন বিয়ে করলেন মিলেইভাকে। বিয়েতে দুই পরিবারের কেউ এলেন না। ছিলেন শুধু তাঁর দুই বন্ধু, যার একজন সেই শিক্ষার্থী  থেকে বন্ধু বনে যাওয়া লোকটি। বিয়ে ও মিলেইভার ব্যাপারে বাকি আলোচনায় একটু পরে আসছি।

অলিম্পিয়া অ্যাকাডেমির তিন বন্ধু। বাঁ থেকে কনরাড হ্যাবিশট, মরিস সলোভিন ও আলবার্ট আইনস্টাইন

পেটেন্ট অফিসের কাজ আইনস্টাইনের কাছে কঠিন ছিল না। কিন্তু শিগগিরই একঘেয়ে লাগতে শুরু করল। অন্য কেরানিদের পুরো দিন লাগত যে কাজ করতে, তিনি অর্ধেক সময়ে শেষ করে ফেলতেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ভাবলেন, কাজের প্রতি ভীষণ উৎসাহ আছে আইনস্টাইনের! তাই তাঁর বেতনও বাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু উৎসাহের ছিটেফোঁটাও ছিল না তাঁর মধ্যে। অফিসের কাজ শেষ করে গবেষণার জন্য বাড়তি সময় পেতেন তিনি। অফিস শেষে নিজের ভাবনাগুলো বন্ধুদের শোনাতেন। প্রতিদিন আড্ডা দিতেন। বন্ধুদের নিয়ে একটিও দল বানালেন। নাম দিলেন অলিম্পিয়া অ্যাকাডেমি। মজা করে অলিম্পাস পাহাড়ের পৌরাণিক গ্রিক দেবতাদের নামেই নামটা রাখলেন। এই দলের সদস্য তিন জন। আইনস্টাইন নিজে আর বিয়ের দিন উপস্থিত থাকা সেই দুই বন্ধু। একজনের নাম মরিস সলোভিন, যিনি শুরুতে আইনস্টাইনের ছাত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন দর্শনের ছাত্র। অন্যজন গণিতবিদ কনরাড হ্যাবিশট। বিয়ের পর অবশ্য আইনস্টাইনের স্ত্রী মিলেইভাও এই দলে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি কোনো মন্তব্য করতেন না, শুধু সবার কথা শুনতেন। অফিস টাইমের পরে অনেকটা সময় কাটাতেন এই অলিম্পিয়া অ্যাকাডেমিতে।

আরও পড়ুন
১৯০৪ সালে পেটেন্ট অফিসে নিজের ডেস্কে আলবার্ট আইনস্টাইন

তাঁদের আলোচনা শুধু গণিত বা পদার্থবিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থাকত না, দর্শন নিয়েও গভীর আলাপ হতো। আইনস্টাইন বিশেষভাবে মুগ্ধ হতেন। আলোচনা হতো পালাক্রমে সবার বাড়িতে। তবে দুই বছরের মধ্যে দুই বন্ধু অন্য শহরে চলে যাওয়ায় অ্যাকাডেমি ভেঙে যায়। কিন্তু আজীবন তাঁদের বন্ধুত্ব অটুট ছিল। আইনস্টাইন পরে বলেছিলেন, ওই আলোচনা তাঁকে যুগান্তকারী ধারণা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। সেই ধারণা দিয়েই তিনি পৃথিবীর ধ্যানধারণাই পাল্টে দেন।

এ সময় চাকরির পাশাপাশি তিনি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লিখতে ও প্রকাশ করতে থাকেন। ১৯০১ সালে তাঁর প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় জার্মান ভাষার বিখ্যাত জার্নাল আন্নালেন ডের ফিজিক-এ। জলীয় পদার্থের বৈশিষ্ট্য নিয়ে ছিল এই প্রবন্ধ। সহজভাষায় বললে, কীভাবে একটি সরু নলের মধ্যে দিয়ে তরল পদার্থ ওপরে ওঠে, তা তিনি প্রমাণ করেছিলেন। যদিও তত্ত্বটি পরে ভুল প্রমাণিত হয়। আইনস্টাইন নিজেই ভুল ধরেন এবং নতুন তত্ত্ব দেন। এরপর একই জার্নালে আরও অনেক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন তিনি।

আলবার্ট আইনস্টাইন ও মিলেইভা মারিচ

মাঝের বছরগুলোতে নানা উত্থান-পতন পেরিয়ে এলেন তিনি। বিয়ের ব্যাপারে আগেই একটু আলোচনা করেছি। মূলত, ১৯০৩ সালে আইনস্টাইন ও মিলেইভা বিয়ে করেন। মিলেইভা মারিচ ছিলেন সার্বিয়ান। ১৮৯৬ সালে জুরিখ পলিটেকনিকে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল আইনস্টাইনের। সে গল্পও তৃতীয় পর্বে করেছি। শুরুতে তাঁদের সম্পর্ক ছিল শুধু বন্ধুত্বের। কিন্তু ক্লাসের বাইরে একসঙ্গে পড়াশোনা করতে করতে সেই বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে ভালোবাসায় রূপ নেয়। মিলেইভা অত্যন্ত জ্ঞানী ছিলেন। আইনস্টাইনের মতো তিনিও চেয়েছিলেন পদার্থবিজ্ঞানে অবদান রাখতে। ভেবেছিলেন মেরি কুরির মতো তিনিও বিজ্ঞানী হবেন। তারপর আইনস্টাইনের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর সেই আশাটা যেন আরও বেড়ে গেল। মেরি কুরি ও পেয়ের কুরি দম্পতির মতো মিলেইভা ও আইনস্টাইন দম্পতি একসঙ্গে গবেষণা করবেন। কিন্তু জীবনের পথে অপ্রত্যাশিত বাঁক তাঁর জন্য সবকিছু জটিল করে তুলল। আইনস্টাইন পলিটেকনিক থেকে পাশ করলেও পরপর ২ বছর ফেল করলেন মিলেইভা। এদিকে আইনস্টাইনের মা কোনোভাবে মিলেইভাকে মেনে নিতে পারছিলেন না। টানা দুইবার ফেল করার কারণে নিজের বাড়িতেও মুখ দেখাতে পারছিলেন না। সবকিছু মিলিয়ে মিলেইভার মেরি কুরি হওয়ার স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিতে হলো। বাকিটা জীবন আইনস্টাইনকে নিয়েই কাটাতে চাইলেন। আইনস্টাইন নিজের গবেষণা চালিয়ে গেলেন। আইনস্টাইনের গবেষণা যত বাড়ে, মিলেইভা তত পদার্থবিজ্ঞানের জগত থেকে সরে সংসারী হন। তবে সেসব কষ্টের কথা আজ আর বলব না। কারণ, কিছুদিনের মধ্যেই আইনস্টাইনের দিন বদলাতে শুরু করবে।

এরপর আসবে শুভদিন। ১৯০৫ সালে তিনি চারটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করবেন। সেগুলো শুধু তাঁর জীবনই বদলে দেবে না, বদলে দেবে বিজ্ঞানের ইতিহাস। আমাদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও চিরতরে পাল্টে দেবেন তিনি। সে গল্প করব পরের পর্বে। 

সূত্র: ডি কে প্রকাশনীর লাইফ স্টোরিস সিরিজের আলবার্ট আইনস্টাইন ও প্রদীপ দেবের আইনস্টাইনের কাল অবলম্বনে।

আরও পড়ুন