১০ বছরের চেষ্টায় বিলুপ্তি থেকে ফিরে এল বোতামের মতো ছোট বারমুডা শামুক
মনে হতে পারে, বোতামের মতো ছোট শামুকের আবার কী গুরুত্ব? এটি টিকে থাকলেই কী, হারিয়ে গেলেই–বা কী। এর যে গুরুত্ব সেটা পরে বলছি। আগে জেনে নিই, কীভাবে এই শামুক প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। কীভাবে ১০ বছরের চেষ্টায় এটি আবারও প্রকৃতিতে ফিরে এসেছে।
বারমুডার নিজস্ব প্রাণী ‘গ্রেটার বারমুডা স্নেইল’। বৈজ্ঞানিক নাম Poecilozonites bermudensis। এটি যে এখনো জীবিত, তা ভাবা হতো না। জীবাশ্ম হিসেবে এটিকে রেখে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতির মধ্যে কখনো কখনো এমন কিছু জিনিস লুকিয়ে থাকে, যা আবিষ্কারের পর আমরা খুব অবাক হই। ২০১৪ সালে বারমুডার রাজধানী হ্যামিলটনের এক স্যাঁতসেঁতে, আগাছায় ভরা গলিপথে হঠাৎ খুঁজে পাওয়া যায় এই শামুকের অল্প কিছু জীবিত সদস্যকে। সেই আবিষ্কার থেকেই শুরু হয় এক দশকব্যাপী আন্তর্জাতিক সংরক্ষণের চেষ্টা। যার ফল এখন সবাই দেখতে পাচ্ছে।
বারমুডা সরকার, যুক্তরাজ্যের চেস্টার চিড়িয়াখানা ও বিভিন্ন দেশের সংরক্ষণবিজ্ঞানীরা মিলিতভাবে এই প্রজাতিটিকে বাঁচানোর দায়িত্ব নেন। শুরুটা ছিল খুবই ভঙ্গুর। ২০০টির কম শামুক নিয়ে কাজ শুরু হয়। চেস্টার চিড়িয়াখানায় বিশেষভাবে নকশা করা প্লাস্টিকের পডে তৈরি করা হয় শামুকের জন্য আদর্শ বাসযোগ্য পরিবেশ। প্রচলিত শামুক পালনের পদ্ধতিকে বদলে দেওয়া হয়। আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ও খাদ্যের নিখুঁত সমন্বয়ে এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলোকে ধীরে ধীরে বংশবিস্তার করানো হয়।
বারমুডা শামুককে ফিরিয়ে আনার পথটা একদমই সহজ ছিল না। বৈশ্বিক উষ্ণতা, আবাসস্থল ধ্বংস, আর দেশের বাইরে থেকে আসা শিকারি ‘উলফ স্নেইল’ ও ‘মাংসাশী ফ্ল্যাটওয়ার্ম’—সব মিলিয়ে বারমুডার দেশীয় শামুকদের অস্তিত্ব আগেই বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। ছোট আকারের স্থানীয় প্রজাতিগুলো এই আগ্রাসী শিকারিদের কাছে একে একে হেরে যাচ্ছিল। তাই শুধু বংশবৃদ্ধি নয়, এদের নিরাপদে ফেরানোর পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
২০১৯ সাল থেকে ধাপে ধাপে চেস্টার চিড়িয়াখানায় জন্ম নেওয়া শামুকদের আবার বারমুডার দ্বীপগুলোয় ফিরিয়ে আনা শুরু হয়। সুরক্ষিত বনাঞ্চলে কঠোর বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থার মধ্যে এদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ব্যবস্থা নেওয়া হয় যেন আক্রমণকারী শিকারিরা এদের কাছে ঘেঁষতে না পারেন। এখন সেই উদ্যোগের ফল হিসেবে ছয়টি ভিন্ন এলাকায় গ্রেটার বারমুডা স্নেইল ভালোভাবেই টিকে গেছে। এখন এদের সংখ্যা এই ছয় জায়গায় পর্যাপ্ত। আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ সাময়িকী ওরিক্স–এ প্রকাশিত হতে যাওয়া একটি মূল্যায়ন বলছে, এই প্রজাতি এখন বিলুপ্তির ঝুঁকি থেকে নিরাপদ।
চেস্টার চিড়িয়াখানার ইনভার্টিব্রেটস দলের সহকারী ব্যবস্থাপক তামাস পাপ বলেন, একটি পুরো প্রজাতিকে বাঁচাতে পারা প্রত্যেক সংরক্ষণবিদের স্বপ্ন। তাঁর মতে, এই সাফল্য প্রমাণ করে সহযোগিতা ও চিড়িয়াখানাগুলোর বৈজ্ঞানিক ভূমিকা কতটা শক্তিশালী হতে পারে। বারমুডা সরকারের পরিবেশবিদ ড. মার্ক আউটারব্রিজ বলেন, ২০০টির কম শামুক দিয়ে শুরু করে এক লাখের বেশি শামুককে আবার প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া, এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।
এই শামুকেরা শুধু সংখ্যার গল্প নয়, বাস্তুতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য নীরবে কাজ করে চলা কর্মী। কানাডাভিত্তিক গবেষণা সংস্থা বায়োলিঙ্কসের ড. ক্রিস্টিনা ওভাসকা মনে করেন, এই শামুকেরা বড় প্রাণীদের খাদ্য। একইভাবে জীবিত ও পচা উদ্ভিদ খেয়ে মাটির পুষ্টি পুনর্ব্যবস্থাপনায়ও এদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। তাই এদের ফিরে আসা মানে, বারমুডার ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্রেরও ধীরে ধীরে সেরে ওঠা। এবার বুঝলে বোতাম আকৃতির এই ছোট্ট শামুকের গুরুত্ব কী?
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান