চাঁদে মানুষ পাঠাতে এখন কেন দেরি হচ্ছে, যদি ১৯৬৯ সালে সত্যই গিয়ে থাকে

আর্টেমিস–২ মিশনের জন্য তৈরি স্পেস লঞ্চ সিস্টেম রকেটছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

শেষবার মানুষ চাঁদের মাটিতে পা রেখেছিল ১৯৬৯ সালে। প্রায় ছয় দশক পেরিয়ে গেল, আজ পর্যন্ত মানুষ চাঁদে আর যায়নি। এখন নতুন করে জানা যাচ্ছে, শিগগিরই চাঁদে মানুষ পাঠাতে চাইছে নাসা। প্রশ্ন হলো, এখন মানুষের হাতে এত আধুনিক প্রযুক্তি আছে, তবু আবারও চাঁদে যেতে এত দিন লাগছে কেন? আজ থেকে প্রায় ছয় দশক আগে তবে মানুষ কীভাবে চাঁদে গিয়েছিল?

এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ষাটের দশকের পৃথিবীতে। তখন ছিল কোল্ড ওয়ারের যুগ। যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়ন একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লড়াইয়ে নেমেছিল। কে আগে মহাকাশে যাবে, কে আগে চাঁদে নামবে—এই প্রতিযোগিতা ছিল দেশ দুটির জাতীয় সম্মান ও সক্ষমতার প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ষাটের দশকে ঘোষণা করেছিলেন, এই দশকের মধ্যেই মানুষকে চাঁদে পাঠানো হবে। অর্থাৎ লক্ষ্য ছিল একদম নির্দিষ্ট।

আরও পড়ুন

এই লক্ষ্য পূরণে নাসা তখন অবিশ্বাস্য পরিমাণ অর্থ আর মানুষ কাজে লাগায়। অ্যাপোলো কর্মসূচিতে প্রায় চার লাখ মানুষ কাজ করেন। আজকের হিসাবে যার খরচ কয়েক শ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। সেই সময় মহাকাশচারীরাও জানতেন, এ অভিযানে ঝুঁকি আছে। ফিরে না আসার সম্ভাবনাও আছে। তবু দেশ আর বিজ্ঞানের জন্য তাঁরা সেই ঝুঁকি নিতে রাজি ছিলেন।

আরেকটা বিষয় ছিল। তখনকার লক্ষ্য ছিল খুব সহজ ও স্পষ্ট। চাঁদে নামতে হবে, কিছু পরীক্ষা করতে হবে, ছবি তুলতে হবে, পতাকা লাগিয়ে ফিরে আসতে হবে। দীর্ঘদিন থাকার কথা বা ভবিষ্যৎ গ্রহ অভিযানের প্রস্তুতি তখন ভাবা হয়নি।

এখন পরিস্থিতি একেবারে আলাদা। নাসা শুধু চাঁদে গিয়ে ফিরে আসতে চায় না। নাসা চায় চাঁদে যেন দীর্ঘদিন থাকার ব্যবস্থা করা যায়, ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার পথ তৈরি করা যায়। তাই এখনকার প্রতিটি যন্ত্র, প্রতিটি ধাপ অনেক বেশি নিরাপদ করতে হচ্ছে। সবকিছু নিখুঁত করার জন্য জটিল সব পরীক্ষা করা হচ্ছে।

কী পরিমাণ কাজ করা হচ্ছে তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ আর্টেমিস-২ মিশন। শিগগিরই চারজন মহাকাশচারী চাঁদের চারপাশে ঘুরে আসবেন এই মিশনে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, যে ওরিওন নামের মহাকাশযানে চেপে তাঁরা যাবেন, সেটা নিয়ে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নন অনেক বিশেষজ্ঞ।

আরও পড়ুন
চাঁদের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন বাজ অলড্রিন। তাঁর ছবিটি তুলেছেন আরেক নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং
ফাইল ছবি: এএফপি

সমস্যাটা হচ্ছে ওরিয়নের নিচের অংশে লাগানো একটি বিশেষ আবরণে, যাকে বলা হয় হিট শিল্ড। পৃথিবীতে ফেরার সময় এই হিট শিল্ডই মহাকাশযানকে ভয়ংকর তাপ থেকে রক্ষা করে। ২০২২ সালে আর্টেমিস-১ নামের একটি পরীক্ষামূলক মানুষবিহীন মিশনে একই ধরনের হিট শিল্ড ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই যাত্রা শেষে দেখা যায়, হিট শিল্ডে ক্ষতচিহ্ন তৈরি হয়েছে, যা আগে ভাবা হয়নি।

নাসা এ সমস্যা নিয়ে তদন্ত করেছে। তারা বলছে, তারা ঝুঁকিটা বুঝতে পেরেছে। নাসার মতে, হিট শিল্ড এখনো নিরাপদ। যাঁরা মিশনে এই হিট শিল্ড ব্যবহারের পক্ষে আছেন, তাঁরাও মানছেন, অজানা ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি।

আরও পড়ুন

এখানেই ১৯৬৯ আর আজকের পার্থক্যটা সবচেয়ে পরিষ্কার। অ্যাপোলো যুগে এমন ঝুঁকি হয়তো মেনেই নেওয়া হতো। কিন্তু আজ চারজন মানুষকে নিয়ে কোনো মহাকাশযান উড়লে সেটায় সমস্যা থাকা যাবে না। সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। কারণ, এখন একটি দুর্ঘটনা মানে শুধু একটি মিশনের ব্যর্থতা নয়, বড় একটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্ন। তাই সময় লাগছে বেশি। কিন্তু এর মানে এই না যে ১৯৬৯ সালের চাঁদে যাওয়া মিথ্যা ছিল। বিজ্ঞানীরা আজও চাঁদে বসানো যন্ত্র ব্যবহার করেন, চাঁদ থেকে আনা মাটি গবেষণাগারে পরীক্ষা করেন। এসব প্রমাণ দেখে নিশ্চিত বলা যায়, মানুষ সত্যিই চাঁদে গিয়েছিল। তখন মানুষ চাঁদে গিয়েছিল, তার একটা কারণ—সেই সময় ‘যেতেই হবে’ এমন একটা তীব্র চাপ ছিল। আর এখন নাসা চায় আরও নিরাপদ, আরও টেকসই ভবিষ্যতের জন্য চাঁদে যেতে। তাই তারা এক পা আগানোর আগে দশবার ভাবছে!

আরও পড়ুন