আগুন কেন মানুষকে আকর্ষণ করে
মানুষ যেদিন থেকে আগুন ব্যবহার করতে শিখেছে, সেদিন থেকে এর প্রতি এক অদ্ভুত টান আছে। আগুন আমাদের শীতের দিনে ওম দেয়। আগুনে রান্না করে খাই। আবার অন্ধকারে আলো দিয়ে পথ দেখায়।
রাস্তার পাশে জ্বলতে থাকা আগুন বা শীতে তাপ পোহানোর সময় আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে। আগুনের লাল–হলুদ শিখাগুলো যেন নাচতে থাকে। সে সময় চোখ ওই আগুনের ওপর আটকে যায়। এমনটা কিন্তু সবার ক্ষেত্রে হয়।
কিন্তু আমরা কি শুধু প্রয়োজনেই আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকি? একদম না। একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, ইউটিউবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু আগুন জ্বলার ভিডিও চলে। মানুষও তা বেশ মজা নিয়ে দেখে। তার মানে আগুনে এমন কিছু একটা আছে, যা আমাদের মনকে টেনে ধরে রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ড্যানিয়েল এম টি ফেসলার এর পেছনের আসল কারণটি খুঁজে বের করেছেন। তিনি মনে করেন, যেসব শিশু ছোটবেলা থেকেই নিজে নিজে আগুন জ্বালাতে শেখে, তারা একসময় এ কাজে পুরোপুরি ওস্তাদ হয়ে যায়। আর কাজটা ভালোমতো শিখে যাওয়ার পর, আগুনের প্রতি তাদের আর নতুন কোনো আকর্ষণ বা কৌতূহল থাকে না।
আর এই কৌতূহল সবচেয়ে বেশি থাকে শহরের মানুষের। কারণ, তারা ছোটবেলায় নিজে নিজে আগুন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার সুযোগ পায় না। ফলে আগুনের প্রতি মনের ভেতরের কৌতূহলটা কখনো পুরোপুরি মেটে না। এ কারণেই বড় হওয়ার পরও আগুন দেখলে তারা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। শৈশবের সেই অসমাপ্ত কৌতূহল মেটাতেই মূলত বারবার আগুনের শিখায় চোখ আটকে যায়।
বিজ্ঞানী ফেসলারের এ গবেষণা কিন্তু বেশ আগের। তখন তিনি আর তাঁর স্ত্রী ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে জানার জন্য তিন বছর কাটিয়েছিলেন। তাঁরা এমন এক গ্রামে ছিলেন, যেখানে সব পরিবারই কাঠের চুলায় রান্না করে।
সেখানে ফেসলার এক অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করলেন। ওই গ্রামের ছোট বাচ্চারা হাঁটা শেখার পর থেকেই আগুনের আশপাশে ঘুরে বেড়াত। শহরের বাচ্চাদের মতো তাদের পেছনে বড়রা সারাক্ষণ থাকত না। মাত্র ছয় বছর বয়সের ছোট ছেলেমেয়েরাও দিব্যি রান্নার চুলার জ্বলন্ত কয়লা খালি হাতে তুলে নিয়ে খেলত। বড়দের রান্না করা দেখে তারা কাদা দিয়ে গোল গোল পিঠা বানিয়ে তা আগুনে সেঁকে নেওয়ার খেলা খেলত।
দেখা গেল, ১০ বছর বয়স হতে হতেই ওখানকার বাচ্চারা আগুন জ্বালানো আর তা নেভানোর কাজে একদম ওস্তাদ হয়ে যেত। ঠিক যখনই তারা কাজটা পুরোপুরি শিখে ফেলত, আগুনের প্রতি তাদের সেই আকর্ষণও আস্তে আস্তে কমতে শুরু করত।
মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন আগে থেকেই কোনো কিছু শেখার জন্য তৈরি থাকা। এর মানে হলো, টিকে থাকার জন্য জরুরি কিছু বিষয় দ্রুত শিখে নেওয়ার একটা জন্মগত আগ্রহ বা কৌতূহল আমাদের মনের ভেতরে আগে থেকেই থাকে। আগুনের ক্ষেত্রেও তা–ই হয়। আগুনের প্রতি এই জন্মগত আকর্ষণই বাচ্চাদের এটি ব্যবহারে পারদর্শী হতে সাহায্য করে। আর একবার ভালোমতো শিখে ফেললেই সে আকর্ষণ শেষ হয়ে যায়।
কিন্তু শহরের বাচ্চারা তো নিজে নিজে আগুন নিয়ে এমন ঘাঁটাঘাঁটি করার সুযোগ পায় না। ফলে মনের ভেতরের সেই কৌতূহলও কখনো পুরোপুরি মেটে না। আর এ কারণেই বড় হওয়ার পরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফায়ারপ্লেস বা ক্যাম্পফায়ারের আগুনের দিকে তারা তাকিয়ে থাকে। অথবা ইউটিউবে এগুলোর ভিডিও দেখে। মানুষের এই কৌতূহলকে কাজে লাগানোর জন্যই মূলত অনেক চ্যানেল তাদের ভিডিওতে এমন আগুনের দৃশ্য ব্যবহার করে।
বিজ্ঞানীদের ভাষায়, ছোটবেলায় আগুন নিয়ে মনের মতো অভিজ্ঞতা না হলে ভেতরের আদিম কৌতূহল কমে না। মন তখন ভাবে, কাজটি এখনো বাকি রয়ে গেছে।
তবে বিজ্ঞানের সব গবেষণার ফল সব সময় এক রকম হয় না। ২০১৫ সালে আলাস্কার কিছু কলেজপড়ুয়াকে নিয়ে ফেসলার আরেকটি গবেষণা করেন। সেখানে একদম উল্টো ফল দেখা যায়। দেখা গেছে, যারা ছোটবেলা থেকে আগুনের সঙ্গে বেশি পরিচিত ছিল, বড় হয়ে তারা আগুন আরও বেশি পছন্দ করছে।
অবশ্য ফেসলার নিজের এ ধারণা নিয়ে তাড়াহুড়া করে কোনো শেষ সিদ্ধান্ত দিতে চান না। তিনি নিজেই বলেন, হতে পারে, আলাস্কার ওই তরুণেরা ছোটবেলায় প্রতিদিনের কাজের অংশ হিসেবে আগুনকে অতটা কাছ থেকে দেখেনি। অথবা এমনও হতে পারে, তাঁদের এই পুরো ভাবনাই ভুল।
বিজ্ঞানী ক্রিস্টোফার লিন জানতে চেয়েছিলেন, আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকলে আমাদের শরীরে কী প্রভাব পড়ে। তিনি গবেষণায় দেখেন, আগুনের শিখা আর কাঠের চড়চড় শব্দ শুনলে মানুষের রক্তচাপ কমে যায় এবং মন একদম শান্ত হয়ে আসে। এটি ঠিক কোনো ভালো বই পড়া বা সিনেমা দেখার সময়ের মতো কাজ করে।
আগুনের এই শান্ত ভাব কেবল আমাদের আরাম দেয় না। এর পেছনে রয়েছে বেঁচে থাকার এক আদিম ইতিহাস। প্রাচীনকালে যখন মানুষ গুহায় থাকত, তখন হিংস্র পশুর আক্রমণ থেকে বাঁচতে ও তীব্র শীত থেকে রক্ষা পেতে আগুনের ব্যবহার শুরু হয়। আর এই আগুনই মানুষকে দলবদ্ধভাবে সমাজ গড়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে।
আগুনের পাশে বসে থাকার সময় মানুষের মন শান্ত থাকত। এই শান্ত স্বভাবের কারণে দলের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে মারামারি বা ঝগড়াঝাঁটি কম করত। তারা একসঙ্গে বসে শিকার করা খাবার ভাগ করে খেত এবং একে অপরের সুখ–দুঃখের গল্প করত। এভাবে আগুনের পাশে বসেই মানুষের পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সামাজিক বন্ধন মজবুত হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানীদের মতে, আগুন যদি মানুষকে শান্ত হতে সাহায্য না করত, তবে হয়তো মানুষের পক্ষে এত বড় সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হতো না।