হাতে না কি–বোর্ডে লিখব, মস্তিষ্কের জন্য কোনটি বেশি কাজে লাগে
স্কুলে এখনো ছেলেমেয়েরা হাতেই লেখে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পর লেখা বা নোট নেওয়ার ধরন বদলে যায়। শিক্ষক সামনে দাঁড়িয়ে পড়ান। ছেলেমেয়েরা নিজেদের মতো করে নোট নেয়। অনেকের সামনে থাকে ল্যাপটপ। কি–বোর্ডের শব্দ শোনা যায়। কিন্তু এসব ক্লাসরুমে এখনো অনেককে দেখা যায়, যারা অন্যদের থেকে একটু আলাদা। সামনে খাতা–কলম রেখে বসে আছে। নোট নিচ্ছে। একবার লিখছে আবার কেটে দিচ্ছে।
ক্লাস শেষে সবাই একসঙ্গে বের হয়। তবে এক সপ্তাহ পরে সেই ক্লাসের পড়া সবার মাথায় সমানভাবে থাকে না।
এই ক্লাসে অনেকেই লেকচারের সবটুকুই নোট করেছে; কিন্তু সব মনে করতে পারে না। কেউ নিজের টাইপ করা নোট খুলে দেখেও বোঝে না ঠিক কী লিখেছে। কিন্তু যে খাতা-কলমে লিখেছিল, সে আসলে কিছুটা মনে করতে পারে। বিষয়টা ব্যাখ্যা করতে পারে।
কেন হাতে নোট নিলে বেশি মনে থাকে, সেটা সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়। কারণ হলো, হাত আর মস্তিষ্ক একসঙ্গে কাজ করে। হাতে লিখলে মস্তিষ্ক শুধু শব্দগুলো জমা রাখে না, প্রতিটি অক্ষরের বাঁক, থামা, ভুল ঠিক করার মুহূর্ত—সব মিলিয়ে মস্তিষ্কে একটা অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। লেখার সময় হাতের নড়াচড়া, চোখে দেখা আর মনে ভাবা, তিনটি একসঙ্গে সক্রিয় হয়। ফলে তথ্য শুধু শোনা বা দেখার মধে সীমাবদ্ধ থাকে না, অনুভব করা যায়।
কি–বোর্ডে টাইপ করা তুলনামূলক সহজ। প্রতিটি অক্ষরের জন্য প্রায় একই রকম চাপ দিতে হয়। হাতের নড়াচড়া তেমন একটা বদলায় না। মস্তিষ্কও তাই কম পরিশ্রম করে। কম পরিশ্রম মানে স্মৃতিতে কম দাগ রাখা।
২০২৩ সালে নরওয়ের এক গবেষণায় শিক্ষার্থীদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়। কেউ হাতে লিখেছে, কেউ কি–বোর্ডে টাইপ করেছে। সবার মাথায় ইইজি যন্ত্র লাগানো ছিল। ফল স্পষ্ট দেখা যায়। হাতে লেখার সময় মস্তিষ্কের অনেক বেশি অংশ একসঙ্গে সক্রিয় হয়, বিশেষ করে স্মৃতি ও শেখার সঙ্গে জড়িত জায়গাগুলো। পরে পরীক্ষায় দেখা গেছে, হাতে লেখা শিক্ষার্থীরা বেশি মনে রাখতে পেরেছে ও বিষয়টি ভালো বুঝেছে।
গবেষকেরা বলছেন, হাতে লেখা মস্তিষ্কের জন্য একধরনের ‘সেন্সরিমোটর উৎসব’। প্রতিটি শব্দ লেখার সময় অল্প নড়াচড়া, ছোট একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াই শেখাকে শক্ত করে।
শিশুদের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার দেখা যায়। যারা হাতে অক্ষর লিখে শেখে, তারা পড়ায় বেশি দক্ষ হয়। বড়রাও হাতে লেখা টু-ডু লিস্ট বা নোট বেশি মনে রাখতে পারে। এমনকি বয়স বাড়লেও হাতে লিখলে স্মৃতি তুলনামূলক ভালো থাকে।
এর মানে এই না যে কি–বোর্ডে লেখা অসুবিধাজনক। কি–বোর্ডে দ্রুত লেখা যায়। কিন্তু শেখার ক্ষেত্রে কখনো কখনো এই দ্রুততাই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। মস্তিষ্ক আসলে একটু কষ্ট করতে পছন্দ করে। কারণ, এতে শেখাটা ভালো করে হয়।
লেখার সময় শব্দের পর শব্দ না লিখে, মূল কথা, ছোট ছবি, তিরচিহ্ন, প্রশ্ন ইত্যাদি ব্যবহার করে লিখলে বেশি কাজে দেয়। এতে মস্তিষ্ক নিজেই তথ্য গুছিয়ে রাখে।
অগোছালো বা হাতের লেখা খারাপ হলেও অসুবিধা নেই। হাতের নড়াচড়া আর চিন্তা একসঙ্গে চললে শেখা সহজ হয়।
একটা ভুল অনেকেই করে। পুরো বক্তৃতা হুবহু হাতে লিখে ফেলে। এতে হাত ব্যথা হয়, মাথা বিরক্ত হয়; বরং প্রশ্ন লেখা, নিজের ভাষায় সারসংক্ষেপ লেখা, আগের ভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে লিখলেই কাজের কাজ হয়।
হাতে লিখলে নিজের সঙ্গে কথা বলার মতো একটা বিষয় ঘটে। তাই মস্তিষ্ককে একটু বেশি কাজে লাগাতে চাইলে বা নতুন কিছু শিখতে চাইলে আমাদের হাতেই নোট নেওয়া উচিত। টাইপ করে নয়।
সূত্র: কিডওয়ান্ডার