চিপসের প্যাকেটে বাতাস বেশি চিপস কম কেন

চিপসের প্যাকেটে থাকে নাইট্রোজেন

চিপস খেতে কে না ভালোবাসে। এটি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া প্যাকেটজাত খাবার। আমাদের অনেকের কাছেই চিপসের প্যাকেট জোরে শব্দ করে ফাটিয়ে ফেলাটা বেশ মজার একটি কাজ। কিন্তু প্যাকেট খোলার পর যখন দেখা যায়, ভেতরে অর্ধেকটাই ফাঁকা, তখন হতাশ হওয়াটাই স্বাভাবিক। মনে হতে পারে, কোম্পানি বোধ হয় চিপস কম দিয়ে বাতাস দিয়েই প্যাকেট ভরে রেখেছে। কিন্তু এই যে চিপসের প্যাকেটগুলো ফুলে থাকা বালিশের মতো দেখায়, এর পেছনে আসলে চমৎকার কিছু কারণ আছে।

প্রথমত, প্যাকেট ভর্তি এই গ্যাস বা বাতাস অনেকটা গাড়ির এয়ারব্যাগের মতো কাজ করে। যখন চিপসের প্যাকেটগুলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ট্রাকে করে নেওয়া হয়, তখন এই বাতাসই চিপসগুলোকে ভেঙে গুঁড়ো হওয়া থেকে বাঁচায়।

আরও পড়ুন

দ্বিতীয় কারণটি আরও মজার। আমাদের চারপাশের বায়ুমণ্ডলীয় চাপ সব সময় এক থাকে না। বিশেষ করে যখন এই চিপস বিমানে করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে নেওয়া হয়, তখন উচ্চতার কারণে বাতাসের চাপ বদলে যায়। প্যাকেটের ভেতরের এই বাড়তি গ্যাস সেই চাপের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে। যাতে প্যাকেটটি ফেটে না যায়। কে জানে, হয়তো কোনোদিন মহাকাশ রকেটে করে চিপস পাঠাতে হলেও এই বাতাসই কাজে লাগবে।

চিপসের প্যাকেটের ভেতর যে গ্যাস থাকে, তা কিন্তু আমাদের চারপাশের সাধারণ বাতাস নয়। সাধারণ বাতাসে থাকে প্রচুর অক্সিজেন। আর এই অক্সিজেনই হলো মুচমুচে চিপসের সবচেয়ে বড় শত্রু। অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে চিপস খুব দ্রুত নরম হয়ে যায় এবং এর স্বাদ নষ্ট হয়ে বিস্বাদ লাগে। ঠিক যেমনটি ঘটে, যখন চিপসের প্যাকেট খুলে রাতভর রেখে দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

আসলে প্যাকেটগুলো ভরা হয় বিশুদ্ধ নাইট্রোজেন গ্যাস দিয়ে। কেন জানো? কারণ, নাইট্রোজেন চিপসের তেল আর স্টার্চের অক্সিডেশন রোধ করে। সহজ কথায়, নাইট্রোজেন চিপসকে পচে যাওয়া বা গন্ধ হওয়া থেকে বাঁচায় এবং দীর্ঘ সময় মুচমুচে রাখতে সাহায্য করে। এটি কোনো মনগড়া কথা নয়। বিজ্ঞানীদের পিয়ার-রিভিউড গবেষণায় এটি প্রমাণিত। নাইট্রোজেন বেছে নেওয়ার আরও কিছু কারণ আছে। এটি কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া করে না, এর কোনো গন্ধ নেই এবং খাবার সংরক্ষণে এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ।

দেখা গেল, যেসব প্যাকেটে বাতাসের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি ছিল, সেই প্যাকেটের চিপসগুলোই বেশি ভেঙে গুঁড়ো হয়ে আছে। কারণ, প্যাকেটে জায়গা বেশি থাকায় চিপসগুলো ভেতরে দাপাদাপি করার সুযোগ পায় এবং একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে যায়।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। কিছু প্রমাণ বলছে, চিপস কোম্পানিগুলো অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই বাতাস ভরে দেয়। একে বলা হয় স্ল্যাক ফিল (Slack Fill), যা মাঝেমধ্যে ক্রেতাদের ঠকানোর একটি কৌশলও হতে পারে।

অন্য সবার মতোই চিপসের প্যাকেট খুলে মনটা খারাপ হয়ে যায় হেনরি হারগ্রিভস নামে এক ব্যক্তির। তিনি পেশায় একজন শিল্পী ও খাবারের ছবি তোলেন। তাঁর মনে একটা খটকা লাগল। এই যে প্যাকেটে বাতাসের এয়ারব্যাগ দেওয়া হয়, এটা কি আসলেও কোনো কাজে আসে? নাকি কোম্পানিগুলো আমাদের এমনিতেই বোকা বানাচ্ছে? এই উত্তর জানতে তিনি নিজের ল্যাবরেটরিতে বসে এক অদ্ভুত পরীক্ষা চালিয়ে ফেললেন। তিনি দেখতে চাইলেন, আসলে কি বাতাস চিপসকে ভেঙে যাওয়া থেকে বাঁচায়?

আরও পড়ুন

পরীক্ষার ফলাফল ছিল বেশ চমকপ্রদ। হারগ্রিভস গবেষণা নিয়ে একটা ফিচার করা হয় বিবিসি ফিউচারে। সেখানে তিনি জানান, ‘আমি ভেবেছিলাম প্যাকেটের বাতাস হয়তো চিপসগুলোকে ভাঙা থেকে বাঁচাবে। কিন্তু ঘটল ঠিক উল্টোটা।

দেখা গেল, যেসব প্যাকেটে বাতাসের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি ছিল, সেই প্যাকেটের চিপসগুলোই বেশি ভেঙে গুঁড়ো হয়ে আছে। কারণ, প্যাকেটে জায়গা বেশি থাকায় চিপসগুলো ভেতরে দাপাদাপি করার সুযোগ পায় এবং একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে যায়। অন্যদিকে যখন তিনি প্যাকেট থেকে সব বাতাস বের করে দিয়ে ‘ভ্যাকুয়াম-সিল’ (বাতাসহীনভাবে আটকে দেওয়া) করলেন, তখন দেখা গেল চিপসগুলো নড়াচড়া করতে পারছে না। ফলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়ার সময় সেগুলো একদম আস্ত আর মচমচে থাকছে।

বড় বড় চিপস কোম্পানিগুলো কেন হারগ্রিভসের এই সহজ সমাধানটি গ্রহণ করছে না, তা নিয়ে রহস্য রয়েই গেছে। তবে এই এয়ার-পাম্পিং বা প্যাকেটে বাতাস ভরার নীতি বদলে ফেলার আরও একটি বড় কারণ আছে। প্যাকেটে অতিরিক্ত বাতাস থাকার কারণে ট্রাকগুলোতে জায়গা কম হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চিপসবাহী প্রতি ১০০টি ট্রাকের মধ্যে ৮৬টি ট্রাকেরই রাস্তায় থাকার প্রয়োজন হতো না যদি প্যাকেটগুলো ছোট হতো। এর ফলে পরিবেশে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণও অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

আরও পড়ুন