মেয়াদ শেষ হওয়া ওষুধ খেলে কী ক্ষতি
১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন একটি নতুন নিয়ম চালু করে। সব ধরনের ওষুধের গায়ে অবশ্যই একটি মেয়াদের তারিখ লিখে দিতে হবে; কিন্তু প্রশ্ন হলো, মেয়াদ শেষ হওয়া মানেই কি ওষুধটি নষ্ট হয়ে যাওয়া? যেমন ধরো, ফ্রিজে রাখা দুধের মেয়াদ শেষ হলে তা পচে নষ্ট হয়ে যায় কিংবা টক হয়ে যায়। ওষুধ কি ঠিক একইভাবে মেয়াদের তারিখ পার হলেই নষ্ট হয়ে যায়?
আসল বিষয়টি একটু ভিন্ন। ওষুধের বোতলে যে তারিখটি লেখা থাকে, সেটি মূলত প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের দেওয়া একটি গ্যারান্টি। তারা নিশ্চিত করে যে ওই তারিখ পর্যন্ত ওষুধটি শতভাগ নিরাপদ থাকবে এবং ঠিকমতো কাজ করবে। তবে একটি ওষুধ আসলে কত দিন পর্যন্ত কার্যকর থাকে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো বিতর্ক আছে।
ইনসুলিন, নাইট্রোগ্লিসারিন বা তরল অ্যান্টিবায়োটিকের মতো কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ দ্রুত কার্যকারিতা হারায়; কিন্তু এগুলো ছাড়া দেখা গেছে, অনেক ওষুধই প্যাকেটে লেখা মেয়াদের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে ব্যবহারের উপযোগী এবং কার্যকর থাকে।
অনেকেই বিষয়টি জানেন না, তাই দুর্ঘটনাক্রমে মেয়াদের তারিখ পার হওয়া ওষুধ খেয়ে ফেললে ভয়ে অস্থির হয়ে পড়েন। ক্যালিফোর্নিয়া পয়জন কন্ট্রোল সিস্টেমের পরিচালক লি ক্যান্ট্রেল জানান, তাঁদের বিষ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে প্রায়ই এমন আতঙ্কিত মানুষের ফোন আসে।
লি ক্যান্ট্রেল বলেন, ‘আমি অনেক খুঁজেও এমন কোনো নির্ভরযোগ্য গবেষণাপত্র বা প্রমাণ পাইনি, যেখানে দেখা গেছে যে কেবল মেয়াদের তারিখ পার হওয়ার কারণে কোনো ওষুধ মানুষের শরীরে ক্ষতি করেছে। তবে সময়ের সঙ্গে ওষুধের কার্যকারিতা কিছুটা কমে যেতে পারে। যদিও এ নিয়ে গবেষণার সংখ্যা খুবই কম।’
ক্যান্ট্রেলের গবেষণায় একবার একটি দারুণ সুযোগ আসে। একটি পুরোনো ফার্মেসিতে তিনি ৪০ বছরের পুরোনো কিছু ব্যথানাশক ও অ্যান্টিহিস্টামিন ওষুধের মজুত পান। পরীক্ষা করে দেখা গেল, চার দশক পার হওয়ার পরও সেই ওষুধগুলো পূর্ণ কার্যকারিতা ধরে রেখেছে। ২০১২ সালে বিখ্যাত জামা ইন্টারনাল মেডিসিন জার্নালে এই চমকপ্রদ তথ্য নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।
এমনকি ২০১৭ সালের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, জরুরি অ্যালার্জির চিকিৎসায় ব্যবহৃত দামি এপিপেন (EpiPen) মেয়াদের তারিখ পার হওয়ার চার বছর পরেও ৮৪ শতাংশ কার্যকর থাকে। ক্যান্ট্রেলের মতে, জরুরি মুহূর্তে হাতের কাছে কিছুই না থাকার চেয়ে একটি মেয়াদোত্তীর্ণ এপিপেন ব্যবহার করাও জীবন বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে।
একটি ওষুধ আসলে ঠিক কত দিন পর্যন্ত কার্যকর থাকে, তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা করার সামর্থ্য একমাত্র ওষুধ কোম্পানিগুলোর আছে; কিন্তু এই গবেষণা করার ব্যাপারে তাদের খুব একটা আগ্রহ নেই। কেন জানো? কারণটা খুবই সহজ। ওষুধের গায়ের মেয়াদের তারিখ শেষ হয়ে গেলেই সবাই নতুন ওষুধ কিনতে বাধ্য হবে। আর যত বেশি নতুন ওষুধ বিক্রি হবে, কোম্পানিগুলোর লাভও তত বেশি হবে। তাই ওষুধের প্রকৃত আয়ুষ্কাল বের করার চেয়ে মেয়াদের তারিখ বসানোই তাদের জন্য বেশি লাভজনক।
তবে মার্কিন সরকারের জন্য বিষয়টি উল্টো। বড় কোনো জরুরি অবস্থা বা মহামারি সামাল দিতে সরকার প্রচুর ওষুধের মজুত গড়ে তোলে। ১৯৮৬ সালে এফডিএ এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ মিলে একটি বিশেষ প্রোগ্রাম শুরু করে, যার নাম শেল্ফ-লাইফ এক্সটেনশন প্রোগ্রাম। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মজুত করা ওষুধের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে সেগুলো ফেলে না দিয়ে দেখা, ওষুধগুলো আসলে আরও কত দিন ভালো থাকে। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা বেঁচে যাবে।
২০০৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আদর্শ পরিবেশে সংরক্ষিত ১২২টি আলাদা ওষুধের প্রায় সব কটিরই কার্যকারিতা মেয়াদের তারিখের পরও গড়ে চার বছর পর্যন্ত ছিল। এক তদন্তে জানা যায়, এই প্রোগ্রামের কারণে ২০১৬ সালে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হয়েছে। অর্থাৎ যে বিপুল পরিমাণ ওষুধ ফেলে দেওয়ার কথা ছিল, সেগুলো আসলে ব্যবহারের যোগ্যই ছিল। তবে এত সব গবেষণার পরেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা ভেবে এফডিএ এখনো মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কতা দিয়ে যাচ্ছে।
এফডিএ তাদের ওয়েবসাইটে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, মেয়াদের তারিখ পার হওয়া সব ওষুধই যে নিরাপদ, তা কিন্তু নয়; কিছু ওষুধে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে কম শক্তিশালী বা কার্যকারিতা হারানো অ্যান্টিবায়োটিক যদি সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। তবে রোগ তো সারবেই না, উল্টো শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে পারে। তাই যেকোনো ওষুধ ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ মেনে মেয়াদ থাকতে খেতে হবে। এটাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি। মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স