ইউটিউবার মিস্টারবিস্ট ঘানায় আস্ত গ্রাম গড়ে তুলেছেন কেন
জিমি ডোনাল্ডসন একজন ইউটিউব কনটেন্ট ক্রিয়েটর। তবে তিনি বিশ্বজুড়ে মিস্টারবিস্ট নামেই বেশি পরিচিত। তাঁকে বলা চলে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইউটিউবার। এই আমেরিকান ইউটিউবার তাঁর বিশাল আকারের চ্যালেঞ্জ ও স্টান্টের জন্য পৃথিবীজুড়ে পরিচিত। তিনি প্রায়ই নানা ধরনের চ্যারিটি ভিডিও বানান। তবে এবার তিনি ঘানায় প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার খরচে একটি গ্রাম উদ্বোধন করেছেন। কোকো শিল্পে কাজ করা শিশুশ্রমিকদের পরিবারগুলোকে সাহায্য করতেই এই বড় পদক্ষেপ।
এই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘আবনা ডাকওয়া ভিলেজ’। এর মাধ্যমে মানুষের জন্য ঘরবাড়ি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খাওয়ার পরিষ্কার পানি ও উপার্জনের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। মিস্টারবিস্ট তাঁর নতুন একটি ভিডিওতে এই কাজের কথা জানান। তিনি এটিকে তাঁর জীবনকালের সবচেয়ে বড় মানবিক কাজ বলে জানিয়েছেন।
গ্রামটি তৈরিতে প্রায় এক বছরের পরিকল্পনা ও আট মাস নির্মাণকাজে লেগেছে। আগে যেখানে পরিত্যক্ত জমি পড়ে থাকত, সেখানেই এখন পুরো গ্রামটি গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে শিক্ষকদের থাকার জন্য ১০টি বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে একটি চিকিৎসাকেন্দ্র, একটি কমিউনিটি বাজার এবং ৩০০ জনের বেশি শিশুর পড়াশোনার জন্য একটি সুন্দর স্কুল।
ঘানায় গ্রাম গড়ে তুললেন মিস্টারবিস্ট
শিশুদের স্কুলে যেতে উৎসাহ দিতে এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওই গ্রামের স্কুলের শিক্ষার্থীদের আগামী পাঁচ বছর ধরে প্রতিদিন বিনা মূল্যে খাবার দেওয়া হবে। এই কাজে সাহায্য করেছে রকফেলার ফাউন্ডেশন।
এই এলাকার উন্নয়নের জন্য একটি অফ গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাও বসানো হয়েছে। এটি তৈরিতে সাহায্য করেছে ‘গ্লোবাল এনার্জি অ্যালায়েন্স ফর পিপল অ্যান্ড প্ল্যানেট’। পরিষ্কার খাবার পানির জন্য দুটি বড় পানির টাওয়ার তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া চাষবাসের সুবিধা ও মাছ চাষের পুকুর বানানো হয়েছে, যাতে স্থানীয় মানুষ নিজেরা স্বাবলম্বী হতে পারে।
‘ফিস্টেবলস’ নামে মিস্টারবিস্টের একটি চকলেট কোম্পানি রয়েছে। সেই সুবাদে তিনি চকলেট বা কোকো শিল্পের নানা দিক সম্পর্কে জানেন। তিনি জানতেন কোকো শিল্পের সঙ্গে শিশুশ্রম যুক্ত। তাই সেই শিশুদের বাঁচাতেই তাঁর এই উদ্যোগ। এই কাজের সঙ্গে মিস্টারবিস্টের চকলেট কোম্পানি ফিস্টেবলসও কাজ করছে। কোম্পানিটি সঠিক উপায়ে সংগৃহীত কোকো ব্যবহার নিয়ে কাজ করে আসছে। এ ছাড়া কোকো তৈরির কাজে শিশুদের খাটানোর বিষয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ভিডিওতে মিস্টারবিস্ট পশ্চিম আফ্রিকার কোকো খামারগুলোতে বিপজ্জনক পরিবেশে শিশুদের কাজ করার বড় সমস্যাটি তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তিনি ক্রেতা ও চকলেট কোম্পানিগুলোকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার অনুরোধ করেছেন।
মিস্টারবিস্ট বলেন, ‘আপনারা যাঁরা এই ভিডিও দেখছেন, তাঁরা যদি এ বিষয়ে প্রতিবাদ না করেন, তবে বড় চকলেট কোম্পানিগুলো এভাবে চলতে থাকা শিশুশ্রমের বিষয়টি নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামাবে না।’ তিনি দর্শকদের চকলেট তৈরি করা কোম্পানিগুলোর কাছে সঠিক জবাবদিহিতা চাওয়ার আহ্বান জানান।
শিশুশ্রম রোধ ও ঘানার নতুন গ্রাম
পশ্চিম আফ্রিকার কোকো তৈরি করা এলাকাগুলোতে শিশুশ্রম একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ইউনিসেফ এই অঞ্চলের শিশুদের বিপজ্জনক চাষবাসের কাজে জড়িয়ে পড়ার তথ্য রেকর্ড করেছে।
মিস্টারবিস্ট জানান, আবনা ডাকওয়া ভিলেজের উদ্দেশ্য কেবল ঘরবাড়ি বা বিদ্যুৎ দেওয়ার সুবিধাই নয়। বরং যে আর্থিক কষ্টের কারণে শিশুদের পড়াশোনার বদলে চাষবাসের কাজে নামানো হয়, সেই অর্থনৈতিক চাপ দূর করাই এই গ্রামের মূল লক্ষ্য।
‘১ বিলিয়ন অ্যাক্টস অব কাইন্ডনেস’ প্রচারণার আওতায় একটি যৌথ উদ্যোগে এই গ্রাম তৈরি করা হয়েছে। এতে যুক্ত ছিল ১ বিলিয়ন ফলোয়ার্স সামিট, ভার্কি ফাউন্ডেশন এবং মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভস। গ্রামটি বানানোর কাজে সাহায্য করতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আরও ১০ জন কনটেন্ট ক্রিয়েটর ঘানায় গিয়েছিলেন। ইউটিউবে ১৯ মিনিটের সেই ভিডিওটি ছাড়ার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৩২ মিলিয়ন ভিউ ছাড়িয়ে গেছে।
কিছু দিন আগে ইউটিউবের ইতিহাসে প্রথম কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে ৫০ কোটি সাবস্ক্রাইবারের রেকর্ড গড়েছেন মিস্টারবিস্ট। জিমি মূলত কঠিন সব সারভাইভাল চ্যালেঞ্জ, লাখ লাখ টাকার নগদ পুরস্কার এবং বড় বড় সামাজিক পরীক্ষার মতো ভাইরাল আইডিয়ার ভিডিওর জন্য পরিচিত। তাঁর এই ভিডিওগুলোতে প্রায়ই শত শত মানুষ অংশ নেয় ও এগুলো তৈরি করতে বিশাল সব প্রোডাকশন সেটআপের প্রয়োজন হয়। তাঁর একেকটি ভিডিও তৈরি করতে লাখ লাখ ডলার খরচ হয়। এই বিশাল খরচের টাকা মূলত ইউটিউব বিজ্ঞাপনের আয়, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের স্পনসরশিপ এবং তাঁর অন্যান্য ব্যবসা থেকে আসে, যা তিনি আবার নতুন ভিডিও তৈরির পেছনেই ব্যয় করেন।