চীনের হিউম্যানয়েড রোবট গেমসে নতুন যা দেখা গেল
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয় পাঁচ দিনব্যাপী ‘ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমস’। সেখানে দেখা যায় রোবটগুলোর আছাড় খাওয়া, মজার কাণ্ড আর মারামারির দৃশ্য, যা বিশ্বজুড়ে মানুষকে একই সঙ্গে একাধারে আনন্দ ও অবাক করেছে। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে কৃত্রিম মানুষ তৈরির প্রযুক্তি বা হিউম্যানয়েড রোবোটিকসে চীন তাদের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিষয়টি বেশ স্পষ্টভাবেই তুলে ধরেছে।
রোবট মার্শাল আর্টিস্টদের কিক কিংবা রোবট কুকুরের পিঠে চড়ে পতাকা হাতে ময়দানে প্রবেশের দৃশ্যগুলো ছিল বেশ চমৎকার। বিশেষ করে গেমসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ১০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতা। সেখানে রোবটগুলো প্রচণ্ড গতিতে ছুটে গিয়ে দেয়ালে আছড়ে পড়ে ভেঙে পড়ার দৃশ্যগুলো দেখার মতো ছিল।
অনলাইন দর্শকদের জন্য এসব ছোট ভিডিও ক্লিপ ছিল চীনের চোখধাঁধানো প্রকৌশলগত অগ্রগতির বড় প্রমাণ। আবার অন্যদিকে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের অনেকে এই ভেবেও কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন রোবটগুলো বারবার আছড়ে পড়ে ভেঙে পড়ার কারণে হয়তো মানুষের ওপর এদের রাজত্ব করার সময় এখনো অনেক দূরে।
বক্সিং থেকে শুরু করে ব্রেকড্যান্সিং, সব ধরনের ইভেন্টের রোবটগুলোর দক্ষতা ও হাস্যকর ব্যর্থতার দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর ভাইরাল হয়। ভিডিওগুলোর কমেন্টে অনেকে নানা ঠাট্টাবিদ্রূপ করেছেন। আবার কেউ কেউ সাহায্যহীনভাবে আছড়ে পড়া এসব রোবটের প্রতি একধরণের সহানুভূতিও প্রকাশ করেছেন।
আসলে এই রোবট গেমসের উদ্দেশ্য কেবল বিনোদন দেওয়া ছিল না। চীনের ৬৬০টিরও বেশি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের তৈরি ২ হাজারেরও বেশি রোবট নিয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান ছিল তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনা রোবটের আমদানি নিষিদ্ধ করার পর নিজেদের রোবট বাজার বাড়াতে চীন এই পদক্ষেপ নেয়। একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান যখন তাদের ‘অপটিমাস’ হিউম্যানয়েড বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই চীন বিশ্ববাজারে নিজেদের আধিপত্য প্রমাণ করল।
বর্তমানে বিশ্বের মোট হিউম্যানয়েড রোবট উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশই করে থাকে চীন। গত এক বছরে তারা প্রায় ১২ হাজার ৮০০টি রোবট তৈরি করেছে। রোবট তৈরিতে এই বিশাল আধিপত্য ও সাফল্যের কারণেই প্রতিযোগিতায় হওয়া কিছু ছোটখাটো ভুল বা হাসির ঘটনা চীন খোলামেলাভাবে প্রচার করার সাহস দেখিয়েছে।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টি হিউম্যানয়েড রোবট প্রযুক্তিকে তাদের দেশের অগ্রগতির একটি প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখে। এটি চীনের ভবিষ্যৎ শ্রমিকসংকট সমাধান করতে, সামরিক শক্তি বাড়াতে ও রাষ্ট্রের সার্বিক নজরদারি আরও জোরালো করতে সাহায্য করবে। চীন সরকার শত শত প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানে বিশাল তহবিল দিয়ে রোবট বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করেছে। এটাই এই খাতের প্রযুক্তিকে দ্রুত উন্নত করতে সাহায্য করছে। দেশটির পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় শ্রমিক ঘাটতি মেটাতে ও যুদ্ধের মতো উচ্চঝুঁকিপূর্ণ কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
তবে এই হিউম্যানয়েড রোবটগুলোর সামরিক ব্যবহার মানুষকে গভীরভাবে চিন্তিত করে তুলেছে। অবশ্য সামরিক ক্ষেত্রে রোবট ব্যবহারের দৌড়ে চীন একা নেয়। বেইজিংয়ে যখন এই রোবট প্রদর্শনী চলছিল, ঠিক তখনই ইউক্রেন তাদের রাজধানী কিয়েভে সম্পূর্ণ রোবটিক অস্ত্র ও আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে একটি সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করেছিল।
প্রতিযোগিতায় রোবটগুলোর দুর্ঘটনা ও ব্যর্থতা থেকে বোঝা যায় চীন হিউম্যানয়েড রোবটে যতটা উন্নতি করেছে, এদের বুদ্ধিমত্তা বিকাশে ততটা এগোতে পারেনি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, গত বছরের তুলনায় এই অগ্রগতির গতি বিস্ময়কর। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ত্রিশান্ত নানায়াক্কারা মনে করেন, এই গতিতে এগোলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রযুক্তির বিশ্ব সম্পূর্ণ বদলে যাবে। প্রতিযোগিতাটিতে ‘তিয়াংগং আলট্রা’ নামক একটি রোবট গত বছরের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে ১০০ মিটার দৌড় শেষ করে। আবার লাফানোর উচ্চতা শূন্য দশমিক ৯৬ মিটার থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৪০ মিটারে পৌঁছায়। লিকুইড কুলিং প্রযুক্তি ব্যবহার করার ফলে এদের মোটরের শক্তি ও গতি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে এআই প্রযুক্তিবিদরা মনে করেন, এই গেমসে বিশেষায়িত রোবট তৈরি করা হয়েছিল। অর্থাৎ যে রোবট ভালো দৌড়াতে পারে, সে হয়তো বক্সিং করতে পারে না। এর কারণ এদের এআই মডেলগুলো বাস্তব জগতের জটিলতা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। এই সমস্যা ঠিক করতে আরও অন্তত ১০ বছর সময় লাগতে পারে বলে মনে করেন শীর্ষস্থানীয় রোবোটিকস কোম্পানি ‘ইউনিট্রি’-এর প্রতিষ্ঠাতা ওয়াং জিংজিং। তাঁর মতে, এআই চালিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই এই খাতের প্রধান বাধা।
পরামর্শক জর্জ স্টিলার জানান, প্রদর্শনীতে ভাইরাল হওয়ার মতো আকর্ষণীয় কাজ দেখা গেলেও শিল্পকারখানা বা দৈনন্দিন জীবনে কাজে আসার মতো স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির অভাব ছিল। পাওয়ার টুল ব্যবহার করা, বোতল বা বাক্স খোলা ও পানি ঢালার মতো বাস্তব উপযোগী কাজের জায়গায় রোবটগুলোকে বেশ বেগ পেতে দেখা গেছে। একটি চ্যালেঞ্জে টেবিল থেকে ছোট বস্তু তুলতে ও পাত্রে পানি ঢালতে গিয়ে রোবটটি ব্যর্থ হলে দ্রুত দৃশ্যপট বদলে দেওয়া হয়। ফলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হিউম্যানয়েড রোবটকে বাস্তবে কার্যকর করে তুলতে এখনো প্রচুর গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে।