ভালুকের ভয়ে জাপানে প্রায় ১০০ স্কুল বন্ধ

একটি জুনিয়র হাইস্কুলের খেলার মাঠে আরেকটি ভালুক ঘুরে বেড়াতে দেখেন স্থানীয় লোকজন

জাপানের একটি শহরে হঠাৎ বেশ কয়েকটি ভালুকের আনাগোনা দেখা গেছে। কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে সেখানকার প্রশাসন একসঙ্গে প্রায় ১০০ স্কুল বন্ধ ঘোষণা করেছে। শহরজুড়ে এখন চলছে ভালুক খোঁজার তল্লাশি। শুধু এই শহরেই নয়, জাপানের আরও কয়েকটি এলাকা থেকেও ভালুকের আক্রমণের খবর পাওয়া গেছে।

টোকিওর ঠিক উত্তর দিকে অবস্থিত উৎসোনোমিয়া শহরে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস। শহরের বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা দলের তথ্য অনুযায়ী, ৬ জুন, শনিবার প্রথম সেখানে একটি ভালুক দেখা যায়। এর ঠিক পরদিনই একটি জুনিয়র হাইস্কুলের খেলার মাঠে আরেকটি ভালুক ঘুরে বেড়াতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। এমনকি সেই রাতেই শহরের ব্যস্ত একটি শপিং এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরায়ও ধরা পড়ে আরেকটি ভালুকের ছবি।

বন্য প্রাণী দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এর পর থেকে শহরের বিভিন্ন কোনায় একের পর এক ভালুক দেখার খবর আসছে। এমনকি গত সোমবার রাতেও পুলিশ কর্মকর্তারা শহরের ভেতর একটি ভালুকের ঘুরে বেড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আরও পড়ুন

শহরের শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিরাপত্তার স্বার্থে গত সোমবার থেকেই সব সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে এই সপ্তাহের শেষের দিকে স্কুলগুলো আবার খুলবে কি না, তা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো পরিষ্কার করে জানানো হয়নি।

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কর্মকর্তা ও স্থানীয় শিকারি দলের সদস্যরা মঙ্গলবার শহরজুড়ে বিশেষ টহল দেন। এরপর বেশ কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় সেই রাতে তাঁরা সফলভাবে ভালুকটিকে ধরতে সক্ষম হন। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, শিকারিরা একটি বিশেষ বন্দুক দিয়ে ঘুমের ওষুধ ছুড়ে ভালুকটিকে অচেতন করেন। পরে সেটিকে ট্রাকে তুলে নিয়ে যান।

কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে সেখানকার প্রশাসন একসঙ্গে প্রায় ১০০ স্কুল বন্ধ ঘোষণা করেছে
ছবি: নিউইয়র্ক টাইমস

এদিকে শহরের কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার জন্য বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। ভালুক যেন হুট করে ঘরে ঢুকে পড়তে না পারে, সে জন্য বাড়ির দরজা-জানালা সব সময় লক করে রাখা এবং রাতের বেলা বাড়ির বাইরে ময়লা-আবর্জনা না ফেলা।

জাপানে ভালুকের এই উপদ্রব অবশ্য নতুন কিছু নয়। গত বছরেও সেখানে ভালুকের হামলায় রেকর্ডসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল, যা একটি জাতীয় জরুরি অবস্থায় হয়ে যায়। অবস্থা এতটাই বেগতিক ছিল উপদ্রবপ্রবণ এলাকাগুলোতে সরকারকে সেনা নামাতে হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাও জাপানে ভ্রমণের ব্যাপারে সতর্কতা জারি করেছিল। সে সময় সুপারমার্কেটের ভেতরে ভালুকের খাবার খোঁজার কিংবা স্কুলের মাঠে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ানোর বেশ কিছু ভিডিও ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়, যা সাধারণ মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করেছিল।

আরও পড়ুন

হঠাৎ ভালুকের এমন লোকালয়ে চলে আসা ও মানুষের ওপর আক্রমণের পেছনে মূলত তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথম সেখানে ভালুকের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। কয়েক বছর ধরে বন্য ভালুক শিকারের পরিমাণ কমে যাওয়ায় বনে এদের সংখ্যা এত বেড়ে গেছে।

আরেকটি কারণ খাবারের অভাব। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে বনে আগের মতো ফলমূল বা খাবার মিলছে না। ফলে ক্ষুধার্ত ভালুকেরা খাবারের খোঁজে লোকালয়ে আসছে। এ ছাড়া জাপানের প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ এলাকাগুলো থেকে মানুষ আস্তে আস্তে শহরের দিকে চলে যাচ্ছে। ফলে ফাঁকা হয়ে যাওয়া সেই সব জনপদে বন্য ভালুকেরা খুব সহজেই নিজেদের রাজত্ব গড়ে তুলছে।

জাপানে মূলত দুই ধরনের ভালুক দেখা যায়—এশিয়ান কালো ভালুক এবং হোক্কাইডো দ্বীপে থাকা বড় আকারের বাদামি ভালুক
গেটি ইমেজেস

গত বছরের শেষের দিকে ভালুকের আক্রমণের ঘটনা রেকর্ড ছুঁয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে শীতকাল আসায় ভালুকেরা শীতনিদ্রায় চলে যায়। ফলে সাময়িকভাবে আক্রমণও কমে আসে। কিন্তু জাপানে এখন গ্রীষ্মকাল চলছে। আবহাওয়া গরম হতেই ভালুকেরা এদের দীর্ঘ ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। আর খাবারের খোঁজে আবারও শহর নগরে হানা দিচ্ছে। ২ জুন উৎসোনোমিয়া থেকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দূরে ফুকুশিমার একটি ইস্পাত কারখানায় ভালুকের হামলায় চার শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন।

জাপানের সরকারি গণমাধ্যম এনএইচকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ২ জুনের মধ্যে দেশটির অন্তত নয়টি রাজ্যজুড়ে ভালুকের আক্রমণে ৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আরও ২০ জন আহত হয়েছেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলোর বেশির ভাগই ঘটেছে পাহাড়ি অঞ্চলে। যেখানে বুনো শাকসবজি ও ফলমূল সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থানীয় মানুষ আকস্মিক ভালুকের মুখে পড়েছেন।

সূত্র: সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান
আরও পড়ুন