সাইক্লিংয়ে বিশ্বসেরা ১৫ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ
শহরের রাস্তায় তাকালে গাড়ির ভিড়ে চলাচল করাই মুশকিল। মানুষের চেয়ে যেন গাড়ি বেশি! অনেকেই ভিড় থেকে বাঁচতে সাইকেল ব্যবহার করেন। তাই বিশ্বসেরার তালিকায়ও উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম।
সম্প্রতি সায়েন্টিফিক আমেরিকান ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে বিশ্বের হাঁটা ও সাইকেলবান্ধব শহরগুলোর নাম। গবেষকেরা ১২১টি দেশের প্রায় ১১ হাজার ৫৮৭টি শহরের গুগল ম্যাপের ডেটা ঘেঁটে এই তালিকা তৈরি করেছেন।
গবেষণা বলছে, সাইকেল চালানোর দিক দিয়ে বিশ্বের সেরা শহর এখন নেদারল্যান্ডসের ওয়াজেনিনজেন। সেখানে বেশির ভাগ মানুষই সাইকেল চালান। গবেষকদের মতে, যেসব শহরে জনবসতি ঘন এবং প্রচুর বাইক লেন আছে, সেখানেই মানুষ বেশি সাইকেল চালান বা হাঁটেন।
এই গবেষণায় সাইকেল চালানোর চার্টে সেরা ১৫ দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। তবে হাঁটার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের চিত্রটি বেশ করুণ। গবেষণায় দেখা যায়, হাইতি বা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় মানুষ প্রচুর হাঁটেন। কিন্তু হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক ক্যারল টার্লি ভলগারিস এর পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন।
ক্যারল টার্লি ভলগারিসের মতে, ‘আমাদের মতো দেশগুলোয় হাঁটা কোনো শখ নয়, এটা প্রয়োজন। পকেটে টান পড়লে বা গাড়ি কেনার সামর্থ্য না থাকলে মানুষ বাধ্য হয়েই হাঁটে। ধনী দেশগুলোয় মানুষ হাঁটে বা সাইকেল চালায় ব্যায়ামের জন্য। উন্নয়নশীল দেশে মানুষ হাঁটে শুধু বাসভাড়া বাঁচাতে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ বেশি হাঁটে জ্যামের হাত থেকে বাঁচতে। যদিও হাঁটার তালিকায় নেই বাংলাদেশের নাম।’
অনেকে মনে করেন, আমাদের দেশে প্রচণ্ড গরম ও বৃষ্টির কারণে সাইকেল চালানো বা হাঁটা কঠিন। কিন্তু গবেষণা বলছে, এই ধারণা ভুল। চার্টের তথ্যমতে, আবহাওয়া বড় কোনো বাধা নয়। তীব্র শীতের দেশ হোক কিংবা কাঠফাটা রোদের দেশ, মানুষ সব পরিবেশেই হাঁটতে বা সাইকেল চালাতে পারেন। অবশ্য রাস্তা যদি ঠিক থাকে। কারণ, আসল বাধা হলো উঁচু–নিচু পাহাড়ি রাস্তা। ভাগ্যিস, ঢাকায় পাহাড়ি রাস্তা নেই। বাংলাদেশের বেশির ভাগ বড় শহরগুলো সমতল। অর্থাৎ আমাদের আবহাওয়া হাঁটার উপযোগীই আছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ১ শতাংশ মানুষ যাতায়াতের জন্য সাইকেল ব্যবহার করেন। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসে এই হার ২৮ ! ডাচরা যে জন্মগতভাবে সাইকেল চালাতে ভালোবাসে, তা নয়। তাদের শহরের ডিজাইনটাই এমন যে সাইকেলে চড়ে স্কুলে যাওয়া বা বাজারে যাওয়াটাই সবচেয়ে সহজ। যুক্তরাষ্ট্রে যদি স্কুল বা অফিস কাছে হতো এবং রাস্তা নিরাপদ হতো, তাহলে তারাও সাইকেল চালাত।
সবাইকে যে নেদারল্যান্ডসের মতো হতে হবে, তা–ও নয়। জাপানের ওসাকা বা কেনিয়ার নাইরোবির উদাহরণ আমাদের কাজে লাগতে পারে। ওসাকায় সরু রাস্তায় গাড়িগুলো খুব ধীরগতিতে চলে, যাতে পথচারীরা নিরাপদে হাঁটতে পারেন। আর নাইরোবি তাদের বাজেটের ২০ শতাংশ খরচ করে শুধু হাঁটা ও সাইকেলের রাস্তা ঠিক করার জন্য।
ঢাকায়ও যদি কোপেনহেগেনের মতো নিরাপদ সাইকেল নেটওয়ার্ক থাকত, তবে ব্যক্তিগত গাড়ির ধোঁয়া ৬ শতাংশ কমে যেত। আর হৃদ্রোগ কমে যাওয়ার কারণে হাজার হাজার কোটি টাকার স্বাস্থ্য খরচ বাঁচত।
পরিসংখ্যান বলছে, আমরা প্রচুর হাঁটি। কিন্তু সেই হাঁটা আরামদায়ক নয়; বরং যুদ্ধজয়ের মতো। ফুটপাত নেই, থাকলেও ভাঙাচোরা, তার ওপর ফুটপাতে দোকান জঞ্জাল। আমাদের হাঁটার হার বেশি, এটা কোনো গর্বের বিষয় নয়। আমরা বাধ্য হয়ে বেশি হাঁটি। যতটুকু রাস্তা হেঁটে যেতে ২০ মিনিট লাগে, ওই পথ গাড়িতে গেলে অনেক সময় ৩০ মিনিটের বেশি সময় লাগে। তাই অল্প দূরত্বের রাস্তা মানুষ হাঁটতেই পছন্দ করেন।
সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান