আলুভাজার নাম ফ্রেঞ্চ ফ্রাই হলো কীভাবে
ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের কথা শুনলেই জিবে জল চলে আসে অনেকের। রেস্তোরাঁয় খাবারের অর্ডার দিলে যখন পাতে মুচমুচে আলুভাজা আসে, তখন ডায়েট ভুলে আলুর দিকে হাত বাড়ায় সবাই। বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় এই খাবারের নাম ‘ফ্রেঞ্চ ফ্রাই’ কেন? ফ্রান্স থেকেই কি এ খাবারের উৎপত্তি? এক প্লেট ফ্রেঞ্চ ফ্রাই হাতে নিয়ে জেনে নেওয়া যাক এর রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
নাম ফ্রেঞ্চ, কিন্তু উৎস কি ফ্রান্সে
নামে ‘ফ্রেঞ্চ’ থাকলেও এ খাবারের উৎপত্তিস্থল নিয়ে রয়েছে দীর্ঘ বিতর্ক। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের সঙ্গে ফ্রান্সের সরাসরি যোগাযোগ খুব একটা নেই। এর প্রধান কারণ হলো আলুর ইতিহাস। কলম্বাসের আমেরিকা অভিযানের আগে ইউরোপ বা তথাকথিত ‘পুরোনো বিশ্ব’ আলুর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানত না। আবার ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের মালিকানা নিয়ে বেলজিয়াম ও ফ্রান্সের মধ্যে লড়াই বেশ পুরোনো। বেলজিয়ানদের দাবি, খাবারটি তাদের। প্রচলিত আছে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সৈন্যরা বেলজিয়ামে গিয়ে এই সুস্বাদু ভাজা আলু খেয়েছিলেন। যেহেতু বেলজিয়ামের একটি বড় অংশের ভাষা ছিল ফরাসি বা ‘ফ্রেঞ্চ’, তাই মার্কিন সৈন্যরা একে ভালোবেসে ডাকতে শুরু করেন ‘ফ্রেঞ্চ ফ্রাই’। তবে ফরাসিদের দাবি, এই রান্নার কৌশল বেলজিয়ানরা শিখেছে ফরাসি শেফদের কাছ থেকেই।
কাটিং স্টাইল বা ‘ফ্রেঞ্চিং’ রহস্য
আগেই বলেছি, অনেকে মনে করেন, এ খাবারের নামের সঙ্গে ফ্রান্সের কোনো সম্পর্কই নেই! রন্ধনশৈলীর পরিভাষায় কোনো সবজিকে চিকন ও লম্বা ফালি করে কাটাকে বলা হয় ‘ফ্রেঞ্চিং’ (Frenching)। যেহেতু আলুকে এভাবে সরু করে কেটে ভাজা হয়, তাই এর নাম হয়েছিল ‘ফ্রেঞ্চড ফ্রায়েড পটেটো’ (Frenched Fried Potato)। কালক্রমে মানুষের মুখে মুখে ‘ফ্রেঞ্চড’ শব্দটি ছোট হয়ে আজকের জনপ্রিয় ‘ফ্রেঞ্চ ফ্রাই’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
দক্ষিণ আমেরিকা ও আলুর ইতিহাস
খাদ্য ইতিহাসবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, আলুভাজার আসল জন্মস্থান দক্ষিণ আমেরিকায়। ১৬২৯ সালে চিলির নেসিমিয়েনতো শহরে বন্দী ছিলেন স্প্যানিশ সৈনিক ফ্রান্সিসকো নুনেজ ডে পিনেদা। তিনি তাঁর ডায়েরিতে প্রথম ভাজা আলুর কথা উল্লেখ করেন। পিনেদা দেখেছিলেন, আদিবাসী নারীরা আপ্যায়নের জন্য ‘পাপাস ফ্রিতাস’ বা লম্বা আলুভাজা পরিবেশন করেন।
পরবর্তী সময়ে স্প্যানিশরা এই রেসিপি ইউরোপে নিয়ে আসে। তবে অধ্যাপক পল ইগেমাস এক ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। বেলজিয়ামের বার্জাস শহরে অবস্থিত বিশ্বের একমাত্র আলু জাদুঘর ‘ফ্রেতাস মিউজিয়াম’-এর কিউরেটর তিনি। তাঁর মতে, স্পেনের যাজিকা সেন্ট তেরেসা অব আভিয়া প্রথম আধুনিক ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের মতো করে আলুভাজা চালু করেন।
নাম ও জনপ্রিয়তার কারণ
যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন ছিলেন গরম ডুবোতেলে ভাজা আলুর ভক্ত। ১৮০২ সালে হোয়াইট হাউসের শেফরা যখন এটি পরিবেশন করতেন, তখন খাবারটিকে বলা হতো ‘ফ্রেঞ্চ ফ্রায়েড পটেটোজ’। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, হোয়াইট হাউসের ফরাসি শেফ অনার জুলিয়েন আলুকে চিকন লম্বা করে কেটে ভাজার এ বিশেষ কায়দা প্রবর্তন করেন। তাঁর সম্মানেই খাবারটির নাম স্থায়ীভাবে ‘ফ্রেঞ্চ ফ্রাই’ হয়ে যায়।
ছাপার অক্ষরে এ নামের প্রথম দেখা মেলে ১৮৫৬ সালে। এলিজা ওয়ারেন নামের এক ইংরেজ লেখক তাঁর ‘কুকারি ফর মেইডস অব অল ওয়ার্ক’ বইয়ে প্রথম ফ্রেঞ্চ ফ্রাই তৈরির প্রণালি বর্ণনা করেন।
বিশ্বজয়ের রহস্য
সারা বিশ্বে আলুর সহজলভ্যতা এবং ফাস্ট ফুড–সংস্কৃতির প্রসারের কারণে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আজ বিশ্বজনীন। ম্যাকডোনাল্ডস, কেএফসি বা বিভিন্ন ফাস্ট ফুড চেইন শপগুলো তাদের প্রধান খাবারের সঙ্গে মুখরোচক ‘সাইড ডিশ’ হিসেবে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইকে অপরিহার্য করে তুলেছে। তৈরি করা সহজ এবং স্বাদে অতুলনীয় হওয়ায় এর কদর দিন দিন বাড়ছে। তবে ডুবোতেলে ভাজা খাবারটি অতিরিক্ত খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তবে মাঝেমধ্যে পরিমিত পরিমাণে খেলে স্বাদের সঙ্গে সুস্বাস্থ্যের চমৎকার সমন্বয় রাখা সম্ভব।