স্মার্টফোনের যুগেও কেন মানুষ ছবি প্রিন্ট করে
শেষ কবে স্টুডিওতে গিয়ে ছবি প্রিন্ট করিয়েছ কিংবা একটা আস্ত অ্যালবাম হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখেছ কবে? মনে করতে পারছ না তো? পারার কথাও নয়। তুমি যদি অ্যানালগ ক্যামেরার খুব বড় ভক্ত না হও, তবে কাগজের ছবি দেখার ঘটনাটা তোমার জীবনে এখন বিরল।
এখন তো স্মার্টফোনের যুগ। আমাদের সবার পকেটে এখন হাজার হাজার ছবি। ক্লাউড স্টোরেজে জমা আছে আরও কয়েক গুণ। এটা প্রযুক্তির আশীর্বাদ, সন্দেহ নেই। কিন্তু এই ছবি জমিয়ে রাখার অভ্যাসটা কিন্তু মাঝেমধ্যে বেশ বিরক্তিকর হয়ে ওঠে।
ফোনে এত এত ছবি থাকে যে দরকারের সময় প্রিয় ছবিটা খুঁজে পাওয়া যেন খড়ের গাদায় সুচ খোঁজা। আবার সামনাসামনি আড্ডায় কাউকে নির্দিষ্ট কোনো ট্যুরের ছবি দেখাতে গেলে গ্যালারি ঘাঁটতে ঘাঁটতে জান বের হয়ে যায়। তাই বিশেষ কোনো ট্যুর বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো অনুষ্ঠানের ছবিগুলো বাছাই করে প্রিন্ট করে রাখার বুদ্ধিটা কিন্তু মন্দ নয়!
প্রযুক্তির এ যুগে কেউ যে ছবি প্রিন্ট করে রাখে না, তা কিন্তু নয়। প্রিয় ছবিগুলো প্রিন্ট করে রাখা মানেই ব্যাকডেটেড বা পিছিয়ে পড়া মানুষ নয়। এর আরও কিছু গুণ আছে। চলো, সেই গুণ বা কারণগুলো একটু দেখে নেওয়া যাক।
ফোনটা যখন অন্যের হাতে
আমরা সবাই কমবেশি এ কাজ করি। কাউকে একটা ছবি দেখানোর জন্য নিজের ফোনটা তার হাতে দিয়ে দিই। কাজটা সহজ, কিন্তু এর কিছু বিপদও আছে। ফোনে তোমার ব্যক্তিগত অনেক কিছুই থাকতে পারে, যা তুমি সবার সঙ্গে শেয়ার করতে চাও না। ধরো, তুমি একটা ছবি দেখালে, আর তোমার বন্ধুটি সোয়াইপ করে পরের ছবিতে চলে গেল, যেটি হয়তো তুমি তাকে দেখাতে চাওনি। কিংবা হুট করে এমন একটা নোটিফিকেশন পপ-আপ করল, যা দেখে তুমি বিব্রত হলে। আর সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হলো কেউ ইচ্ছা করেই তোমার ফোনে উঁকিঝুকি মারতে পারে।
অথচ একটা ছবির অ্যালবাম হাতে ধরিয়ে দিলে এসবের কোনো বালাই নেই। অন্যের বাড়িতে গিয়ে টিভিতে ফোন কানেক্ট করার যুদ্ধ করার চেয়ে একটা অ্যালবাম এগিয়ে দেওয়া অনেক বেশি সহজ!
বাছাই করার আনন্দ
সস্তা ক্লাউড স্টোরেজের যুগে প্রতিদিন ডজন ডজন ছবি তোলা আর সেগুলো সেভ করে রাখা খুব সহজ। আমরা ভাবি, দরকার হলে খুঁজে নেব। কিন্তু সত্যিটা হলো হাজার ছবির ভিড়ে সেই ফিরে দেখা আর হয় না।
ছবি প্রিন্ট করতে গেলে তোমাকে বাধ্য হয়েই ছবিগুলো ঘাঁটতে হবে, সেরা ছবিটা বেছে নিতে হবে। বিশ্বাস করো, পুরোনো ছবি ঘেঁটে সেরাটা খুঁজে বের করার মধ্যে একটা আলাদা আনন্দ আছে। এরপর সেই ছবিগুলো অ্যালবামে সাজানো, কোনটার পর কোনটা থাকবে, সেটা ঠিক করাও একটা শিল্প।
ডিজিটাল ফোল্ডার বা গুগল ফটোসে অ্যালবাম বানানো কাজের মতো মনে হতে পারে, কিন্তু নিজের হাতে কাগজের ছবি সাজানোটা মস্তিষ্কের জন্য দারুণ ব্যায়াম। এতে সৃজনশীলতার তৃপ্তি পাওয়া যায়।
প্রযুক্তি আজ আছে, কাল নেই
গুগল বা অ্যাপলের মতো কোম্পানিগুলোকে দেখে মনে হতে পারে এরা অমর, এরা চিরকাল থাকবে। কিন্তু প্রযুক্তির ইতিহাস বলছে, অসম্ভব বড় কোম্পানিও একদিন হারিয়ে যেতে পারে। সঙ্গে নিয়ে যাবে তোমার সব ডেটা।
আমি বলছি না কালই গুগল বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু যদি কখনো এমন কিছু হয়? যে সার্ভারে তোমার সব স্মৃতি জমা, সেটা যদি বন্ধ হয়ে যায়? তখন সেই ডুবন্ত জাহাজ থেকে ছবিগুলো সরিয়ে আনার দায়িত্ব তোমার বা তোমার পরবর্তী প্রজন্মের ওপর পড়বে। আর জীবন তো সব সময় সরলরেখায় চলে না, হয়তো তুমি ডেডলাইন মিস করে ফেললে! তখন কী হবে?
আবার ধরো, কোনো টেকনিক্যাল গ্লিচ বা ভুলে ক্লাউড সাবস্ক্রিপশনের বিল না দেওয়ায় তোমার সব ছবি ডিলিট হয়ে গেল। তখন? কাগজের ছবির ক্ষেত্রে এই ভয় নেই। ওগুলো তোমার ঘরেই থাকে। আগুন বা বড় দুর্ঘটনা ছাড়া ওগুলো হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই।
স্পর্শের অনুভূতি ও স্মৃতি
২০ বছর পর ইনস্টাগ্রামের একটা পোস্টের চেয়ে হাতে ধরা একটা জীর্ণ ছবির দাম তোমার কাছে অনেক বেশি হবে। কাগজের ছবি একটা ফিজিক্যাল অবজেক্ট, যার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্পর্শের অনুভূতি। তুমি যেকোনো আড্ডায় অ্যালবামটা বের করতে পারো, যখন খুশি পাতা উল্টে স্মৃতিচারণা করতে পারো।
আর একটা নির্মম সত্য বলি। শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যিটা হলো আমরা কেউ চিরকাল থাকব না। আমাদের অবর্তমানে আমাদের প্রিয়জনেরা কি পাসওয়ার্ড ব্রেক করে ক্লাউড ঘাঁটবে, নাকি আলমারিতে রাখা ধুলোমাখা অ্যালবামটাই বুকে জড়িয়ে ধরবে?
একটা সুন্দর করে সাজানো অ্যালবাম তোমার স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখবে। ডিজিটাল–দুনিয়ায় গোস্টবট হয়ে থাকার চেয়ে ড্রয়ারের কোণে প্রিয় অ্যালবামে বেঁচে থাকাটা কি বেশি রোমান্টিক নয়? তাই মাঝেমধ্যে সব ভুলে পুরোনো দিনের মতো কিছু ছবি প্রিন্ট করেই দেখো না। স্মৃতির অ্যালবামটা ভারী হোক!
সূত্র: পপুলার সায়েন্স