সূর্য হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেলে পৃথিবীতে জীবন কত দিন টিকবে
সকালের ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছ। মিষ্টি রোদ এসে গায়ে পড়ার কথা। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা সকাল আটটা ছুঁলেও চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার! না, কোনো সূর্যগ্রহণ নয়। আকাশে কোনো সূর্যেরই অস্তিত্ব নেই! সৌরজগতের প্রাণভোমরা, আমাদের চিরচেনা সূর্যটা হঠাৎ করেই যেন জাদুর মতো হাওয়া হয়ে গেছে। আলো নেই, উত্তাপ নেই, চারদিকে শুধু ভয়ংকর, হাড়হিম করা নিস্তব্ধতা। এটা কোনো গল্পের প্লট নয়, শুধু কল্পনা। সূর্য হঠাৎ উধাও হয়ে গেলে পরিস্থিতি কেমন হতে পারে, তা কল্পনা করলাম মাত্র।
সূর্য ছাড়া আমাদের এই সাধের পৃথিবী ঠিক কতক্ষণ টিকবে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বৈজ্ঞানিক যুক্তি এবং হলিউডের থ্রিলার মুভি যেন এক বিন্দুতে এসে মেলে। কেন বলছি এ কথা?
সূর্য ‘হাওয়া হয়ে যাওয়া’ বলতে দুটি জিনিস বোঝাতে পারে। প্রথমত, কোনো ঐশ্বরিক ক্ষমতাবলে যদি সূর্যের পুরো অস্তিত্বই মুছে যায়, তবে ঘটনাটা হবে সবচেয়ে ভয়ংকর। পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার। আলোর এই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ডের মতো। অর্থাৎ সূর্য গায়েব হওয়ার ঠিক আট মিনিট পর আমরা বুঝতে পারব, সর্বনাশ হয়ে গেছে।
সূর্যের বিশাল মহাকর্ষ বলের কারণেই পৃথিবী তার নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘোরে। ভর গায়েব হওয়ার আট মিনিট পর সেই মহাকর্ষের দড়িটা হঠাৎ ছিঁড়ে যাবে। পৃথিবী ঘণ্টায় এক লাখ সাত হাজার কিলোমিটার বেগে সৌরজগতের সীমানার দিকে সোজা ছিটকে বেরিয়ে যাবে! ঠিক যেন গুলতি থেকে ছোড়া পাথর।
ঘণ্টায় ৪৭ হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটতে থাকা বিশাল গ্রহ বৃহস্পতিকে হয়তো একসময় আমরা ধরে ফেলব। হয়তো পৃথিবী নামে গ্রহটা দৈত্যাকার বৃহস্পতির আরেকটা নতুন চাঁদ হয়েই ঘুরতে থাকবে! তবে অত দূর যাওয়ার আগেই, গ্রহাণু বলয়ের বিপদের মুখে পড়ার অনেক আগেই পৃথিবীর সব প্রাণ ঠান্ডায় জমে বরফ হয়ে যাবে।
এ ছাড়া আরেকটা সম্ভাবনা আছে। এটি একটু অন্য রকম। ধরো, সূর্যের ভর ঠিকই আছে; কিন্তু হঠাৎ করে এর আলো আর উত্তাপ দেওয়া বন্ধ হয়ে গেল। আট মিনিট পর পৃথিবীর সব উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। তবে মজার ব্যাপার হলো, সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু আমরা মারা পড়ব না। কারণ, রাতের অন্ধকারের সঙ্গে আমাদের বেশ ভালোই পরিচয় আছে।
আসল বিপদটা শুরু হবে কয়েক দিন পর। পৃথিবীর পৃষ্ঠ দ্রুত তাপ হারাতে শুরু করবে। এক সপ্তাহের মধ্যে পৃথিবীর উপরিভাগের সব পানি জমে বরফ হতে শুরু করবে। গাছপালা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে। শীতে জমতে শুরু করবে ভূপৃষ্ঠের সব প্রাণী। তবে আমরা সহজে হার মানব না।
আসলে মানুষ কিন্তু সহজে হার মানার পাত্র নয়। আমাদের আছে জীবাশ্ম জ্বালানি ও পারমাণবিক শক্তির এক বিশাল ভান্ডার। মহাকাশ থেকে দেখলে হয়তো তখনো পৃথিবীর বড় শহরগুলোকে জ্বলজ্বল করতে দেখা যাবে। আমরা আমাদের ঘরবাড়ি গরম রাখব, বিশাল সব কৃত্রিম গ্রিনহাউস তৈরি করে সেখানে নিজেদের প্রয়োজনীয় খাবার ও গবাদিপশুর জন্য ঘাস জন্মাব।
তবে এই বেঁচে থাকার লড়াইটা কি সবার জন্য হবে? একদমই না। পারমাণবিক শক্তি ও কৃত্রিম আলোয় বেঁচে থাকার এই বিলাসবহুল টিকিট পাবে শুধু বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও ক্ষমতাবান মানুষেরা। সাধারণ মানুষ, যাদের সেই অর্থ বা ক্ষমতা নেই, তারা এই ভয়ংকর ঠান্ডায় শুধু না খেয়ে এবং বরফে জমে মারা পড়বে।
মানুষ না থাকলে পৃথিবীর চেহারা কেমন হবে? এক বছরের মধ্যে গভীর মহাসাগরগুলো ছাড়া পৃথিবীর সব জলাশয় পুরোপুরি বরফে পরিণত হবে। সব সামুদ্রিক প্রাণী মারা পড়বে।
দুই বছর পর ঘটবে সবচেয়ে অবাক করা ঘটনা। তাপমাত্রা কমতে কমতে যখন মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামবে, তখন বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন গ্যাস তরল হয়ে বৃষ্টির মতো ঝরতে শুরু করবে! আর মাইনাস ১৮৩ ডিগ্রিতে নামার পর আকাশ থেকে ঝরবে নীল রঙের অক্সিজেনের তুষার! ভূপৃষ্ঠের সব প্রাণ এবং মাটির ব্যাকটেরিয়া তত দিনে চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
তবে মহাসাগরগুলোর একদম তলদেশে, যেখানে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ তাপ এখনো পৌঁছায়, সেখানকার সেই হাইড্রোথার্মাল ভেন্টগুলোতে বেঁচে থাকবে কিছু টিউবওয়ার্ম বা নল-কৃমি। সেগুলো অবশ্য পৃথিবীর মোট প্রাণের ০.০০১ শতাংশেরও কম। পৃথিবীর উপরিভাগে যখন ধ্বংসলীলা চলছে, এরা হয়তো সে খবর টেরও পাবে না। লাখো বছর ধরে হয়তো এরা দিব্যি বেঁচে থাকবে। তবে পানি বরফ হয়ে যাওয়ার কারণে টেকটোনিক প্লেটগুলোর নড়াচড়া করার পিচ্ছিলকারক পদার্থ, মানে লুব্রিকেন্ট আর থাকবে না। ফলে পৃথিবীর প্লেটগুলো আটকে গিয়ে শুরু হবে ভয়ংকর সব ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত।
ধরো, সূর্য নিভে যাওয়ার এক বছর আগে আমরা একটা সতর্কবার্তা পেলাম। কী করব আমরা তখন? বিজ্ঞানীদের মতে, আমরা হয়তো চরম একটা পাগলামি করে বসব। পৃথিবীর সব বনজঙ্গল, যা এমনিতেই মারা যাবে, সেগুলোতে আমরা আগুন লাগিয়ে দেব। উদ্দেশ্য একটাই—বিশাল এক মেগা-গ্রিনহাউস ইফেক্ট তৈরি করে পৃথিবীর তাপমাত্রাকে অন্তত শূন্য ডিগ্রির কাছাকাছি ধরে রাখা।
মাটির নিচে হয়তো কোটি মানুষের জন্য বিশাল বাংকার বানানো হবে। কিন্তু এই বাংকারে জায়গা পাওয়া নিয়ে শুরু হবে এক ভয়ংকর বিশ্বযুদ্ধ। নিম্ন আয়ের দেশগুলোর মানুষেরা মরিয়া হয়ে উন্নত দেশগুলোতে আক্রমণ চালাবে। মানুষ প্রকৃতির ছোঁয়া ছাড়া, একনায়কতন্ত্রের কঠিন শাসনে মাটির নিচে থাকতে থাকতে চরম মানসিক অবসাদে ভুগবে।
এরপর আমাদের দরকার হবে একটা আশার আলো। আমরা হয়তো ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করব এক বিশাল মহাকাশযান। ১০০ কোটিরও কম মানুষ এবং পৃথিবীর সব প্রজাতির ডিএনএ নিয়ে সেই মহাকাশযান পাড়ি দেবে অসীম মহাকাশে। গন্তব্য অজানা। হয়তো কয়েক শ প্রজন্ম সেই মহাকাশযানেই জন্মাবে এবং মারা যাবে, শুধু নতুন একটা বাসযোগ্য গ্রহের আশায়।
এ সবই আসলে অলীক কল্পনা। হঠাৎ সূর্যের উধাও হতে বয়েই গেছে!