√২ কেন অমূলদ সংখ্যা
আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের এক গোপন সংঘের সদস্য তুমি। কল্পনা করো শুধু, কল্পনা করতে তো আর ক্ষতি নেই। গোপন সংঘে তোমরা সবাই মিলে দিনরাত গণিত নিয়ে গবেষণা করো। হঠাৎ একদিন তুমি অঙ্কের এমন একটা ভয়ংকর সত্যি আবিষ্কার করে ফেললে, যা তোমাদের সংঘের সবচেয়ে বড় নিয়মের একদম উল্টো! তুমি সরল মনে সেটা সবাইকে জানিয়ে দিলে। সংঘের গুরু তো রেগেমেগে আগুন। তিনি নির্দেশ দিলেন, তোমাকে মাঝসাগরে নিয়ে নৌকা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে মেরে ফেলতে!
কী টানটান একটা থ্রিলার গল্পের প্লট মনে হচ্ছে না? মুভির কাহিনিও ভাবতে পারো। কল্পনা করতে পারো যা খুশি তাই; কারণ, কল্পনা করতে তো কোনো দোষ নেই। কিন্তু এই কাহিনি কোনো কল্পনা নয়। এটি গণিতের ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং ভয়ংকর একটি সত্যি ঘটনা। যে লোকটিকে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, তাঁর নাম হিপ্পাসাস। তাঁর অপরাধ ছিল, তিনি এমন একটা সংখ্যার রহস্য ফাঁস করে দিয়েছিলেন, যা ওই গোপন সংঘের গুরু কিছুতেই মানতে চাননি। সেই ভয়ংকর, অবাধ্য আর ঘাড়ত্যাড়া সংখ্যাটির নাম √২।
চলো, আজ আমরা গোয়েন্দা হয়ে সেই আড়াই হাজার বছর আগের রহস্যের জট খুলি। √২ সংখ্যার ভেতর কী এমন লুকিয়ে আছে, যার জন্য আস্ত একটা মানুষকে সাগরে ডুবিয়ে মারা হলো? একে কেনই-বা অমূলদ সংখ্যা বলা হয়?
দুই
গোপন সংঘের কথা জানলাম, ছাত্রের নামও জানা হলো। কিন্তু এই সংঘের গুরু কে ছিলেন? কে নিজের ছাত্রকে পানিতে ফেলে মারার নির্দেশ দিয়েছিলেন? পিথাগোরাস। নামটা শুনে চমকে যেও না কিন্তু। গোপন সংঘের সেই গুরুর নাম ছিল পিথাগোরাস। স্কুলের জ্যামিতি বইয়ে নিশ্চয়ই এ নাম তুমি শুনেছ! কিন্তু একটা সংখ্যার জন্য কেন গুরু এমন সিদ্ধান্ত নিলেন?
কারণ, পিথাগোরাস আর তাঁর ছাত্ররা বিশ্বাস করতেন, এই মহাবিশ্বের সবকিছুই সংখ্যা দিয়ে তৈরি। তাঁদের কাছে সংখ্যা মানেই হলো খুব সুন্দর, পরিপাটি ও নিখুঁত ভগ্নাংশ। মানে যেগুলোকে আমরা মূলদ সংখ্যা বলি।
যেমন ধরো, তোমার কাছে তিনটি আপেল আছে, তুমি চারজন বন্ধুর মধ্যে ভাগ করে দিলে। প্রত্যেকে পেল ৩/৪ অংশ। খুব সুন্দর একটা ভগাংশ না? দেখতেও একটা ভদ্র ভাব আছে না? মানে এই ভগ্নাংশ তো আর এমন নয় যে সারা জীবন লিখেও শেষ করা যাবে না। পিথাগোরাস ও তাঁর ছত্ররা এ ধরনের ভগ্নাংশ পছন্দ করতেন। পিথাগোরাস ভাবতেন, দুনিয়ার যেকোনো দূরত্ব, ওজন বা মাপজোখকে এমন সুন্দর দুটি পূর্ণসংখ্যার ভগ্নাংশ আকারে প্রকাশ করা সম্ভব। এর বাইরে আর কোনো অদ্ভুত সংখ্যা পৃথিবীতে থাকতেই পারে না! পিথাগোরাস অমূলদ সংখ্যার কথা কল্পনাও করতে পারতেন না।
কিন্তু গন্ডগোলটা বাধল খুব সাধারণ একটা মাঠে গিয়ে।
ধরো, তুমি একটা বর্গাকার মাঠের এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছো। মাঠটার দৈর্ঘ্য ঠিক ১ মিটার, আবার প্রস্থও ঠিক ১ মিটার। তুমি ঠিক করলে, মাঠের ধার ঘেঁষে না হেঁটে, একদম কোনাকুনি শর্টকাট মেরে উল্টো দিকের কোনায় চলে যাবে। জ্যামিতির ভাষায় এই কোনাকুনি শর্টকাট রাস্তাকে বলা হয় কর্ণ।
বর্গক্ষেত্রের কর্ণ
পিথাগোরাসেরই বিখ্যাত একটা সূত্র আছে, যেটা তোমাদের কাছে পিথাগোরাসের উপপাদ্য নামে পরিচিত। সেই সূত্র অনুযায়ী, ত্রিভুজের অতিভুজ২ = দৈর্ঘ২ + প্রস্থ২। এবার নিচের ছবির দিকে খেয়াল করো।
বর্গের দুই বাহু বাদ দিলে এমন একটা ত্রিভুজ হয়। এই ত্রিভুজের অতিভুজ বা সবচেয়ে বড় বাহুই কিন্তু আগের বর্গের কর্ণ। তাহলে ত্রিভুজের অতিভুজের দৈর্ঘ্য বের করা এবং বর্গের কর্ণের দৈর্ঘ্য বের করা একই কথা। কর্ণের দৈর্ঘ্য বের করার নিয়ম হলো: কর্ণ২ = দৈর্ঘ্য২ + প্রস্থ২
যেহেতু আমাদের মাঠের দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ দুটোই ১ মিটার, তাহলে হিসাবটা দাঁড়ায়:
কর্ণ২ = ১২ + ১২
কর্ণ২ = ১ + ১ = ২
তার মানে, কোনাকুনি রাস্তাটার বর্গ হলো √২। তাহলে শুধু রাস্তাটার দৈর্ঘ্য কত? খুব সহজ, বর্গটাকে ওপাশে পাঠিয়ে দিলে সেটা রুট হয়ে যাবে। অর্থাৎ কর্ণের দৈর্ঘ্য হলো √২ মিটার।
তিন
পিথাগোরাসের ছাত্ররা তো মহা উৎসাহে মাঠে নেমে পড়লেন। তাঁদের গুরুর নিয়ম অনুযায়ী, পৃথিবীর যেকোনো মাপকেই ভগ্নাংশ হিসেবে লেখা যায়। তাহলে নিশ্চয়ই √২-কেও কোনো না কোনো ভগ্নাংশ হিসেবে লেখা যাবে!
তারা হিসাব করতে বসলেন। প্রথমে ভাবলেন, এটা কি ৭/৫ হতে পারে? ৭-কে ৫ দিয়ে ভাগ করলে হয় ১.৪। এবার ১.৪-কে নিজের সঙ্গে গুণ করে দেখি ২ হয় কি না।
১.৪ × ১.৪ = ১.৯৬। ২-এর খুব কাছাকাছি, কিন্তু পুরোপুরি ২ হয়নি।
তারা আবার চেষ্টা করলেন। আচ্ছা, ১৪১/১০০ ধরলে কেমন হয়? এর মানে ১.৪১।
তাহলে ১.৪১ × ১.৪১ = ১.৯৮৮১। আগের চেয়েও কাছাকাছি, কিন্তু এখনো নিখুঁত ২ হলো না!
তাঁরা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস আরও বড় বড় ভগ্নাংশ নিয়ে হিসাব করতে লাগলেন। যেমন ১৪১৪/১০০০, ১৪১৪২/১০০০০। উদ্দেশ্য, এমন একটা ভগ্নাংশ খুঁজে বের করা, যার মান ২ হবে। কিন্তু কিছুতেই এমন কোনো ভগ্নাংশ পাওয়া গেল না, যাকে নিজের সঙ্গে গুণ করলে একদম কাঁটায় কাঁটায় ২ হয়!
ঠিক এই সময়েই হিপ্পাসাস নামের এক তুখোড় ছাত্র একটা অন্য রকম রাস্তা ধরলেন। তিনি ভাবলেন, ‘আচ্ছা, আমি যদি প্রমাণ করে দিই যে এমন কোনো ভগ্নাংশ থাকাই সম্ভব নয়, তাহলে কেমন হয়?’
তিনি জোড় ও বিজোড় সংখ্যা নিয়ে একটা দারুণ কৌশল খাটালেন। একটু মন দিয়ে খেয়াল করো, কৌশলটা কিন্তু খুব সোজা!
হিপ্পাসাস প্রথমে ধরে নিলেন, পিথাগোরাসের কথাই ঠিক। ধরলাম, √২-কে একটা ভগ্নাংশ হিসেবে লেখা যায়। নাম দিলাম p/q। আমরা তো যেকোনো ভগ্নাংশকে একদম কাটাকাটি করে ছোট করে ফেলি, তাই না? যেমন ৪/৬-কে কাটাকাটি করে ২/৩ লিখি। ধরলাম, p/q একদম কাটাকাটি করে ছোট করা রূপ। তার মানে, p আর q দুটোই একসঙ্গে জোড় সংখ্যা হতে পারবে না। দুটোই জোড় সংখ্যা হলে তো ২ দিয়ে আরও কাটাকাটি করা যেত!
এবার চলো অঙ্কের খেলা শুরু করি।
√২ = p/q
উভয় পাশে বর্গ করে দিই:
২ = p২/q২
এবার q2-কে বাঁ পাশে পাঠিয়ে দিলে গুণ হয়ে যাবে। অর্থাৎ:
P২ = ২ × q২
এবার কৌশলের আসল জায়গাটা দেখো। p২ হলো এমন একটা সংখ্যা, যাকে ২ দিয়ে গুণ করে পাওয়া গেছে (যেহেতু ডান পাশে ২ গুণ অবস্থায় আছে)। আমরা জানি, যেকোনো সংখ্যাকে ২ দিয়ে গুণ করলে সেটা সব সময় জোড় সংখ্যা হয়ে যায়।
তার মানে, p২ একটা জোড় সংখ্যা। আর কোনো সংখ্যার বর্গ যদি জোড় হয়, তবে সেই আসল সংখ্যাটাও জোড় সংখ্যা হতে বাধ্য। যেমন ৪২ = ১৬, ৬২ = ৩৬ ইত্যাদি।
তাহলে অঙ্ক প্রমাণ করে দিল, p একটি জোড় সংখ্যা।
যেহেতু p জোড় সংখ্যা, তার মানে p-এর ভেতরে একটা ২ লুকিয়ে আছে। আমরা লিখতে পারি, p = ২ × c (এখানে c যেকোনো একটা সংখ্যা)।
তাহলে এবার আমাদের আগের সমীকরণে p-এর বদলে ২c বসিয়ে দিই:
(২c)২ = ২ × q২
৪ × c২ = ২ × q২
এবার দুই পাশ থেকে ২ দিয়ে ভাগ করে দাও বা কাটাকাটি করো:
২ × c২ = q২
বা, q২ = ২ × c২
সর্বনাশ! সমীকরণটা আবার উল্টে গেল! এবার দেখো, q২-এর মান বের করতে গিয়ে ডান পাশে একটা ২ গুণ অবস্থায় আছে। তার মানে q২ একটা জোড় সংখ্যা। আর আগের নিয়মে, q ছিল একটি জোড় সংখ্যা!
চার
একটু আগেই আমরা কী বলেছিলাম মনে আছে? ভগ্নাংশ কাটাকাটি করার নিয়মে p এবং q কখনোই একসঙ্গে জোড় সংখ্যা হতে পারবে না! কিন্তু আমাদের অঙ্ক প্রমাণ করে দিল, p এবং q দুটোই জোড় সংখ্যা!
একই সঙ্গে দুটো কথা তো সত্যি হতে পারে না। তার মানে, একদম শুরুতে আমরা যে ধরে নিয়েছিলাম √২-কে একটা ভগ্নাংশ হিসেবে লেখা যাবে, আমাদের সেই ধরাইটা পুরোপুরি ভুল ছিল!
হিপ্পাসাস খুশিতে লাফিয়ে উঠলেন। তিনি প্রমাণ করে ফেলেছেন, √২-কে দুনিয়ার কোনো ভগ্নাংশ বা মূলদ সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়! এটি এমন এক অদ্ভুত সংখ্যা, যার দশমিকের পর মানগুলো (১.৪১৪২১৩৫৬...) কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম ছাড়াই অনন্তকাল ধরে চলতে থাকে। এটি নিখাদ একটি অমূলদ সংখ্যা।
হিপ্পাসাস যখন তাঁর এই অভাবনীয় আবিষ্কারের কথা পিথাগোরাসের সংঘে জানালেন, তখন গুরু পিথাগোরাস ও তাঁর অন্ধ ভক্তরা ভীষণ রেগে গেলেন। তাঁদের এত দিনের সাজানো সুন্দর নিখুঁত ভগ্নাংশের বিশ্বব্রহ্মাণ্ড একটা √২-এর ধাক্কায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল!
হিপ্পাসাসের এই আবিষ্কারের কথা পিথাগোরীয়দের মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে পরে একটি রোমাঞ্চকর গল্প ছড়িয়ে পড়ে। অমূলদ সংখ্যার রহস্য ফাঁস করার অপরাধে নাকি হিপ্পাসাসকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। আবার অন্য প্রাচীন সূত্রে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে ডোডেকাহেড্রনের রহস্য প্রকাশের গল্প জড়িয়ে আছে। কোনটি সত্য, তা আজ আর নিশ্চিত করে বলা যায় না।
কিন্তু হিপ্পাসাস সত্যিই সমুদ্রে ডুবে মারা গিয়েছিলেন কি না, তার চেয়েও বড় হয়ে আছে তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই গণিতের রহস্য। √২ দেখিয়ে দিয়েছিল, সংখ্যার জগৎ শুধু সুন্দর সুন্দর ভগ্নাংশে সাজানো নয়। মহাবিশ্বের সবকিছুই মানুষের মনগড়া ছোট ছোট সুন্দর বক্সে বন্দী থাকে না। মানুষের বানানো নিয়মের বাইরে প্রকৃতির পরতে পরতে লুকিয়ে থাকতে পারে এমন অসংখ্য অমূলদ রহস্য, যার কোনো শেষ নেই!