দেশ হারিয়ে যে মানুষ আটকে ছিলেন মহাকাশে

হলিউডে স্টিভেন স্পিলবার্গের জনপ্রিয় সিনেমা দ্য টার্মিনাল দেখেছ? ছবিটিতে টম হ্যাংকস অভিনীত চরিত্র ভিক্টর নাভোরস্কি এক পূর্ব ইউরোপীয় পর্যটক। একটি কাল্পনিক দেশ ক্রাকোজিয়ার নাগরিক। কিন্তু অভ্যুত্থানের কারণে নিজের সেই দেশ হারিয়ে অন্য দেশের বিমানবন্দরের টার্মিনালে আটকে পড়েছিলেন ভিক্টর। ভ্রমণের মাঝপথে নিজের দেশে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তাঁর পাসপোর্ট বাতিল হয়ে যায়। অবৈধ পাসপোর্ট নিয়ে তিনি আর নিজের দেশে ফিরতে পারেন না, আবার বিমানবন্দরের টার্মিনাল থেকেও বাইরে বের হতে পারেন না। বাধ্য হয়ে ভিক্টর টার্মিনালেই বসবাস শুরু করেন।

সিনেমার এ গল্প কাল্পনিক মনে হলেও এর অনুপ্রেরণায় ছিলেন বাস্তব এক মানুষ। তিনি ইরানের মেহরান করিমি নাসেরি। নানা কারণে দেশহীন হয়ে তিনি দুই দশকের বেশি সময় ফ্রান্সের একটি বিমানবন্দরের টার্মিনালেই কাটিয়েছিলেন। সেখানেই শেষ পর্যন্ত হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। বাস্তব এ ঘটনাকেই পরে সিনেমায় রূপ দেন স্টিভেন স্পিলবার্গ।

ঠিক মেহরান করিমি নাসেরির মতোই পরিস্থিতি হতে পারত রুশ নভোচর সের্গেই ক্রিকালেভের। ১৯৯১ সালে তাঁকে মহাকাশে পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি যখন পৃথিবীর বাইরে, তখন তাঁর দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। ১৯৯১ সালের ২৫ ডিসেম্বর মানচিত্র থেকে হারিয়ে যায় তাঁর নিজের দেশ, এক জন্মভূমি ভেঙে হয়ে যায় ১৫টি নতুন রাষ্ট্র। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছিল, তাহলে এখন তিনি কোন দেশের নাগরিক? কে তাঁকে ফিরিয়ে আনবে পৃথিবীতে?

আরও পড়ুন

পাঁচ মাসের মিশনে গিয়ে ১০ মাসের বেশি সময় মহাকাশে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন ক্রিকালেভ। নিজের দেশ হারিয়ে সে সময় মহাকাশই হয়ে উঠেছিল তাঁর অস্থায়ী দেশ। টানা ৩১২ দিন তিনি পৃথিবীর বাতাসে শ্বাস নেননি। আর মহাকাশ থেকে যখন তিনি পৃথিবীতে নেমে শ্বাস নিলেন, তখন দেখলেন, তাঁর জন্মশহর লেনিনগ্রাদ হয়ে গেছে সেন্ট পিটার্সবার্গ। পরিবর্তন হয়েছে প্রেসিডেন্টের আর গায়েব হয়ে গেছে তাঁর জন্মভূমি। সে সময় তিনি হয়ে উঠলেন ‘শেষ সোভিয়েত নাগরিক’। এ ঘটনা নিয়েও ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে লেসলি উডহেড দ্য লাস্ট সোভিয়েত সিটিজেন নামে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেন।

মহাকাশে ক্রিকালেভ আর পৃথিবীতে বিপ্লব

৩৩ বছর বয়সী ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার ক্রিকালেভ দক্ষ পাইলট ও সোভিয়েত জাতীয় অ্যারোবেটিক দলের সদস্য ছিলেন। ১৯৮৫ সালে স্যালিউট–৭ স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হলে উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনা করেন তিনি, যা তাঁকে পরের বছর মহাকাশচারীর মর্যাদা এনে দেয়। ১৯৮৮ সালে তিনি প্রথমবার মির মহাকাশ স্টেশনে যান।

১৯৯১ সালের ১৮ মে। ক্রিকালেভ কাজাখস্তানে (তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল) অবস্থিত সোভিয়েত বাইকোনুর কসমোড্রোম (রকেট উৎক্ষেপণের স্থান) থেকে সয়ুজ রকেট টিএম-১২-তে চড়ে মির মহাকাশ স্টেশনের উদ্দেশে দ্বিতীয়বারের মতো যাত্রা করেন।স ঙ্গী ছিলেন নভোচারী আনাতোলি আর্তসেবারস্কি এবং প্রথম ব্রিটিশ মহাকাশচারী ও রসায়নবিদ হেলেন শারম্যান। তাঁদের মিশনটি ছিল পাঁচ মাসের। তাঁদের যে প্রশিক্ষণ ছিল, তা এর বেশি সময় মহাকাশে থাকার জন্য যথেষ্ট ছিল না।

ক্রিকালেভের এ মিশন ছিল একটি রুটিন মিশন। লক্ষ্য ছিল পুরোনো মির স্টেশনটির মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ। কিন্তু মিরে যাওয়ার সময় মহাকাশযানের লক্ষ্য নির্ধারণব্যবস্থা বিকল হয়ে যায়। সে সময় আর্তসেবারস্কি ও হেলেন শারম্যান ভয় পেয়েছিলেন। তবে ক্রিকালেভ নিখুঁতভাবে নিজ হাতে মহাকাশযান চালিয়ে মিরে পৌঁছে যান। মিশন এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শারম্যান আট দিন কক্ষপথে থাকার পর আগেই মিরে থাকা দুই সদস্যের একটি দলের সঙ্গে পৃথিবীতে ফিরে আসেন। ক্রিকালেভ ও আর্তসেবারস্কি মিশন চালিয়ে যাওয়ার জন্য মহাকাশে থেকে যান।

মির মহাকাশ স্টেশন ছিল ছোট্ট, দুর্গন্ধময় ও শব্দপূর্ণ, যেন কয়েকটি আরভি গাড়ি জোড়া দিয়ে বানানো। ভেতরে নানা জীবাণু, ঘামের গন্ধ আর যন্ত্রের অবিরাম শব্দ। তবে ক্রিকালেভ এসব উপেক্ষা করে কাজ করতে থাকেন। আর অবসর সময়ে ওপর থেকে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকেন।

এ সময় পর্যন্ত মহাকাশযাত্রায় সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু পৃথিবীতে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, যা ইতিহাস বদলে দেবে। ১৯৯১ সালের মাঝামাঝি সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্রতর হচ্ছিল। বিভিন্ন প্রজাতন্ত্র স্বাধীনতার জন্য চাপ দিচ্ছিল, অর্থনৈতিক অবস্থা অবনতির দিকে যাচ্ছিল এবং মস্কোর কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ছিল। ক্রিকালেভ যখন পৃথিবী থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে, তখন তাঁর দেশের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছিল।

আরও পড়ুন

শেষমেশ ক্রিকালেভের দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নে ঘটে অভ্যুত্থান। ১৯ আগস্ট মস্কোর রেড স্কয়ারে যখন ট্যাংক নামানো হচ্ছিল, সেতুগুলোয় মানুষ ব্যারিকেড গড়ে তুলছিল, মিখাইল গর্বাচেভ আর সোভিয়েত ইউনিয়ন ইতিহাসের পাতায় চলে যাচ্ছিল, তখন সের্গেই ক্রিকালেভ ছিলেন মহাকাশে। পৃথিবী থেকে বহুদূরে মির মহাকাশ স্টেশনে।

এ প্রেক্ষাপটে ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভের পদত্যাগের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে। একে একে প্রজাতন্ত্রগুলো স্বাধীনতা ঘোষণা করতে থাকে। এর মধ্যে কাজাখস্তানও ছিল, যেখানে অবস্থিত ছিল বাইকোনুর কসমোড্রোম, সোভিয়েত মহাকাশযানের নির্ধারিত অবতরণস্থল।

মিরে থাকা ক্রিকালেভ এসব খবর পান অনেক দেরিতে। ডিসকভার সাময়িকীকে পরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্রিকালেভ বলেন, ‘আমাদের জন্য এটি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। বুঝতে পারছিলাম না যে কী ঘটছে। আলোচনা করতে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলাম, এটি মহাকাশশিল্পকে কীভাবে প্রভাবিত করবে।’

এরই মধ্যে ক্রিকালেভের পৃথিবীতে ফেরার সময় হয়ে আসে। তিনি ফেরার জন্য যোগাযোগ করেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা মহাকাশ কর্মসূচিতে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করে এবং মির স্টেশনে আটকা পড়ে যায় তাঁর মহাকাশযান।

মির মহাকাশ স্টেশনে নভোচারীদের পালা করে পাঠানো হতো। কিন্তু সোভিয়েতের পতনের পর সে কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যায়। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে আর্থিক সংকটের সৃষ্টি হয় এবং বাইকোনুর কসমোড্রোমে সদ্য স্বাধীন দেশ কাজাখস্তান রকেট উৎক্ষেপণ ও অবতরণের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায়। এতে সেখানে সোভিয়েত রাষ্ট্রের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, ওই রাষ্ট্রের আর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ক্রিকালেভ তাহলে কোন দেশের নাগরিক? এ জটিলতায় তাঁকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কোনো পক্ষই উৎসাহ দেখায়নি।

বাইকোনুর কসমোড্রোমের মিশন কন্ট্রোল থেকে ক্রিকালেভের কাছে পাঠানো বার্তায় বলা হয়, ‘আমরা দুঃখিত। তোমাকে মহাকাশেই থাকতে হবে। কারণ, যে দেশ তোমাকে পাঠিয়েছে, তার আর অস্তিত্ব নেই।’

পরে ক্রিকালেভকে জানানো হয় যে তাঁকে ফিরিয়ে আনার মতো অর্থ নেই। এক মাস পরও একই উত্তর। আরেক মাস পরও একই কথা। তাঁকে আরও কিছুদিন সেখানে থাকার অনুরোধ করা হয়। শেষমেশ বাধ্য হয়ে তাঁকে ৫ মাসের পরিবর্তে টানা ১০ মাস মহাকাশে কাটাতে হয়।

ডিসকভার সাময়িকীকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে ক্রিকালেভ বলেছিলেন, ‘এটি আমার জন্য কঠিন ছিল। স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো ছিল না। কিন্তু দেশ তখন এত সংকটে, তাই অর্থ সাশ্রয় করাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে ঝুঁকি জেনেও সেখানে থাকতে হয়েছিল।’

আরও পড়ুন

অপেক্ষার পালা

মহাকাশে দীর্ঘদিন আটকে পড়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। ২০২৪ সালের ৬ জুন মাত্র আট দিনের এক মিশনে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার দুই নভোচারী সুনিতা উইলিয়ামস ও বুচ উইলমোর।

মিশন শেষে পৃথিবীতে ফেরার কথা থাকলেও মহাকাশযানের ত্রুটির কারণে আটকে যান তাঁরা। পৃথিবীতে তাঁদের ফেরানো নিয়ে রাজনীতি শুরু হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর উপদেষ্টা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইলন মাস্ক কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রাজনৈতিক কারণে বুচ ও সুনিতাকে মহাকাশ স্টেশনে ফেলে রেখেছেন।

অবশেষে তাঁদের ফিরিয়ে আনতে গত বছরের ১৪ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ‘ক্রু-১০’ নামে একটি মিশন পাঠায় নাসা ও ধনকুবের ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স। এ মিশনে ছিলেন নাসার নভোচারী অ্যান ম্যাকক্লেইন, নিকোল আয়েরস, জাপান মহাকাশ অনুসন্ধান সংস্থা জেএএক্সএর নভোচারী তাকুইয়া ওনিশি ও রুশ মহাকাশ সংস্থা রসকসমসের নভোচারী কিরিল পেসকভ। ‘নাসা ক্রু-৯ মিশন’-এর অংশ হিসেবে ক্রু ড্রাগনে ফিরতি যাত্রা শুরু করার ১৭ ঘণ্টা পর এই চার নভোচারী পৃথিবীর আকাশমণ্ডলে প্রবেশ করেন। বাংলাদেশ সময় ১৮ মার্চ দিবাগত রাত ৩টা ৫৭ মিনিটে তাঁদের বহনকারী ক্যাপসুলটি বিশেষ প্যারাস্যুটের সাহায্যে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা উপকূল থেকে প্রায় ৫০ মাইল দূরে সমুদ্রে নেমে আসে।

এর মাধ্যমে দীর্ঘ ৯ মাসের অপ্রত্যাশিত মহাকাশযাত্রা শেষে মার্কিন নভোচারী সুনিতা উইলিয়ামস ও বুচ উইলমোর পৃথিবীর বুকে ফিরে আসেন।

কিন্তু সের্গেই ক্রিকালেভ ১০ মাসের বেশি সময় মহাকাশে আটকে ছিলেন। তাঁর ফিরে আসায় দেরি হয়েছিল মূলত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে। স্টেশনে কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটির জন্য নয়।

ক্রিকালেভ চাইলে পৃথিবীতে ফিরতে পারতেন। কারণ, বিশেষভাবে পৃথিবীতে ফেরার জন্য মির মহাকাশ স্টেশনে একটি রাডুগা রি-এন্ট্রি ক্যাপসুল ছিল। সেটি ব্যবহার করে কারও তোয়াক্কা না করে ক্রিকালেভ ফিরতে পারতেন। এতে মির স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেত। কারণ, ক্রিকালেভ ফিরলে ওই স্টেশনের দেখভালের জন্য সেখানে আর কেউ থাকত না।

পৃথিবীতে ফেরার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ক্রিকালেভের কিছু শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। মহাকাশ স্টেশনে নির্ধারিত রুটিন বজায় রাখলেও দীর্ঘ সময় ভরশূন্য পরিবেশে থাকার কারণে তাঁর পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং হাড়ের ক্ষয় হতে শুরু করে। সেখানকার অক্সিজেন ফুরিয়ে আসছিল। কমে আসছিল সঞ্চিত খাবারও।

নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত সময় মহাকাশে থাকাকালে সুনিতা উইলিয়ামস ও বুচ উইলমোর মজা করে কাটিয়েছিলেন। কিন্তু ক্রিকালেভের ক্ষেত্রে সে সুযোগ ছিল না। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পৃথিবী থেকে খুব কম মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হতো। এতে তাঁর একাকিত্ব ও মানসিক চাপ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। প্রতিষ্ঠান ও কাঠামো বদলে যাওয়ায় তিনি আর সেই আগের বন্ধু, সহকর্মী, এমনকি দেশটিরও তেমন কোনো খোঁজ জানতেন না, যা ছেড়ে তিনি মহাকাশে গিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গী হয়েছিল সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। রীতিমতো মানসিক অসুখে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি।

তবে মির মহাকাশ স্টেশন থেকে ক্রিকালেভ রেডিও ব্যবস্থার মাধ্যমে বিজ্ঞান ও রক্ষণাবেক্ষণের বাইরে গিয়ে বিশ্বজুড়ে অপেশাদার রেডিও অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলতেন। এভাবে তাঁর এক বৈশ্বিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। তাঁরা বিভিন্ন ব্যক্তিগত বিষয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিষয় নিয়েও আলোচনা করতেন। ক্রিকালেভ সোভিয়েত ইউনিয়নের অবস্থা সম্পর্কে সেখান থেকে সেন্সরবিহীন খবরাখবর পেতেন। এটি তাঁর মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়েছিল।

অবশ্য এ সময় রেডিওর মাধ্যমে ক্রিকালেভের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী এলেনার মাঝেমধ্যে কথা হতো। এলেনা সোভিয়েত বাইকোনুর কসমোড্রোমে মিশন কন্ট্রোলে কাজ করতেন। প্রথম মিশনে মির স্টেশনে থাকার সময় রেডিওতে কথা বলতে বলতেই তাঁদের পরিচয় হয়েছিল। এবার তাঁদের ছিল ৯ মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় যখন দ্রব্যমূল্য দ্রুত বাড়ছিল, তখন মাসে মাত্র কয়েক ডলার সমপরিমাণ (কমিউনিস্ট নীতি ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে) বেতনে তাঁর পরিবার কীভাবে টিকে আছে, তা নিয়ে ক্রিকালেভ দুশ্চিন্তায় ছিলেন। তবে স্ত্রী এলেনা তাঁকে এসব ও দেশের পরিস্থিতি নিয়ে তেমন কিছুই বলতেন না। শুধু বলতেন, ‘চিন্তা কোরো না। সব ঠিক আছে।’

পরে এক প্রামাণ্যচিত্রে এলেনা এর কারণ হিসেবে বলেন, ‘আমি তাঁকে দুঃখের কথাগুলো না বলার চেষ্টা করতাম। এড়িয়ে যেতে চাইছিলাম। কারণ, বললে ওর কষ্ট হতে পারত। কথা বলে আমার মনে হয়েছে, ক্রিকালেভও একই কাজ করছিল।’

এসব ঘটনা ক্রিকালেভকে তাঁর কাজ থেকে ব্যাহত করতে পারেনি। তিনি মির মহাকাশ স্টেশন থেকে পেশাদারত্ব ও শৃঙ্খলার সঙ্গে স্টেশনটির রক্ষণাবেক্ষণ ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে গেছেন। পরে এক সাক্ষাৎকারে ক্রিকালেভ বলেন, তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল নিজের কাজ সম্পন্ন করা; ফেরার পর কী অনিশ্চয়তা অপেক্ষা করছে, তা উপেক্ষা করেই।

সে সময় ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতির কারণে রাশিয়ায় আর্থিক সংকটের সৃষ্টি হয়। এ কারণে তারা সয়ুজ রকেটে করে অন্যান্য দেশকে মহাকাশ স্টেশনে ভ্রমণ করানোর জন্য আসন বিক্রি করেছিল। অস্ট্রিয়া ৭০ লাখ ডলারে একটি আসন কিনেছিল আর জাপান ১ কোটি ২০ লাখ ডলার দিয়ে টেলিভিশনের এক সাংবাদিককে পাঠিয়েছিল। এমনকি জরুরি ভিত্তিতে মির মহাকাশ স্টেশনটিকে বিক্রি করার কথাও উঠেছিল। ১৯৯১ সালের ২ অক্টোবর পৃথিবী থেকে মির স্টেশনে ভ্রমণে যাওয়া মানুষদের সঙ্গে পৃথিবীতে ফিরে আসেন নভোচারী আনাতোলি আর্তসেবারস্কি। আর মির স্টেশনে থেকে যান একমাত্র ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার ক্রিকালেভ ও আগে থেকেই স্টেশনে থাকা তাঁর সহকর্মী আলেকসান্দার ভলকভ।

পরিবার-ঘর থেকে বহু দূরে মহাকাশে বন্দী অবস্থায় ছিলেন ক্রিকালেভ। যাঁরা ফিরতেন, তাঁদের কাছে মধু পাঠাতে বলতেন তিনি। কিন্তু মধু ছিল না বলে তার বদলে তাঁকে পাঠানো হয় লেবু ও হর্সর‌্যাডিশ।

ক্রিকালেভ বলেন, ‘পেশির ক্ষয়, বিকিরণ, ক্যানসারের ঝুঁকি, প্রতিদিন দুর্বল হয়ে পড়া রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা—দীর্ঘ মহাকাশ মিশনের সম্ভাব্য পরিণতিগুলোর কারণে আমি ভেবেছিলাম, পুরো মিশন শেষ করে বেঁচে থাকার মতো শক্তি আমার আছে কি না! আমি নিশ্চিত ছিলাম না।’

আরও পড়ুন

পৃথিবীতে ফেরা

অবশেষে ১৯৯২ সালের ২৫ মার্চ ক্রিকালেভকে পৃথিবীতে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়। জার্মানি তাঁর বদলি হিসেবে ক্লাউস-ডিট্রিখ ফ্লাডেকে পাঠানোর জন্য ২৪ মিলিয়ন ডলার দিলে ক্রিকালেভ ফেরার অনুমতি পান।

ক্রিকালেভ ৩১২ দিন মহাকাশে কাটানোর পর পৃথিবীতে ফিরে আসেন। তাঁর দেশ তখন আর নেই। শেষ সোভিয়েত নাগরিক হিসেবে তিনি অবতরণ করেন এক নতুন রাষ্ট্রে। সোভিয়েত ইউনিয়নের জায়গায় এসেছে রুশ ফেডারেশন এবং আরও কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্র। তাঁর সয়ুজ ক্যাপসুল অবতরণ করে বর্তমান স্বাধীন কাজাখস্তান প্রজাতন্ত্রের আরকালিক শহরের কাছে। তিনি যখন মহাকাশে ছিলেন, তখন তাঁর অবতরণের শহর আরকালিকের আশপাশ আর সোভিয়েত ছিল না, এটি স্বাধীন কাজাখস্তানের অংশ হয়ে গেছে। তাঁর বাসস্থান লেনিনগ্রাদের নাম বদলে হয়েছে সেন্ট পিটার্সবার্গ। আর তাঁর নিজের দেশের আয়তন কমে গেছে ৫০ লাখ বর্গকিলোমিটারের বেশি। শেষমেশ তিনি গ্রহণ করেন রাশিয়ার নাগরিকত্ব।

মহাকাশে থাকার সময় ক্রিকালেভ পৃথিবীকে পাঁচ হাজারবার প্রদক্ষিণ করেছেন এবং ততবার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখেছেন। সয়ুজ ক্যাপসুল থেকে যখন তিনি বের হলেন, তাঁর স্পেসস্যুটে তখনো ‘USSR’ লেখা এবং লাল সোভিয়েত পতাকা আঁকা ছিল। বাস্তবে সে দেশ তখন আর নেই।

এক প্রতিবেদনে ক্রিকালেভের চেহারা বর্ণনা করা হয়েছিল, ‘ময়দার মতো ফ্যাকাসে এবং ঘামে ভেজা, যেন ভেজা ময়দার দলা।’ দীর্ঘ সময়ের ভারহীনতার পর শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এ কারণে ক্যাপসুল থেকে নামতে চারজনের সাহায্য নিতে হয়েছিল তাঁকে। তবে মানসিকভাবে তিনি স্বস্তি পেয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘একটা বড় চাপ যেন সরে গেল।’

পৃথিবীতে এসে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে ক্রিকালেভের কয়েক সপ্তাহ লেগেছিল এবং পুরোপুরি সুস্থ হতে লেগেছিল আরও কয়েক মাস। এত কিছুর পরও দমে যাননি তিনি। যে নাসার সঙ্গে এত দিন প্রতিযোগিতার সম্পর্ক ছিল, সোভিয়েতের পতনের পর সেই নাসার নভোচারীদেরও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। ১৯৯৪ সালে প্রথম মার্কিন-রুশ যৌথ মহাকাশ অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। পরে তিনি রাশিয়ার সর্বোচ্চ সম্মাননা পান।

ক্রিকালেভ আবারও ইতিহাস গড়েন ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে। সুনিতা উইলিয়ামস যে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) ৯ মাস আটকে ছিলেন, সেই মহাকাশ স্টেশনে পা রাখা প্রথম দুই ব্যক্তিরও একজন ছিলেন ক্রিকালেভ। তিনি একসময় পৃথিবীর বাইরে সর্বাধিক সময় কাটানোর বিশ্ব রেকর্ডও গড়েছিলেন। মহাকাশে তাঁর কাটানো মোট সময় ছিল ৮০৪ দিন ৯ ঘণ্টা ৩৯ মিনিট। ২০০৭ সালে তিনি মহাকাশচারী হিসেবে অবসর নেন।

তথ্যসূত্র: ডিসকভার ম্যাগাজিন, ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি, নাসা, ইউরেশিয়ান টাইমস, গেটওয়ে টু রাশিয়া ও নিউজগ্রাম ডটকম
আরও পড়ুন