কয়েদিদের খাবার থেকে লবস্টার যেভাবে আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে উঠল
ছুটিতে কক্সবাজার বা সেন্ট মার্টিনে বেড়াতে গেলে খাবারের তালিকায় অন্যতম আকর্ষণ থাকে লবস্টার। কিন্তু রেস্টুরেন্টে গিয়ে এর দাম শুনলে অনেকের আর খাওয়ার ইচ্ছা থাকে না। কারণ, এখন লবস্টার মানেই দামি খাবার, আভিজাত্যের প্রতীক। কিন্তু আজ থেকে প্রায় দেড় শ বছর আগে চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো।
আমেরিকার মেইন অঙ্গরাজ্যের একটি পুরোনো গল্প অনুযায়ী, ইউরোপীয়রা যখন সেখানে প্রথম বসতি স্থাপন করে, তখন লবস্টার এত বেশি পাওয়া যেত যে একে সাগরের আবর্জনা মনে করা হতো। তখনকার কারারক্ষীরা কয়েদিদের প্রতিদিন লবস্টার খেতে দিতেন। লবস্টার খেতে খেতে কয়েদিরা এত বিরক্ত ছিল যে তারা এটাকে একধরনের নিষ্ঠুর শাস্তি মনে করত। এমনকি জেল কর্তৃপক্ষ কয়েদিদের কতবার লবস্টার খাওয়ানো যাবে, তা নিয়ে নিয়ম করতে বাধ্য হয়েছিল।
কিন্তু কী এমন হলো যে ১৭ শতাব্দীর কয়েদিরা যে লবস্টার খেতে ঘৃণা করত, সেই লবস্টারই ২১ শতাব্দীর মানুষের কাছে এত দামি ও পছন্দের খাবার হয়ে উঠল?
ইউরোপে সমুদ্রের কাছের মানুষ লবস্টার খেলেও যাঁরা দূরে থাকতেন, তাঁদের কাছে এটি খুব একটা জনপ্রিয় ছিল না। এর একটি যৌক্তিক কারণ আছে। লবস্টার মারা যাওয়ার পর এর পাকস্থলীর এনজাইম বা পাচক রস দ্রুত পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এতে লবস্টারের মাংস খুব দ্রুত পচে যায়। এ কারণেই লবস্টার সাধারণত জীবন্ত রান্না করা হয়। মৃত লবস্টার খেলে অসুস্থ হওয়ার ভয় থাকে। এই পচা সামুদ্রিক খাবারের উৎকট গন্ধের কারণেই ইংরেজিতে ‘ফিশি’ (Fishy) শব্দটি কোনো সন্দেহজনক বিষয় বোঝাতে ব্যবহার করা হয়।
ব্রিটিশরা যখন প্রথম আমেরিকায় এসে বসবাস শুরু করে, তখন তারা দেখে সেখানকার আদিবাসীরা প্রোটিনের জন্য লবস্টারের ওপর নির্ভরশীল। তখন সমুদ্রের তীরে এত বেশি লবস্টার পাওয়া যেত যে ঝড়ের পর শত শত লবস্টার বালুতে পড়ে থাকত। শুরুতে ব্রিটিশরা এগুলো খেলেও লবস্টারের এই বিপুলতা তাদের কাছে এর গুরুত্ব কমিয়ে দেয়। প্রায় সারাক্ষণ লবস্টার খেতে হতো বলে ও সৈকতে পড়ে থাকা হাজার হাজার মৃত লবস্টারের গন্ধের কারণে তারা এই খাবারটির প্রতি বিরক্ত হয়ে ওঠে।
ধীরে ধীরে লবস্টারকে গরিবের খাবার হিসেবে ধরা হতে থাকে। যারা অন্য কোনো খাবার জোগাড় করতে পারত না, কেবল তারাই লবস্টার খেত। এমনকি অনেক সময় এটি গবাদি পশুর খাবার ও জমির সার হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
মানুষের খাদ্যাভ্যাসের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তার সবকিছুই তারা খায় না। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু মানুষ নয়, অন্যান্য উন্নত স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যেও খাবারের স্তরভেদ থাকে। সাধারণত শক্তিশালী প্রাণীরা তুলনামূলক কম ভালো খাবারগুলো দুর্বলদের খেতে বাধ্য করে। লবস্টারের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটিই ঘটেছিল।
১৮০০ সালের দিকেও লবস্টার ছিল অবহেলিত খাবার। কিন্তু মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে এটি বিশ্বের অন্যতম দামি খাবারে পরিণত হয়। এই পরিবর্তনের পেছনে মূলত দুটি বড় কারণ ছিল।
প্রথমটি ক্যানে ভরা খাবারের জনপ্রিয়তা। ১৮৬০ সালের দিকে গৃহযুদ্ধের সময় হাজার হাজার সেনার কাছে খাবার পাঠানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। দেখা গেল, লবস্টার রান্না করার পর তা ক্যানে বা টিনজাত করে রাখা বেশ সহজ। ফলে ক্যালিফোর্নিয়ার মতো দূরের জায়গার মানুষও প্রথমবারের মতো মেইন শহরের লবস্টার খাওয়ার সুযোগ পায়। তখন লবস্টার জনপ্রিয় হওয়ার প্রধান কারণ ছিল এর সস্তা দাম ও প্রচুর প্রোটিন।
দ্বিতীয়টি হলো রেলপথ ও পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন। রেলপথ চালুর ফলে মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরতে শুরু করে। পর্যটকেরা যখন সমুদ্রতীরবর্তী শহরগুলোতে আসতেন, তখন তাঁরা প্রথমবারের মতো ক্যানের বদলে তাজা লবস্টার খাওয়ার সুযোগ পেতেন। যাঁরা আগে থেকে লবস্টারের গরিবের খাবার হিসেবে দুর্নাম জানতেন না, তাঁদের কাছে এর স্বাদ ছিল দারুণ। ফলে বড় বড় শহরগুলোতে তাজা লবস্টারের চাহিদা বেড়ে যায়। যেহেতু লবস্টারকে জীবন্ত অবস্থায় এক শহর থেকে অন্য শহরে নিতে হতো, তাই এর পরিবহন খরচও অনেক বেড়ে যায়। ১৯০০ সালের দিকে ধনী ব্যক্তিরা শখের বশে অনেক টাকা খরচ করে লবস্টার খেতে শুরু করেন, যা একে আভিজাত্যে পরিণত করে।
ধীরে ধীরে লবস্টার বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। সাগরের তীরের দেশগুলোতে বিদেশি পর্যটকদের যাতায়াত বাড়ার সঙ্গে এর চাহিদাও বাড়তে থাকে। বাংলাদেশেও পর্যটনশিল্পের উন্নতির কারণে লবস্টার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আগে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ লবস্টার সম্পর্কে খুব বেশি জানত না।
কিন্তু গত কয়েক দশকে চিত্রটি বদলে গেছে। এখন কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন বা কুয়াকাটার মতো সমুদ্রসৈকতে অনেক মানুষ ঘুরতে যান। সেখানে পর্যটকেরা যখন তাজা সামুদ্রিক খাবার খুঁজতে শুরু করেন, তখন রেস্টুরেন্টগুলো লবস্টারকে দামি খাবার হিসেবে পরিবেশন করা শুরু করে। এ ছাড়া বিদেশি পর্যটকদের পছন্দ ও রান্নার নতুন নতুন পদ্ধতি জনপ্রিয় হওয়ায় লবস্টার এখন আমাদের দেশে অভিজাত খাবার। এখন সমুদ্রভ্রমণে গেলে লবস্টার খাওয়া শৌখিন মানুষের কাছে শখের খাবার।
লবস্টার খাওয়ার জনপ্রিয়তার পাশাপাশি একটি বড় বিতর্কও আছে। আমেরিকান লেখক ডেভিড ফস্টার ওয়ালেস প্রশ্ন তুলেছিলেন, শুধু স্বাদের জন্য কি একটি জীবন্ত প্রাণীকে ফুটন্ত পানিতে সেদ্ধ করা ঠিক? অনেক প্রাণী অধিকার কর্মী মনে করেন, এটি একটি অমানবিক কাজ। এ কারণে বিশ্বের অনেক জায়গায় লবস্টারকে জীবন্ত সেদ্ধ করা এখন আইনত নিষিদ্ধ।