প্রাণীরা কি একে অপরকে নাম ধরে ডাকে
আমাদের প্রত্যেকের একটি করে নাম আছে। অনেকের আবার অনেকগুলো নাম থাকে। আমরা আমাদের প্রিয় পোষা প্রাণীদেরও নাম দিই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একে অপরকে নামে ডাকা কি কেবল মানুষেরই কাজ, নাকি অন্য প্রাণীরাও এ কাজ করে?
গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণী একে অপরকে চেনার জন্য বিশেষ গলার আওয়াজ ব্যবহার করে। তবে এসব আওয়াজকে সত্যি সত্যি নাম বলা যাবে কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে কিছুটা তর্ক আছে।
১৯৬০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা ডলফিন নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এক চমকপ্রদ তথ্য পান। তাঁরা দেখেন, ছোট বটলনোজ ডলফিনগুলো একে অপরের থেকে আলাদা একধরনের বিশেষ শিস দেয়। একে বলা হয় ‘সিগনেচার হুইসেল’। বিজ্ঞানীরা পানির নিচে স্পিকার বসিয়ে সেই শিসের শব্দ বাজিয়ে ডলফিনদের আচরণ পরীক্ষা করেন।
দেখা গেছে, ডলফিনগুলো যোগাযোগের সময় অন্য ডলফিনের বিশেষ শিসটি হুবহু নকল করে ডাকে। ঠিক যেমন মানুষ একে অপরকে নাম ধরে ডাকে। শিসের আওয়াজের সুর ও কম্পাঙ্ক শুনেই এরা বুঝে ফেলে কাকে ডাকা হচ্ছে।
ফ্লোরিডার ডলফিন রিসার্চ সেন্টারের গবেষক কেলি জাকোলা জানান, ডলফিন একে অপরকে বোঝাতে আলাদা আলাদা শিস ব্যবহার করে। দলের ভেতরে নিজেদের চিনতে কিংবা একসঙ্গে কোনো কাজ করার সময় এরা এই বিশেষ শিস দিয়ে একে অপরকে ডাকে।
শুধু ডলফিনই এমন কাজ করে না। আফ্রিকান বুনো হাতিদের নিয়েও পরীক্ষা করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা দেখেন, হাতিরা একধরনের নিচু গুমগুম শব্দের সাহায্যে একে অপরকে সম্বোধন করে। প্রতিটি হাতির জন্য এই ডাক আলাদা ও নির্দিষ্ট।
গবেষক মাইকেল পার্দো জানান, হাতির এই ডাক শুনতে অনেকটা বড় কোনো বিড়ালের ঘড়ঘড় শব্দের মতো। স্পিকারে যখন কোনো হাতির বিশেষ ডাকটি বাজানো হতো, তখন সেই হাতিটি দ্রুত স্পিকারের দিকে এগিয়ে আসত এবং বেশি বেশি সাড়াও দিত।
আরেকটি গবেষণা হয় পাখিদের ওপর। দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় একধরনের ছোট তোতাপাখি পাওয়া যায়। এগুলোকে ‘স্পেকটেকল্ড প্যারটলেট’ বলা হয়। এই তোতাপাখিরা দলের অন্য পাখিদের ডাকতে আলাদা গলার আওয়াজ ব্যবহার করে।
বাসাবাড়িতে খাঁচায় পোষা তোতাপাখির ওপর গবেষণা চালিয়ে এদের শেখার ক্ষমতা সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানা গেছে। প্রায় ৮০০টি তোতাপাখির ওপর চালানো এক জরিপে দেখা যায়, এর মধ্যে অর্ধেক পাখিই মানুষের শেখানো নাম ব্যবহার করতে পারে। উত্তর কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী লরিন বেনেডিক্ট জানান, তোতাপাখিরা মানুষের কাছ থেকে অনেক শব্দ শেখে। শব্দের আসল অর্থ না বুঝলেও এরা জানে কোন শব্দটা কখন বলতে হবে।
জরিপে অংশ নেওয়া এক ব্যক্তি জানান, কেউ ভুল নামে ডাকলে তাঁর তোতাপাখিটি নাকি তাকে শুধরে দেয়। অন্য অনেকেই বলেছেন, তাঁদের তোতাপাখি বাড়ির মানুষ ও পোষা কুকুরের নাম সঠিক জায়গায় ব্যবহার করতে পারে।
তবে পোষা তোতাপাখির এই আচরণ বুনো তোতাপাখির চেয়ে আলাদা। এরা নাম বলতে পারলেও নামের আসল অর্থ সত্যি বোঝে কি না কিংবা বুনো তোতাপাখিরা একে অপরকে নাম দেয় কি না, তা নিশ্চিত হতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।
প্রাণীদের ডাক কি আসলেই নাম
নাম বলতে আমরা যা বুঝি, তা অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে হিসাব করা বেশ কঠিন। মারমোসেট নামের একধরনের ছোট বানর দলের নির্দিষ্ট সদস্যকে ডাকতে বিশেষ গলার আওয়াজ ব্যবহার করে। তবে বিজ্ঞানীরা একে সরাসরি নাম বলতে রাজি নন। কারণ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বানরগুলো হয়তো কেবল একে অপরের গলার আওয়াজ নকল করছিল। একেক প্রজাতির প্রাণী একেকভাবে যোগাযোগ করে, তাই সব প্রাণীকে এক নিয়মে বিচার করা যায় না।
প্রাণীরা সত্যিই নাম ব্যবহার করে কি না, তা বুঝতে গবেষকেরা তিনটি প্রধান শর্ত নির্দিষ্ট করেছেন। শর্তগুলো হলো, ডাকটি শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রাণীর জন্য হতে হবে, শব্দটি শুনলেই যেন সেই প্রাণীর কথা মনে পড়ে এবং দলের অন্য সদস্যরাও যেন ওই একই অর্থ বোঝে। বর্তমানে ডলফিনের বিশেষ শিসের মধ্যে এই শর্তগুলোর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে হাতি, তোতাপাখি বা বানররা নামের মতো বিষয়গুলো সত্যিই মনে ধারণ করে কি না, তা নিশ্চিত হতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।
প্রাণীদের কেন নামের প্রয়োজন হয়
যেসব প্রাণী নতুন নতুন শব্দ শিখতে পারে ও গভীর সামাজিক বন্ধন মেনে চলে, এদের ক্ষেত্রেই মূলত নামের মতো ডাকের প্রয়োজন পড়ে। বিশেষ করে যেসব প্রাণীর দল প্রায়ই ছোট ছোট ভাগে ভাগ হয়ে যায় এবং সদস্যরা একে অপরের চোখের আড়ালে চলে যায়, এদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখতে এই ধরনের নির্দিষ্ট ডাক খুব সাহায্য করে।
নাম ব্যবহার করার এই ক্ষমতা থেকে প্রাণীদের মানসিক বুদ্ধিমত্তা ও নিজস্ব পরিচয়ের ধারণাও স্পষ্ট হয়। নাম বা নির্দিষ্ট ডাক শুনে সাড়া দেওয়ার অর্থ হলো, এদের মধ্যে স্বকীয়তা এবং দলের অন্য সঙ্গীদের পরিচয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বেবুন, জিরাফ কিংবা কাকের মতো আরও অনেক সামাজিক প্রাণীর মধ্যেও হয়তো নামের এই ব্যবহার আছে, যা ভবিষ্যতের গবেষণায় উন্মোচিত হতে পারে।