যে শহরে বিনা মূল্যে খাবার পাওয়া যায়
রাস্তার মাঝখানে রোড ডিভাইডারে সবুজ গাছপালা খুব স্বাভাবিক একটা বিষয়। তবে আজকাল কিছু রিলসে অন্য রকম এক দৃশ্য দেখা যায়। রোড ডিভাইডারের খালি জায়গায় কেউ লাগিয়েছেন ডাঁটাশাক, লাল-সবুজ শাক, আবার কেউ লাগিয়েছেন মরিচ কিংবা টমেটো।
রাস্তার পাশের দোকানদারেরা নিয়মিত এসব গাছের যত্ন নেন। উৎপাদিত সবজি তাঁরা যেমন নিজেরা খান, তেমনি বাজারে বিক্রিও করেন। বিষয়টি একটু অদ্ভুত হলেও এখন অনেকেই এমনটা করছেন। কারণ, শহরে নিজেদের ইচ্ছামতো চাষবাস করার মতো ফাঁকা জায়গা খুব একটা মেলে না। তাই অনেকে রাস্তার মাঝের খালি কিংবা পরিত্যক্ত জায়গাগুলোকেই চাষের জন্য বেছে নিচ্ছেন। তবে এমন ঘটনা যে শুধু আমাদের দেশেই ঘটছে, তা কিন্তু একেবারেই নয়।
যুক্তরাজ্যেও এখন শহরের নানা ফাঁকা জায়গায় ফল ও সবজি ফলানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। লন্ডনে তো এখন বাসস্টপের খালি জায়গায় পর্যন্ত খাদ্য ফলাচ্ছেন স্থানীয়রা। দিনে দিনে শহরাঞ্চলে নিজেদের খাবার নিজে ফলানোর আগ্রহ বেশ বাড়ছে।
তবে জার্মানির ‘আন্ডারনাখ’ শহরের উদ্যোগটি সবচেয়ে চমকপ্রদ। তারা শহরের পার্ক ও চত্বর থেকে শুধু সৌন্দর্য বাড়ানো গাছপালা কেটে ফেলে সেখানে ফলমূল ও সবজির বাগান বানিয়ে ফেলেছে।
নগরবাসীরা কীভাবে নিজেদের খাবার নিজেরাই ফলাবেন
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অনেক আগে থেকেই জার্মানির মানুষের মধ্যে শহরে কৃষিকাজ করার ধারণাটি রয়েছে। ২০১০ সালে গড়ে ওঠা ‘আন্ডারনাখ’ শহরটি খাদ্য উৎপাদনকারী শহর হিসেবে সবচেয়ে বড় উদাহরণ। গাজর আর রঙিন ফুলে সাজানো এখানকার সুন্দর রাস্তাঘাট দেখতে এখন বহু পর্যটক ভিড় জমান।
প্রকল্পটির অন্যতম উদ্যোক্তা ও বাগান প্রকৌশলী হাইকে বুমগার্ডেন জানান, চতুর্থ বছরে পা দিয়ে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো শহরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। ফসল তোলা ও বাগানের যত্নের সময় সবাই একসঙ্গে জড়ো হন এবং নানা নতুন বুদ্ধি শেয়ার করেন। চমৎকার পরিবেশ আর পারস্পরিক বন্ধনের কারণেই স্থানীয়রা এই শহরে থাকতে ভালোবাসেন। এখানে ৮ হাজার বর্গমিটার জায়গায় সবজি চাষ হয়। এ ছাড়া শহরের পাশে ১৩ হেক্টর সরকারি জমিতে হাঁস-মুরগি, গরু, ভেড়া পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন ফসল ফলানো হয়। দীর্ঘদিন বেকার থাকা মানুষজন এসব খামারের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেন।
সাধারণত শহরের বিনোদনকেন্দ্র বা পার্কে এমন সব গাছ লাগানো হয়, যা নষ্ট হয় না এবং বহু বছর টিকে থাকে। দেখতে সবুজ হলেও এগুলো প্রায় তেমন কোনো কাজে আসে না। তাই পার্কে সেইসব গাছ কমিয়ে সবজিগাছ লাগানো হয়। সবজি চাষ কিন্তু পার্কের গাছের মতো নয়। এর জন্য দরকার নিয়মিত যত্ন ও সঠিক পরিকল্পনা। তা না হলে সঠিক সময়ে ফলন নাও মিলতে পারে।
বিনা মূল্যে তাজা সবজি ও ফলের শহর আন্ডারনাখ
আন্ডারনাখ শহরে নানা ধরনের শাকসবজি, ফল ও ফুলের চাষ যেমন সাশ্রয়ী, তেমনি দেখতেও খুব সুন্দর। স্থানীয় মানুষজন নিজেরাই সামনে এসে উৎসাহের সঙ্গে এই কাজে অংশ নেন। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা শহরটিকে সুন্দর রাখতে সব সময় নতুন নতুন পরিকল্পনা করছেন।
তাঁদের একটি নতুন উদ্যোগ হলো ‘দ্য বিগ বি প্রজেক্ট’। এর আওতায় তাঁরা বিভিন্ন স্কুলের সঙ্গে মিলে মধু তৈরির উপযোগী গাছ ও মৌচাক বসাচ্ছেন। পাশাপাশি শিশুদের চাষবাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চালকের ট্রেলারে করে একটি ভ্রাম্যমাণ স্কুল-বাগান বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
শহরের মাঝখানে ফাঁকা জমি কম থাকায় তাঁরা চমৎকার একটি বুদ্ধি বের করেন। বাড়ির দেয়ালে আঙুরলতা লাগিয়ে দেওয়া। আঙুরলতাগুলো অনেক দিন বাঁচে, দেখতে সুন্দর লাগে এবং খুব কম পরিচর্যাতেই প্রচুর ফল দেয়। শুরুতে শহরের বাসিন্দারা ভাবতেন রাস্তার গাছ বা ফল সব সরকারের, তাই তাঁরা হাত দিতেন না। বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষ প্রবেশ নিষেধ সাইনবোর্ড সরিয়ে সেখানে লিখে দেয়, নিঃসংকোচে ছিঁড়ে নিয়ে খান।
শুধু খাবার ফলানোই নয়, মানুষকে বিভিন্ন জাতের উদ্ভিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়াও ছিল তাঁদের বড় উদ্দেশ্য। এক বছর তাঁরা মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ৪০০ জাতের ভিন্ন ভিন্ন টমেটো ফলায়। মানুষ তা খেয়ে রং, স্বাদ আর আকারের চমৎকার পার্থক্য বুঝতে পারত। অন্য এক বছর বিভিন্ন ধরনের শিম চাষ করা হয়। যার মধ্যে স্প্যাগেটি বিনের মতো মজার জাতও ছিল। একইভাবে আরেক বছর সাজানো হয়েছিল হরেক পদের স্ট্রবেরি দিয়ে।
শহরের মধ্যযুগীয় এক পুরোনো দুর্গের পরিখাতেও এখন নানা পদের সবজি চাষ হয়। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে বাগানের রূপও বদলে যায়, যা দেখতে সারা বছর একই রকম থাকা সাধারণ গাছের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। এ ছাড়া শহরের বাইরের বড় খামার থেকে উৎপাদিত সবজি, ফল, ডিম ও মাংস কম দামে নিজেদের দোকানে বিক্রি করা হয়।
জার্মানির পাশাপাশি ব্রিটেনেও এখন এমন নগর কৃষির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। ইনক্রেডিবল এডিবলের মতো সংস্থাগুলো লিডস ও ব্রিস্টলের মতো শহরগুলোতে সবাইকে নিয়ে যৌথভাবে ফলমূল ও সবজি চাষের বড় বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে।