শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নামে বুধ গ্রহে ক্রেটার
পৃথিবী থেকে প্রায় ১০ কোটি কিলোমিটার দূরের একটি গ্রহ। সেখানে নেই কোনো গাছ, নদী বা মানুষের বসতি। চারদিকে শুধু পাথর আর ধুলার বিস্তীর্ণ প্রান্তর। সেই পাথুরে গ্রহের মাটিতে ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার গর্ত। আর সেসব গর্তের একটির নাম ‘আবেদিন ক্রেটার’। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নামে রাখা হয়েছে এই নাম।
সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ বুধ। সেখানে কোনো বাতাস বা বায়ুমণ্ডল না থাকায় গ্রহটিতে উল্কাপাতের তৈরি অসংখ্য গর্ত বা ‘ক্রেটার’ আছে। ২০০৮ সালে নাসার মহাকাশযান ‘মেসেঞ্জার’ বুধের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় গ্রহটির অসংখ্য নিখুঁত ছবি তোলে। সেসব ছবি বিশ্লেষণ করে ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন (আইএইউ) একটি বিশাল গর্তের নাম অনুমোদন করে ‘আবেদিন ক্রেটার’। এই ক্রেটারটির ব্যাস প্রায় ১১৬ কিলোমিটার!
বুধ গ্রহের একটি গর্তের নাম একজন বাঙালি শিল্পীর নামে কেন?
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের নিয়ম অনুযায়ী, বুধের বড় ক্রেটারগুলোর নাম রাখা হয় বিশ্বের বিখ্যাত মৃৎশিল্পী, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ ও সৃজনশীল মানুষদের স্মরণে। যাঁদের কাজের প্রভাব মানবজাতি ও সংস্কৃতিতে স্থায়ী রূপ নিয়েছে। জয়নুল আবেদিনও বিশ্বমঞ্চে সেই মর্যাদার তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন।
জয়নুল আবেদিন জন্মেছিলেন ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে। ছোটবেলা থেকেই ব্রহ্মপুত্র নদ, নদীপাড়ের জীবন, নৌকা ও গ্রামের প্রকৃতি তাঁকে ভীষণ টানত। পরে তিনি কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৩৮ সালে ব্রহ্মপুত্র নদ নিয়ে আঁকা চমৎকার জলরঙের সিরিজের জন্য তিনি সর্বভারতীয় প্রদর্শনীতে গভর্নরের স্বর্ণপদক পান।
তবে জয়নুল আবেদিনকে বৈশ্বিক পরিচিতি এনে দেয় ১৯৪৩ সালের ঐতিহাসিক ‘মন্বন্তর’ বা দুর্ভিক্ষ সিরিজের ছবি।
সেই সময় বাংলার পথে পথে না খেয়ে হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছিল। কেউ কঙ্কালসার, কেউ মৃত্যুর প্রহর গুনছে। জয়নুল তাঁদের সেই মর্মন্তুদ দৃশ্য ক্যানভাসে তুলে ধরলেন। দামি ক্যানভাস বা তেলরঙে নয়; সস্তা প্যাকিং কাগজে আর চুলার পোড়া কয়লার কালিতে! তাঁর আঁকা এসব ছবি কেবল শিল্পকর্ম হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছিল ইতিহাসের এক জীবন্ত ও করুণ দলিল।
দেশভাগের পর ঢাকায় এসে ১৯৪৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আর্ট ইনস্টিটিউট, যা আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। এ ছাড়া আমাদের লোকশিল্পের সুরক্ষায় সোনারগাঁয়ে ‘বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠাতেও তিনি মুখ্য ভূমিকা রাখেন। ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় মানুষের দুর্বিষহ চিত্রও ফুটে উঠেছিল তাঁর তুলিতে। ১৯৭৬ সালের ২৮ মে এই মহান শিল্পী মৃত্যুবরণ করেন।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আঁকা ছবির মূল্য আজ আকাশচুম্বী। ২০২৪ সালের মার্চে নিউইয়র্কের বিখ্যাত নিলামঘর ‘সদবি’স’-এ তাঁর ১৯৬৩ সালে আঁকা ‘সাঁওতাল দম্পতি’ ছবিটি ৩ লাখ ৮১ হাজার ডলারে (প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা) বিক্রি হয়।
এর চেয়েও বড় রেকর্ড তৈরি হয় ওই বছরের সেপ্টেম্বরে। ১৯৭০ সালে আঁকা তাঁর একটি শিরোনামহীন ওয়াশ ছবি ৫ লাখ ১৬ হাজার পাউন্ডে (প্রায় ৮ কোটি টাকা) বিক্রি হয়, যা বিশ্ব নিলামে যেকোনো বাংলাদেশি শিল্পীর ছবির মূল্যে এক ঐতিহাসিক রেকর্ড!