জেমস ওয়েবের পর এবার নতুন রোমান স্পেস টেলিস্কোপ তৈরি করেছে নাসা

রোমান স্পেস টেলিস্কোপনাসা/ লাইভ সায়েন্স থেকে নেওয়া

নাসা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে নতুন প্রজন্মের মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্র ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ। এটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ ছবি প্রকাশ করেছে তারা। নাসা জানিয়েছে, দীর্ঘ প্রায় এক দশকের নির্মাণ শেষে এই টেলিস্কোপ এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত। বিজ্ঞানীদের আশা, এটি শিগগিরই মহাকাশে পাড়ি দেবে। ২০২৬ সালের শেষের দিকে তথ্য সংগ্রহ শুরু করতে পারবে। এই টেলিস্কোপের লক্ষ্য শুধু এক্সোপ্ল্যানেট খোঁজা নয়, বরং মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির মানচিত্র তৈরি থেকে শুরু করে ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির মতো মহাবিশ্বের গভীর রহস্য উন্মোচন করা।

রোমান স্পেস টেলিস্কোপ হলো নাসার পরবর্তী ফ্ল্যাগশিপ মিশন। ১৯৯০ সালে উৎক্ষেপণ হওয়া হাবল স্পেস টেলিস্কোপ এবং ২০২১ সালে উৎক্ষেপণ হওয়া জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের পর এটিই নাসার সবচেয়ে বড় মহাকাশ পর্যবেক্ষণ প্রকল্প। তবে রোমান স্পেস টেলিস্কোপ হাবল বা জেমস ওয়েবের জায়গা নেবে না, বরং এদের সঙ্গে মিলে কাজ করবে। এই টেলিস্কোপের নামকরণ করা হয়েছে নাসার প্রথম প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও অগ্রদূত বিজ্ঞানী ন্যান্সি গ্রেস রোমানের নামে। যিনি ১৯৬০ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

আরও পড়ুন

নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে প্রকাশিত নতুন ছবিগুলোতে দেখা গেছে, এটি প্রায় ১২ দশমিক ৭ মিটার লম্বা। ওজন প্রায় ৪ হাজার ১৬৬ কেজি। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। এটি তৈরি করতে খরচ হয়েছে ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।

মহাকাশে উৎক্ষেপণের পর রোমান টেলিস্কোপকে পৃথিবী থেকে প্রায় ১৬ লাখ কিলোমিটার দূরে স্থাপন করা হবে। সূর্যকে ঘিরে পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে অবস্থিত এল-২ লাগ্রাঞ্জ পয়েন্টে স্থাপন করা হবে। এই বিশেষ কক্ষপথে মহাকর্ষীয় ভারসাম্যের কারণে মহাকাশযান স্থির অবস্থানে থাকতে পারে। এখানেই বর্তমানে জেমস ওয়েব, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার গাইয়া ও ইউক্লিড টেলিস্কোপ কাজ করছে।

রোমান টেলিস্কোপে আছে বিশালাকার আয়না ও ক্যামেরা। ২ দশমিক ৪ মিটার ব্যাসের আয়না মহাবিশ্ব থেকে আসা ক্ষীণ আলো সংগ্রহ করে পাঠাবে ২৮৮ মেগাপিক্সেলের অত্যাধুনিক ওয়াইড ফিল্ড ইনস্ট্রুমেন্টে। এই ক্যামেরা ইনফ্রারেড আলোতে এমন সব বস্তু দেখতে পারবে, যা মানুষের চোখে ধরা পড়ে না। সৌরজগতের প্রান্ত থেকে শুরু করে দৃশ্যমান মহাবিশ্বের শেষ সীমা—সবই ধরা পড়বে এর চোখে।

আরও পড়ুন
জেমস ওয়েব নভোদুরবিন
নাসা

নাসার কর্মকর্তারা বলছেন, রোমান পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া সংস্থাটির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। নাসার সহযোগী প্রশাসক অমিত ক্ষাত্রিয়া জানিয়েছেন, ‘এমন একটি শক্তিশালী দূরবীক্ষণ তৈরি সম্ভব হয়েছে, যা আমাদের মহাবিশ্ব-ধারণাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।’ রোমান প্রকল্পের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী জুলি ম্যাকএনারির মতে, মিশনের প্রথম পাঁচ বছরেই এটি এক লাখের বেশি এক্সোপ্ল্যান্ট, কোটি কোটি তারা এবং বিলিয়ন গ্যালাক্সির তথ্য উন্মোচন করতে পারে।

রোমান টেলিস্কোপ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় অঞ্চল নিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করবে। পাশাপাশি ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা চলবে।

রোমান টেলিস্কোপের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দূরবর্তী তারার তীব্র আলো ঢেকে দিয়ে এদের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো গ্রহগুলোর ছবি তুলতে সাহায্য করবে। সাধারণত তারার ঝলকানিতে এসব এক্সোপ্ল্যানেট দেখা যায় না। গত ৩০ বছরে বিজ্ঞানীরা ছয় হাজারের কিছু বেশি এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কার করেছেন। রোমান একাই ৫ বছরে এর ১৫ গুণের বেশি গ্রহ খুঁজে বের করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধান নিয়ে গবেষণায় বিপুল অগ্রগতি আসতে পারে।

আরও পড়ুন

রোমান মিশনের আরেকটি চমকপ্রদ দিক হলো এর তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা। প্রথম পাঁচ বছরে এটি প্রায় ২০ হাজার টেরাবাইট তথ্য পাঠাবে, যা প্রায় ৩ হাজার আইফোনের সমান স্টোরেজ।

কবে উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে রোমান টেলিস্কোপের? আগে ধারণা ছিল ২০২৭ সালের মে মাসে রোমান উৎক্ষেপণ হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘোষণায় জানা গেছে, সবকিছু ঠিক থাকলে এটি নির্ধারিত সময়ের আগেই উৎক্ষেপণ করা হতে পারে। ২০২৬ সালের শেষের আগেই তথ্য সংগ্রহ শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। সম্ভাব্য উৎক্ষেপণ তারিখ ধরা হচ্ছে ২০২৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। উৎক্ষেপণ করা হবে স্পেসএক্সের ফ্যালকন হেভি রকেটে নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে।

উৎক্ষেপণের পর প্রায় ৯০ দিন সময় লাগবে সব যন্ত্র পরীক্ষা ও প্রস্তুত করার জন্য। এরপরই শুরু হবে মহাবিশ্বের দিকে নতুন চোখ মেলে তাকানোর কাজ। রোমান স্পেস টেলিস্কোপ শুধু নতুন তথ্যই দেবে না, বরং মহাবিশ্বে আমরা কি একা, এই চিরন্তন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পথে মানবজাতিকে এক ধাপ এগিয়ে নেবে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন