অরকার আঘাতে টুকরা টুকরা হলো সানফিশ
কত জোরে আঘাত করলে বিশাল এক মাছ মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হয়ে যায়? উত্তর জানতে হলে দেখতে হবে অরকাকে। ‘কিলার হোয়েল’ বা খুনে তিমি নামে বেশি পরিচিত এই প্রাণী।
সম্প্রতি একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। দেখা গেছে, পানির নিচে বিশাল একটা মাছকে একটি অরকা শক্ত করে চেপে ধরে আছে। ঠিক তখনই আরেকটি অরকা প্রচণ্ড গতিতে এসে মাছটিকে সজোর আঘাত করেছে। মুহূর্তে মাছটি অসংখ্য টুকরা হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
অরকাদের এমন দলবদ্ধ শিকারের কৌশল আগে কখনো দেখেননি বিজ্ঞানীরা।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে মেক্সিকোর প্রশান্ত মহাসাগর ও ক্যালিফোর্নিয়া উপসাগরে ডুবুরিদের পানির নিচের ক্যামেরায় এই অবিশ্বাস্য দৃশ্য ধরা পড়ে। গত বৃহস্পতিবার বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ফ্রন্টিয়ার্স ইন ইথোলজিতে প্রকাশিত গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, অরকাদের এই ভয়ংকর ধাক্কার উদ্দেশ্য হয়তো খাবার সংগ্রহ করা। আবার এটাও হতে পারে, এরা নিছক খেলাচ্ছলে এমনটা করছে।
গবেষক ক্যাথরিন এয়ারস বলেছেন, ‘কয়েক বছর আগে প্রথম যখন ঘটনাটি ক্যামেরায় ধারণ করি, তখন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।’ তিনি সামুদ্রিক সংরক্ষণবিষয়ক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বিনেথ দ্য ওয়েভসের গবেষক। তিনিই প্রথম অরকাদের এই আচরণের ভিডিও ধারণ করেন।
মূলত হাঙর নিয়ে গবেষণা করলেও ক্যালিফোর্নিয়া উপসাগরে অরকাদের শিকার করার কৌশল দেখে এদের আচরণ নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এয়ারস। ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই মেক্সিকোর বাজা ক্যালিফোর্নিয়া সুরের সান হোসে দেল কাবোর উপকূলে একটি ওশান সাফারি ট্যুরে ডাইভিং করার সময় তিনি প্রথম ঘটনাটি দেখেন।
সিএনএনকে দেওয়া এক ই–মেইলে এয়ারস বলেন, ‘দলবদ্ধ হয়ে ধাক্কা দিয়ে শিকার করার বিষয়টি আমার কাছে একেবারে নতুন ছিল না। এর আগে তিমি বা হাঙর শিকারের সময়ও অরকাদের এমন আচরণ করতে দেখেছি। কিন্তু এবার যা ঘটল, সেটা অবিশ্বাস্য। বিশাল একটি সানফিশ মুহূর্তেই অসংখ্য টুকরা হয়ে ভেঙে যেতে দেখেছি। এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখিনি।’
ভিডিও ধারণের সময় বিস্ময়ে এয়ারস বারবার চিৎকার করে উঠছিলেন।
সম্পূর্ণ নতুন এক আচরণ
প্রথম ঘটনার কয়েক মাস পর সেপ্টেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়া উপসাগরে আরেকটি ট্যুর দলের ক্যামেরায় একই ধরনের ঘটনা ধরা পড়ে। দুটি ভিডিওতেই দেখা যায় অরকাদের দলগত সমন্বয়।
প্রথমে একটি অরকা নিজের শক্তিশালী চোয়াল দিয়ে ‘শার্পটেইল সানফিশ’ (বৈজ্ঞানিক নাম Masturus lanceolatus)–এর লেজ শক্ত করে ধরে রাখে। ঠিক তখনই দূর থেকে আরেকটি অরকা বুলেটের গতিতে ছুটে আসে। ধাক্কা দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে প্রথম অরকাটি মাছটিকে ছেড়ে দেয়। এরপর দ্বিতীয় অরকাটি এত জোরে আঘাত করে যে, মাছটি যেন মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হয়ে যায়।
ধাক্কার পর পানিতে ছড়িয়ে পড়া ছোট ছোট টুকরাগুলো দ্রুত খেয়ে ফেলে দলের ছোট ও কিশোর বয়সী অরকারা। আর বড় অরকারা মিলে খেতে থাকে মাছটির অবশিষ্ট অংশ।
শার্পটেইল সানফিশ বা ‘মোলা’ বিশ্বের সবচেয়ে ভারী মাছগুলোর একটি। একটি পূর্ণবয়স্ক সানফিশের ওজন চার হাজার পাউন্ডের বেশি অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৮০০ কেজি। দৈর্ঘ্য হতে পারে প্রায় ৩ মিটার বা ১০ ফুট।
অরকারা সাধারণত বড় শিকার ধরতে দলবদ্ধভাবে আক্রমণ করে। কিন্তু টর্পেডোর মতো ছুটে এসে এক ধাক্কায় বিশাল মাছকে টুকরা টুকরা করে ফেলার ঘটনা আগে কখনো নথিভুক্ত হয়নি।
অরকা বিহেভিয়ার ইনস্টিটিউটের পরিচালক মনিকা উইল্যান্ড শিল্ডস বলেছেন, ‘আমি আগে কখনো এমন কিছুর কথা শুনিনি। আমার জানামতে, এটি অরকাদের সম্পূর্ণ নতুন একটি আচরণ, যা এবারই প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে নথিভুক্ত হলো।’
পৃথিবীর সব অরকাই একই প্রজাতির হলেও কোথায় বাস করে, তার ওপর নির্ভর করে এদের খাবারের তালিকা ও শিকারের কৌশল বদলে যায়। কেউ মাছ শিকার করে, কেউ সিল, আবার কেউ বেলুগা তিমি, নারহোয়েল বা শুশুকও শিকার করে। প্রতিটি শিকারের জন্য এদের আলাদা কৌশল লাগে। এই প্রবল ধাক্কাও হয়তো তেমনই একটি বিশেষ কৌশল।
মনিকা উইল্যান্ড শিল্ডসের মতে, বিশ্বজুড়ে অরকাদের আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারলে এদের শিকারের এমন আরও অনেক অজানা কৌশল হয়তো সামনে আসবে।
খাবারের জন্য, না আনন্দের জন্য
গবেষকদের ধারণা, এভাবে সানফিশকে ছোট ছোট টুকরায় ভেঙে ফেললে অরকা ছানাদের জন্য খাওয়া সহজ হয়। একই সঙ্গে দলবদ্ধভাবে শিকার ও খাবার ভাগাভাগি করার মাধ্যমে এদের সামাজিক সম্পর্ক আরও শক্ত হয়।
তবে অরকারা শিকার নিয়ে খেলাধুলা করতে বেশ পছন্দ করে। ওয়াশিংটন উপকূলে একদল অরকাকে মৃত স্যামন মাছ মাথায় টুপির মতো পরে ঘুরতে দেখা গেছে। আবার অন্য কোথাও দেখা গেছে, এরা সিলের নাড়িভুঁড়ি কড মাছের পাখনায় জড়িয়ে খেলছে। আবার দেখা গেছে, সি–লায়নের চামড়া বাতাসে ছুড়ে একে অন্যের দিকে লুফে দিচ্ছে।
শিল্ডস বলেছেন, ‘অরকাদের আমরা সমুদ্রের শেওলা, ভাসমান কাঠ কিংবা কাঁকড়া ধরার খাঁচা নিয়েও খেলতে দেখেছি। এসবের পেছনে খাবারের কোনো প্রয়োজন থাকে না। এরা শুধু আনন্দের জন্যই করে।’
সানফিশকে এভাবে উড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটিও হয়তো এদের একধরনের খেলা।
গবেষক এয়ারস আরও একটি বিষয় লক্ষ করেছেন, ধাক্কা দেওয়ার আগেই সানফিশটির শরীরে বড় বড় ক্ষতের চিহ্ন ছিল। মানে, অরকারা সম্ভবত এর আগেই মাছটির সবচেয়ে পুষ্টিকর ভেতরের অঙ্গগুলো খেয়ে ফেলেছিল।
এয়ারস বলেন, ‘এরা আগেই সানফিশের ভেতরের পুষ্টিকর অংশ খেয়ে নিয়েছিল। তাই পরে মাছটিকে টুকরা করে উড়িয়ে দেওয়ার পেছনে হয়তো তাৎক্ষণিক খাবারের প্রয়োজন ছিল না। এটি স্রেফ বিনোদনের অংশও হতে পারে।’
সানফিশের চ্যাপটা শরীরের গঠনও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। ভেতরের নরম অংশ খেয়ে ফেলার পর বাকি শরীর প্রচণ্ড ধাক্কায় সহজেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি। এটি এখনো একটি প্রাথমিক ধারণা। এমনটা কি শুধু সানফিশের শরীরের গঠনের কারণে হচ্ছে, নাকি এই অঞ্চলের অরকাদের বিশেষ শিকারের কৌশল, নাকি দুটিরই প্রভাব আছে, সেটি জানতে আরও পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন।
সূত্র: সিএনএন