পুরোনো বইয়ের গন্ধ ভালো লাগে কেন

পুরোনো বইয়ের গন্ধে জাদু আছেমডেল : মৌসুমী মৌ, সাজ: অরা বিউটি লাউঞ্জ। ছবি: কবির হোসেন

পুরোনো বইয়ের পাতা উল্টাতে গেলেই নাকে এসে লাগে একটা অদ্ভুত চেনা গন্ধ। একটু মিষ্টি, একটু ধুলামাখা আর একটু স্যাঁতসেঁতে। সব মিলিয়ে মনটা নিমেষেই শান্ত হয়ে যায়। তুমিও কি পুরোনো বইয়ের গন্ধ পেলে মুগ্ধ হয়ে যাও? যদি তোমার উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে জেনে রাখো, তুমি একা নও! এই পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ পুরোনো বইয়ের গন্ধের প্রেমে পাগল। এমনকি এই গন্ধের প্রতি এমন অদ্ভুত ভালোবাসার একটা সুন্দর নামও আছে-বিব্লিওসমিয়া। ২০১৪ সালে অলিভার টিয়ার্ল নামে এক ইংরেজি অধ্যাপক গ্রিক শব্দ ‘বই’ এবং ‘গন্ধ’ শব্দ দুটি জোড়া লাগিয়ে এই দারুণ শব্দটি তৈরি করেন।

এখন তোমার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, পুরোনো বইয়ের এই গন্ধে আসলে কী এমন জাদু আছে, যা আমাদের মনকে এতটা টেনে রাখে? চলো, সেই জাদুকরি রহস্যের একটু গভীরে যাই!

আরও পড়ুন

স্মৃতির দরজা

পুরোনো বইয়ের গন্ধ ভালো লাগার পেছনে বিজ্ঞান তো আছেই, তবে তার চেয়েও বড় কারণ হলো স্মৃতি। নিউরোলজিস্ট রাব নওয়াজ খানের মতে, পুরোনো বইয়ের গন্ধ আমাদের অবচেতনভাবেই অনেক পুরোনো স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। হয়তো তোমার স্কুল লাইব্রেরির শান্ত বিকেল, দাদুর বুকশেলফ ঘাঁটার আনন্দ, কিংবা কোনো প্রিয় মানুষের স্মৃতি।

মজার ব্যাপার হলো, আমাদের মস্তিষ্কে গন্ধের সঙ্গে আবেগেরও সরাসরি যোগসূত্র আছে। বিজ্ঞানীরা বলেন, আমরা চোখে যা দেখি বা কানে যা শুনি, তার চেয়ে আমাদের নাকের মাধ্যমে যাওয়া গন্ধ অনেক দ্রুত মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার জায়গায় পৌঁছে যায়। এ কারণেই পুরোনো বইয়ের গন্ধ নাকে আসতেই কোনো কারণ ছাড়াই তোমার মন ভালো হয়ে যায়!

আরও পড়ুন

রসায়নের মজার খেলা

এবার আসি আসল বিজ্ঞানে। পুরোনো বইয়ের পাতার এই জাদুকরি গন্ধ তৈরি হয় মূলত রসায়নের অদ্ভুত এক কারসাজিতে। বইয়ের পাতা সাধারণত তৈরি হয় কাঠ দিয়ে। কাঠের মধ্যে সেলুলোজ ও লিগনিন নামে দুটি উপাদান থাকে। বই যখন পুরোনো হতে থাকে, তখন এই উপাদানগুলো ধীরে ধীরে ভেঙে গিয়ে বাতাসে একধরনের রাসায়নিক যৌগ ছড়াতে শুরু করে। একে বলে ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ডস।

এই রাসায়নিক যৌগগুলোর কারণেই পুরোনো বই থেকে আমরা চার ধরনের চেনা গন্ধ পাই। একটা হলো ভ্যানিলিন। এই উপাদানের কারণেই পুরোনো বই থেকে ভ্যানিলা বা মিষ্টি বিস্কুটের মতো চমৎকার একটা গন্ধ আসে! বইয়ের গন্ধে হালকা বাদামের আমেজ এনে দেয় বেনজালডিহাইড। ফারফিউরালের কারণে মনে হয় যেন খুব সুন্দর করে পাউরুটি সেঁকা হচ্ছে! আর গুয়াইয়াকল বইয়ের গন্ধে যোগ করে হালকা পোড়া কাঠ বা ক্যাম্পফায়ারের একটা আমেজ।

ভাবতে পারো, একটা পুরোনো বইয়ের ভেতরেই আস্ত একটা বেকারি ও ক্যাম্পফায়ারের গন্ধ লুকিয়ে আছে!

আরও পড়ুন

নতুন বইয়ের গন্ধ কেমন

পুরোনো বইয়ের তুলনায় নতুন বইয়ের গন্ধ কিন্তু একেবারেই আলাদা। নতুন বইয়ের পাতা উল্টালে যে গন্ধটা পাও, তা মূলত নতুন কালি, কাগজ সাদা করার রাসায়নিক ও আঠার গন্ধ। এটা অনেকটা নতুন গাড়ির গন্ধের মতো—তাজা এবং কড়া। কয়েক বছর পার হলেই এই কড়া গন্ধটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে পুরোনো বইয়ের সেই মিষ্টি গন্ধে পরিণত হয়।

বইয়ের গন্ধ শোঁকা কি ক্ষতিকর

বইয়ের পাতা থেকে যে রাসায়নিক ছড়ায়, তা নিয়ে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। ডা. খান নিশ্চিত করেছেন, পরিষ্কার ও শুকনা পুরোনো বইয়ের গন্ধ শোঁকা পুরোপুরি নিরাপদ। এর কারণে তোমার স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হবে না।

তবে হ্যাঁ, যদি বইয়ের পাতা স্যাঁতস্যেঁতে হয়ে যায় বা তাতে ছত্রাক জন্মায়, তাহলে সেখান থেকে দূরে থাকাই ভালো! ছত্রাক বা ধুলাবালুর গন্ধ যদি নাকে যায়, তাহলে হাঁচি-কাশি বা অ্যালার্জির সমস্যা হতে পারে।

তাই বইয়ের পাতায় নাক গোঁজার আগে যদি টের পাও, গন্ধটা শুকনা, মিষ্টি এবং আরামদায়ক হয়; তবে মন ভরে শুঁকতে পারো। কিন্তু গন্ধ যদি স্যাঁতস্যেঁতে বা বিরক্তিকর মনে হয়, তবে বুঝতে হবে বইটার একটু বেশি যত্ন দরকার!

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট

আরও পড়ুন