বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার করা প্রথম জিনিস কী
ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে অবিরাম। ৬০ সেকেন্ডে ১ মিনিট, ৬০ মিনিটে ১ ঘণ্টা। দৈনন্দিন জীবনের খুব সাধারণ এ হিসাবের পেছনে লুকিয়ে আছে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে পুরোনো এক বৈজ্ঞানিক রহস্য। আড়াই হাজার থেকে চার হাজার বছর আগে, বর্তমান ইরাকের টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরের প্রাচীন ব্যাবিলন শহরে জন্ম হয়েছিল এই অদ্ভুত নিয়মের। শুধু সময় গণনা নয়, মানবজাতির ইতিহাসের প্রথম সত্যিকারের বিজ্ঞানীদের জন্মও হয়েছিল সেই প্রাচীন ধুলোমাখা শহরে।
আদিম যুগের কৃষকেরা জানতেন কখন বৃষ্টি হতে পারে বা কখন বীজ বুনতে হবে। শিকারিরা জানতেন পশুপাখির চলাফেরার ধরন। বেঁচে থাকার তাগিদে প্রকৃতির এই সাধারণ বোঝাপড়াকে ঠিক বিজ্ঞান বলা যায় না। বিজ্ঞান হলো এমন একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা, যেখানে চারপাশের জগৎকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গাণিতিক সূত্র তৈরি করা হয় এবং সেই জ্ঞান লিখে রাখা হয় পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। আর এই মাপকাঠিতে বিচার করলে, পৃথিবীর প্রথম বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারটি ছিল ব্যাবিলনীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান।
প্রাচীন ব্যাবিলনে দেয়ালঘড়ি বা ছাপা ক্যালেন্ডার বলে কিছু ছিল না। বিশাল আকাশটাই ছিল তাদের ঘড়ি। চাঁদের দশা বদলানোর সময়কে তারা ধরত এক মাস, সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর একবার ঘুরে আসাকে বলত এক বছর। কিন্তু শুধু সময় মাপার জন্য তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত না। ব্যাবিলনের মানুষের জীবন ছিল অদ্ভুত। সেখানে কখনো সব ঠিকঠাক চলত, নিয়ম করে ঋতু বদলাত, ফসল উঠত, উৎসব হতো আবার কখনো হঠাৎ করেই নেমে আসত অন্ধকার। অর্থাৎ খরা, বন্যা, মহামারি বা অল্প বয়সে রাজার মৃত্যু।
পৃথিবীর এই অনিশ্চয়তা ব্যাবিলনীয়দের ভাবিয়ে তুলত। রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা দেখত, বেশির ভাগ তারা একটা নির্দিষ্ট নিয়মে চললেও কিছু কিছু গ্রহ হঠাৎ পথ বদলায়। মঙ্গল বা বৃহস্পতির মতো গ্রহগুলো সোজা চলতে চলতে হঠাৎ আকাশে থেমে যায়, এরপর কিছুদিন উল্টো দিকে হেঁটে আবার সোজা পথে ফেরে! বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে রেট্রোগ্রেড মোশন। কখনো আবার হঠাৎ সূর্য বা চাঁদ পুরোপুরি ঢেকে যায়। তারা বিশ্বাস করত, আকাশের এই অদ্ভুত আচরণগুলো আসলে পৃথিবীতে কী ঘটতে যাচ্ছে, তার পূর্বাভাস বা সংকেত। যেমন চাঁদের ওপর পৃথিবীর ছায়া পড়ার ধরন দেখে তারা হয়তো বুঝত যে বড় কোনো বন্যা ধেয়ে আসছে।
এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো মিলিয়ে দেখার জন্য ব্যাবিলনীয় লিপিকারেরা কাদা-মাটির তৈরি নরম ফলকে নলখাগড়ার কলম দিয়ে কিউনিফর্ম লিপিতে তথ্য খোদাই করে রাখতেন। এরপর সেগুলো আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করে রাখা হতো। আকাশের সংকেত আর তার অর্থ নিয়ে তাঁদের একটি বিখ্যাত বইয়ের নাম ছিল ‘এনুমা আনু এনলিল’। জ্যোতির্বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি লেখা ছিল ‘মুল.আপিন’ নামে আরেকটি বইয়ে। এর অর্থ ‘লাঙল নক্ষত্র’। এতে তারাদের অবস্থান, বছরে কখন তাদের প্রথম দেখা যাবে, সূর্য ও চাঁদের চলার পথ নিখুঁতভাবে লেখা ছিল।
এরপর তাঁরা শুরু করলেন ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বৈজ্ঞানিক প্রজেক্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানের দিনলিপি লেখা। এ ডায়েরিতে তাঁরা প্রতিদিন চাঁদ ও গ্রহগুলোর অবস্থানের পাশাপাশি পৃথিবীর আবহাওয়া, এমনকি শস্যের দামও লিখে রাখতেন। অবাক করা বিষয় হলো, এ ডায়েরি লেখার কাজ টানা ৭০০ বছর ধরে চলেছিল!
টানা শত শত বছর ধরে তথ্য সংগ্রহের পর ব্যাবিলনীয়রা গণিতের জাদুতে আকাশের গতিবিধি আগে থেকে বলে দেওয়ার কৌশল শিখে ফেললেন। তাঁরা গোল-ইয়ার নামে একটি হিসাব বের করলেন। তাঁরা নিখুঁত হিসাব করে দেখলেন, শুক্র গ্রহের ঠিক একই জায়গায় ফিরে আসতে আট ব্যাবিলনীয় বছর সময় লাগে। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর দিকে তাঁরা এফিমেডিস নামে কিছু গাণিতিক টেবিল বা ছক তৈরি করেন। এই ছক দেখে তাঁরা একদম নিখুঁতভাবে বলে দিতে পারতেন, ভবিষ্যতে কখন কোন গ্রহ কোথায় থাকবে বা কখন গ্রহণ হবে।
ব্যাবিলনীয়দের এই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের প্রভাব আজও আমাদের জীবনে জড়িয়ে আছে। গ্রিক জ্যোতির্বিদেরা ব্যাবিলনীয়দের এ তথ্য ব্যবহার করেই আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্যামিতিক ভিত্তি গড়েছিলেন। নাসার ওয়েবসাইটে তিন হাজার সাল পর্যন্ত চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণের যে নিখুঁত তালিকা দেওয়া আছে, তার আদি রূপটি এই ব্যাবিলনীয় বিজ্ঞানীরাই তৈরি করেছিলেন।
সেই যে লেখার শুরুতে ৬০ সেকেন্ড আর ৬০ মিনিটের কথা বলেছিলাম, ব্যাবিলনীয়রা আমাদের মতো ১০-ভিত্তিক দশমিক সংখ্যাপদ্ধতি ব্যবহার করত না। তারা ব্যবহার করত ৬০-ভিত্তিক পদ্ধতি। আকাশের কোণ, গ্রহের অবস্থান এবং সময় মাপার জন্য এই ৬০ সংখ্যাটি এতটাই নিখুঁত ছিল যে আধুনিক বিজ্ঞানীরাও সময় গণনার ক্ষেত্রে ব্যাবিলনদের ওই নিয়ম আর বদলাননি!