হ্যালির আগেই কি কেউ আবিষ্কার করেছিল ‘হ্যালির ধূমকেতু’
আকাশের দিকে তাকালে মাঝেমধ্যে ঝাড়ুর মতো লেজওয়ালা যে অতিথিকে দেখা যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো হ্যালির ধূমকেতু। ছোটবেলায় সাধারণ জ্ঞানের বইয়ে আমরা সবাই পড়েছি, বিজ্ঞানী এডমন্ড হ্যালি এর আবিষ্কারক। তিনি বলেছিলেন, প্রতি ৭৬ বছর পরপর এই ধূমকেতু পৃথিবীর আকাশে ফিরে আসে।
কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। হ্যালি নন, তাঁরও বহু শতক আগে এক মধ্যযুগীয় সন্ন্যাসী এই ধূমকেতুর রহস্য ভেদ করেছিলেন! ইতিহাস কি তবে ভুল জানত?
ঘটনাটা আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর আগের। ১১ শতকের কথা। ইংল্যান্ডের মালমসবারির এক মঠের সন্ন্যাসীর নাম এইলমার। তিনি এথেলমেয়ার নামেও পরিচিত ছিলেন। নেদারল্যান্ডসের লাইডেন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সাইমন পোর্টিগিস জোয়ার্ট ও ঐতিহাসিক লুইস প্রাচীন নথিপত্র ঘেঁটে বলছেন, এইলমারই প্রথম ব্যক্তি, যিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আকাশে দেখা দুটি ভিন্ন সময়ের ধূমকেতু আসলে একই বস্তু।
এইলমারের এই পর্যবেক্ষণের কথা লিখে রেখেছিলেন ১২ শতকের ইতিহাসবিদ উইলিয়াম অব মালমসবারি। এত দিন আধুনিক বিজ্ঞানীরা সেই লেখাগুলো তেমন গুরুত্ব দেননি। কিন্তু ‘ডোরস্টাড অ্যান্ড এভরিথিং আফটার’ বইয়ে গবেষকেরা দাবি করেছেন, এইলমার নিজেই ধূমকেতুটিকে দুইবার দেখেছিলেন।
১০৬৬ সাল। ইংল্যান্ডের আকাশে উদয় হলো এক লেজওয়ালা তারা। তখন মানুষ ধূমকেতুকে দেখত ভয়ের চোখে। তারা ভাবত, এটা রাজা-বাদশাদের পতন, যুদ্ধ কিংবা মহামারির সংকেত। রাজা হ্যারল্ড গডউইনসনের রাজত্ব তখন নড়বড়ে। ঠিক সেই সময় বৃদ্ধ সন্ন্যাসী এইলমার আকাশের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠলেন।
১০৬৬ সালে যখন ধূমকেতুটি দেখা গেল, তখন এইলমার বেশ বয়স্ক। তিনি হঠাৎ বুঝতে পারলেন, ঠিক এই একই রাক্ষুসে তারা তিনি তাঁর যৌবনে দেখেছিলেন। সেটা ছিল ৯৮৯ সাল। দুই ঘটনার মাঝখানের সময়টা হিসাব করে তিনি বুঝলেন, এটা নতুন কোনো আপদ নয়, সেই পুরোনো অতিথিই ফিরে এসেছে। অর্থাৎ হ্যালির জন্মের প্রায় ৬০০ বছর আগেই এইলমার ধূমকেতুটির ফিরে আসার চক্র ধরে ফেলেছিলেন! তিনি রাজাকে সতর্কও করেছিলেন, সামনে বড় বিপদ আসছে!
তাহলে এডমন্ড হ্যালি কী করলেন? তিনি ১৭ শতকে অঙ্ক কষে বিজ্ঞানসম্মতভাবে দেখিয়েছিলেন, ১৫৩১, ১৬০৭ ও ১৬৮২ সালে দেখা দেওয়া ধূমকেতুগুলো আসলে একই। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, এটি একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর ফিরে আসে। তাঁর এই নিখুঁত হিসাবের কারণেই এর নাম হয় হ্যালির ধূমকেতু।
তবে ১০৬৬ সালের ওই ধূমকেতু শুধু এইলমার দেখেননি। সুদূর চীনেও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এটি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এবং টানা দুই মাস ধরে এর রেকর্ড রেখেছিলেন। এমনকি এই ধূমকেতুর ছবিও আঁকা আছে। সে যুগে অবশ্য কুসংস্কারও কম ছিল না। ৯৯৫ সালে আর্চবিশপ সিজেরিকের মৃত্যুর সময় নাকি একটা ধূমকেতু দেখা গিয়েছিল বলে রটনা আছে। কিন্তু গবেষকেরা বলছেন, ওটা ছিল সেই যুগের গুজব!
মানুষকে ভয় দেখাতেই ওটা রটানো হয়েছিল, বাস্তবে কোনো ধূমকেতু আসেনি। তাহলে কি এখন আবার নাম বদলানো উচিত? গবেষকেরা বলছেন, যেহেতু এইলমারই প্রথম এই চক্র শনাক্ত করেছিলেন এবং এটি যে একই বস্তু তা বুঝতে পেরেছিলেন, তাই ধূমকেতুটির নাম বদলে ফেলা উচিত।
নাম বদলানো হোক বা না হোক, ইতিহাসের ধুলা ঝেড়ে এইলমারকে যে সামনে আনা হলো, সেটাই–বা কম কী! হয়তো ভবিষ্যতে আমরা হ্যালির ধূমকেতু না বলে একে এইলমারের ধূমকেতু বলব! সূত্র: সাইটেক ডেইলি