রিলস কীভাবে আমাদের মনোযোগের বারোটা বাজাচ্ছে
ফোন হাতে নিয়েছিলে ৫ মিনিটের জন্য। তারপর চোখ তুলে দেখলে এক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। তোমার কি ব্যাপারটা চেনা চেনা লাগছে?
এটি তোমার একার সমস্যা না এটা। তোমার চারপাশের সবাই এই ফাঁদে পড়েছে। কিন্তু ফাঁদটা কোথায়, সেটা না বুঝলে এই অভ্যাস থেকে বের হওয়া কঠিন।
মাথার ভেতরে আসলে কী হচ্ছে?
রিলস বানানোতে উৎসাহ দেওয়ার পেছনে আছে মেগা বা জায়ান্ট সব কোম্পানি। তারা কিন্তু বোকা না। তারা এমনভাবে রিলস দেখার ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যার শেষ নেই। একটা শেষ হলে আরেকটা আসে। থামে না। ইচ্ছে করেই ওরা এমনটা করেছে।
প্রতিটা ভিডিও এখন বেশ ছোট। ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ড। দেখতে দেখতে মনে হয় ‘আর একটাই’ দেখি। সেই একটা দেখতে গিয়ে দেখাটা আর থামে না।
তুমি হয়তো জানো না, তোমার মাথার ভেতরে একটা রাসায়নিক ক্ষরণ হয়, নাম ডোপামিন। নতুন কিছু দেখলে এটা বের হয়। ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি হয়। রিলস সেই ভালো লাগাকে বারবার টোকা মারে। মস্তিষ্ক আরও ডোপামিন চায়। এটা কিন্তু তোমার দোষ না। তোমাকে এভাবে স্ক্রিনে টানার জন্যই বানানো হয়েছে এই সিস্টেম।
মনোযোগ কোথায় গেল?
একটা সময় ছিল, বই খুললে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়তে পারতে। এখন দুই পাতা পড়ার আগেই মন সরে যায়। মনোযোগ থাকে না। এটা কি তোমারও হচ্ছে?
কারণটা সহজ। রিলস মাথাকে শিখিয়ে দিচ্ছে, প্রতি ২০ সেকেন্ডে নতুন কিছু আসবে। ধৈর্য ধরার দরকার নেই। কিন্তু পড়াশোনায়, খেলাধুলায় বা যেকোনো কাজে একটু ধৈর্য লাগে। ধৈর্যটাই কমছে।
ঘুমেরও বারোটা বাজছে। রাতে শুয়ে রিলস দেখলে মাথা জেগে থাকে। ঘুম আসতে দেরি হয়। পরদিন স্কুলে ঝিমুনি আসা। পরীক্ষার সময় মাথা কাজ করে না।
তুলনা চলছে সবার সঙ্গে
রিলসে কী দেখছ? কারও পারফেক্ট চেহারা। কারও দুর্দান্ত ট্যালেন্ট। কারও দামি ফোন, ব্র্যান্ডের জামা, বিদেশভ্রমণ। দেখতে দেখতে মনে হয়, ‘আমি কেন এ রকম না?’
এই অনুভূতিটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ, ওই ভিডিওগুলো সত্যি না। মানে, মিথ্যাও না। তবে সাজানো। সেরা মুহূর্ত বেছে নিয়ে বানানো। ফিল্টার দেওয়া। দশটা ভিডিও টেক নিয়ে একটা রাখা। আসল জীবনে রিলের ওই মানুষটাও ব্রণ উঠলে বিরক্ত হয়। পরীক্ষায় খারাপ করে, মাঝেমধ্যে মন খারাপ করে একা বসে থাকে। কিন্তু সেটা রিলসে আসে না। তুমি তার হাইলাইট রিলের সঙ্গে নিজের জীবন মেলালে ভুল করা হবে। এটা কখনো সঠিক তুলনা না।
তাহলে কী করবে?
ফোন ছেড়ে দাও, এটা বলছি না। বাস্তব না সেটা। কিন্তু ছোট কিছু কাজ আছে, যেগুলো সত্যিই কাজে লাগে। স্ক্রিন টাইম একবার দেখো। ফোনের সেটিংসে ঢুকলেই দেখাবে কতক্ষণ কাটাচ্ছ। সংখ্যাটা দেখলে নিজেই চমকে যাবে। বেশির ভাগ মানুষ দিনে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা শুধু স্ক্রলেই কাটিয়ে দেয়। খাওয়ার সময় ফোন রাখো দূরে কোথাও। এই একটা অভ্যাস বদলালে দিনে অন্তত আধঘণ্টা বাঁচবে। আর পরিবারের সঙ্গে দুটো কথা হবে।
ঘুমানোর আগে ফোন ঘরের বাইরে রাখতে পারো। চার্জে দিয়ে রাখো বসার ঘরে। শুরুতে অস্বস্তি লাগবে। এক সপ্তাহ পরে ঘুমের অভ্যাস নিজেই ঠিক হবে।
‘আর একটা’ বলার মুহূর্তে থামো। ঠিক ওই মুহূর্তে ফোন নামিয়ে রাখো। এটাই সবচেয়ে কঠিন, কিন্তু এটাই দরকার সবচেয়ে বেশি। নোটিফিকেশন বন্ধ করো। রিলস অ্যাপের নোটিফিকেশন অফ রাখো। নিজে খুলবে, যখন দরকার হবে।
একটাই প্রশ্ন
রিলস খারাপ না। হাসির ভিডিও আছে, শেখার ভিডিও আছে। কিছু রিলস সত্যিই দারুণ। কিন্তু একটাই প্রশ্ন, তুমি রিলস দেখছ, নাকি রিলস তোমাকে দেখিয়ে নিচ্ছে?
যতক্ষণ বেছে নিচ্ছ, ঠিক আছে। যখন নামাতে পারছ না, তখন বুঝতে হবে, নিয়ন্ত্রণটা সরে গেছে। তোমার মনোযোগ তোমার সবচেয়ে দামি জিনিস। ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউব সেটা কিনে নেয় বিনা মূল্যে। তুমি টেরও পাও না। একটু সতর্ক থাকলেই হবে। ফোন ছাড়তে হবে না, শুধু নিয়ন্ত্রণটা নিজের হাতে রাখতে হবে।
সূত্র: রিভিয়ার হেলথ