কয়েক সপ্তাহেই সারবে জয়েন্টের ক্ষয়, আশা দেখাচ্ছে নতুন গবেষণা
আমাদের শরীরের জয়েন্ট বা সংযোগস্থলে একটি নরম, মসৃণ স্তর থাকে, যার নাম কার্টিলেজ। হাঁটা, দৌড়ানো বা নড়াচড়াকে সহজ করে এই কার্টিলেজ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ক্ষয় হতে থাকে। ক্ষয়ের কারণে একসময় দেখা দেয় দীর্ঘস্থায়ী রোগ অস্টিওআর্থ্রাইটিস। এতে জয়েন্টে ব্যথা হয়, ফুলে যায় বা শক্ত হয়ে যায়। সব মিলিয়ে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ এই সমস্যায় ভুগছেন। এখন পর্যন্ত এই রোগ পুরোপুরি সারানোর কোনো উপায় বের হয়নি। চিকিৎসকেরা সাধারণত ব্যথা কমানোর চেষ্টা করেন, বা শেষ পর্যন্ত জয়েন্ট বদলে ফেলার মতো বড় অস্ত্রোপচারের দিকে যেতে হয়।
তবে নতুন একটি গবেষণা আশার খবর দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উইনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডারের একদল গবেষক এমন একটি ইনজেকশন তৈরির কাজ করছেন, যা নষ্ট হয়ে যাওয়া কার্টিলেজকে আবার গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। শুধু তা–ই নয়, এটি শরীরের নিজস্ব কোষগুলোকে সক্রিয় করে ক্ষতিগ্রস্ত অংশকে নিজ থেকে ঠিক করার চেষ্টা চালায়।
গবেষণার নেতৃত্বে আছেন স্টিফেনি ব্র্যায়ান্ট। তিনি বলেন, মাত্র দুই বছরের মধ্যেই তাঁরা একটি ‘অসম্ভব’ ধারণা থেকে বাস্তবে এসে পৌঁছেছেন। প্রাণীর ওপর পরীক্ষায় এই পদ্ধতি অস্টিওআর্থ্রাইটিস উল্টো ঘুরিয়ে দিতে পেরেছে।
এই চিকিৎসায় ব্যবহার করা হচ্ছে একধরনের বিশেষ ওষুধ প্রয়োগব্যবস্থা। এটি জয়েন্টে ইনজেকশন হিসেবে দেওয়া হয় এবং ধীরে ধীরে ওষুধ বের হয়। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এই ওষুধ কাজ করতে পারে। পাশাপাশি গবেষকেরা একটি ইনজেক্টেবল ‘ইমপ্ল্যান্ট’ নিয়েও কাজ করছেন, যা জয়েন্টে থেকে শরীরের কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত কার্টিলেজ মেরামতে প্রভাবিত করে।
অস্টিওআর্থ্রাইটিসের চারটি ধাপ আছে। শুরুতে কার্টিলেজ একটু একটু করে কমে। কিন্তু শেষ ধাপে এসে কার্টিলেজ পুরোপুরি হারিয়ে যায়। তখন হাড়ের সঙ্গে হাড় ঘষা খায়। তখন ব্যথা, ফোলা আর চলাফেরার কষ্ট অনেক বেড়ে যায়।
ইভালিন বারগার নামের আরেক গবেষক বলেন, এখনকার চিকিৎসায় রোগীদের হয় বড় অপারেশন করতে হয়, নয়তো শুধু ব্যথা সহ্য করতে হয়। এই নতুন গবেষণা এর ‘মাঝখানের সমাধান’ হতে পারে।
তবে এখনো এটি মানুষের ওপর পরীক্ষা করা হয়নি। প্রথম ধাপের পরীক্ষা করা হয়েছে প্রাণীর ওপর। এবার গবেষকেরা নিরাপত্তা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে আরও পরীক্ষা করবেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী দেড় বছরের মধ্যে মানুষের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হতে পারে।
এদিকে অন্য গবেষণাতেও কিছুটা আশার ইঙ্গিত মিলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এমন একটি প্রোটিন খুঁজে পেয়েছেন, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে কার্টিলেজ কমে যাওয়ার জন্য দায়ী। এই প্রোটিন নিয়ন্ত্রণ করা গেলে হয়তো ভবিষ্যতে জয়েন্টের ক্ষয় ঠেকানো সম্ভব হবে। এ ছাড়া ডায়াবেটিসের ওষুধে ব্যবহৃত সেমাগ্লুটাইড নামের একটি উপাদানও কার্টিলেজ ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে, এমন ধারণাও পাওয়া গেছে।
তবে যত নতুন চিকিৎসাই আসুক, কিছু সাধারণ অভ্যাস এখনই আমাদের সাহায্য করতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম করলে পেশি শক্ত হয়, ফলে জয়েন্টের ওপর চাপ কমে। আর নড়াচড়া করলে জয়েন্টে পুষ্টিকর তরলের চলাচল বাড়ে, যা কার্টিলেজকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
অস্টিওআর্থ্রাইটিস নিয়ে গবেষণা এখনো শুরুর পর্যায়ে রয়েছে। হয়তো এমন চিকিৎসা শীঘ্রই পাওয়া যাবে, যেখানে শুধু ব্যথা কমানো না, রোগটিই পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট