পাবলিক প্লেসে হেডফোন পরা কি অভদ্রতা

আইফোন থেকে হেডফোন জ্যাক বাদ দেওয়ায় বড় হয়েছে এয়ারপডসের বাজারঅ্যাপল

মেট্ররেলে বা বাসে উঠে তুমি হয়তো পকেট থেকে ইয়ারবাডজোড়া বের করে কানে গুঁজে দাও। তারপর বাসে বা মেট্রোতে চড়ার পুরোটা সময় কোনো দরকারি পডকাস্ট, অডিও বুক বা পছন্দের গান শুনতে থাকো। তোমার হয়তো মনে হয়, এতে সময়টা বেশ কাজে লাগছে। এক ঢিলে দুই পাখি মারা যাচ্ছে! কিন্তু তোমার মনোবিজ্ঞানী হয়তো বলবেন, তুমি আসলে নিজের চিন্তার সঙ্গে একা থাকার ভয়ে এসব অডিও দিয়ে নিজেকে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করছ!

কিন্তু তোমার যদি ইয়ারবাড ছাড়া চলার অভ্যাস না থাকে, তবে ইয়ারবাড ছাড়া একবার বাসে চড়ে দেখতে পারো। প্রথম প্রথম মনে হবে যেন কোনো শাস্তি পাচ্ছ। চারপাশের ঝকঝকে আলো, তোমার নিজের এলোমেলো সব চিন্তা—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত অস্বস্তি তৈরি হবে। মনে হবে, বাসে চড়ে রাস্তা যেন আর শেষ হতে চাইছে না। তুমি বাধ্য হয়ে রাস্তার দিকে তাকাবে বারবার।

আরও পড়ুন

কিন্তু একটা সময় পর তুমি দেখবে, চারপাশের পৃথিবীটা আসলে এতটা খারাপ নয়। তুমি হয়তো খেয়াল করবে, পাশের বয়স্ক মানুষটি তোমার কাছে একটু সাহায্য চাইছে। তুমি হয়তো তার সঙ্গে হেসে দু-চারটে কথাও বলতে পারছ। এই ছোট পরীক্ষাটা আমাদের সামনে একটা বড় প্রশ্ন তুলে ধরে—জনসমাগমে বা বাইরে হেডফোন পরে থাকা কি আসলেই অভদ্রতা?

মেট্রোর লাইনে তোমার সামনে দাঁড়ানো ওই মানুষটার কথা ধরা যাক। সে কানে ইয়ারবাড গুঁজে কার্ডে টাকা রিচার্জ করছে। ৫০০ টাকার নোট এগিয়ে দিয়েছে। টাকা রিচার্জ করতে সাহায্য করা কর্মী হয়তো তিনবার জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘পুরো টাকাটা রিচার্জ করবেন, নাকি কত?’ কিন্তু সে হয়তো কিছুই শুনছে না। হয়তো হাত নেড়ে বোঝানোর চেষ্টা করছে, সব ঠিক আছে। এটা কি অভদ্রতা? অনেকেই মনে করেন, কানে হেডফোন গুঁজে কারও সঙ্গে কথা বলা মানে সামনের মানুষটিকে চরম অপমান করা। মনে হয় যেন তাকে কোনো মানুষ নয়, স্রেফ একটা মেশিন ভাবা হচ্ছে!

তবে এর উল্টো যুক্তিও আছে। অনেকের কাছে বাইরের কোলাহল সহ্য করা কঠিন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাদের সেনসরি সেনসিটিভিটি আছে, তাদের কাছে হেডফোন কোনো বিলাসিতা নয়, বরং বাইরের পৃথিবীতে টিকে থাকার হাতিয়ার। আবার আজকালকার ইয়ারবাডগুলো এতই ছোট যে অনেকেই ভুলে যান, তাঁদের কানে কিছু একটা গোঁজা আছে!

আরও পড়ুন

তবে হেডফোন পরার চেয়েও বড় অপরাধ হলো হেডফোন না পরা! হ্যাঁ, সেই মানুষদের কথা বলছি, যারা পাবলিক প্লেসে বা বাসে-ট্রেনে বসে ফুল ভলিউমে টিকটক দেখে বা জোরে জোরে স্পিকারে দিয়ে ভিডিও কল করে। কেউ হয়তো হাসপাতালের ওয়েটিং রুমে বসে ব্যক্তিগত গল্প সবাইকে শোনাচ্ছে!

এটা কোনোভাবেই ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বলা যাবে না, বরং এটি চারপাশের মানুষের ওপর একধরনের সামাজিক অত্যাচার! তোমার মোবাইলের অডিও একান্তই তোমার। যখনই সেটা অন্যের কানে গিয়ে পৌঁছায়, তখনই সেটা সমস্যা। হেডফোন বা ইয়ারবাড তৈরিই করা হয়েছিল এই সমস্যা সমাধানের জন্য। জনসমাগমে হেডফোন ব্যবহার না করা কোনো স্টাইল নয়, এটি চারপাশের মানুষের প্রতি একধরনের আগ্রাসন।

তাহলে ভদ্রতার সীমারেখা কোথায়? জনসমাগমে হেডফোন পরা নিয়ে একটা অলিখিত সামাজিক নিয়ম বা শিষ্টাচার আছে। এই নিয়মগুলো মেনে চললে তুমি আর অভদ্রতার কাতারে পড়বে না। যেমন তুমি যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটছ, বাসে বসে আছ বা একা শপিং করছ, তখন হেডফোন পরা সম্পূর্ণ ঠিক আছে। পৃথিবীর সব বিরক্তিকর কোলাহল শোনার কোনো বাধ্যবাধকতা তোমার নেই। বাসে পাশের সিটের লোকটির বকবকানি থেকে বাঁচতেও হেডফোন দারুণ কাজে দেয়। কিন্তু যখনই তুমি কারও সঙ্গে সরাসরি কথা বলছ—হোক সে ক্যাশিয়ার, ওয়েটার বা রাস্তায় ঠিকানা জিজ্ঞাসা করা কোনো মানুষ—অবশ্যই কানের ইয়ারবাড খুলে নাও। শুধু পডকাস্ট পজ করে রাখলে হবে না, কান থেকে পুরোপুরি খুলে ফেলাটাই হলো আসল ভদ্রতা। এটা করতে তোমার মাত্র তিন সেকেন্ড সময় লাগবে, কিন্তু সামনের মানুষটি এতে সম্মানিত বোধ করবেন।

আরও পড়ুন

তবে পাবলিক প্লেসে স্পিকারে জোরে গান বাজানো কোনো অবস্থাতেই সমীচীন নয়। তোমার হেডফোনের চার্জ শেষ? তাহলে চুপচাপ বসে থাকো। কিন্তু স্পিকারে গান বাজিয়ে অন্যের বিরক্তির কারণ হওয়া অভদ্রতা।

বাইরে হেডফোন পরা নিজে থেকে কোনো খারাপ কিছু নয়। তবে পরিস্থিতি বুঝে সেটা কান থেকে নামাতে না পারাটা অবশ্যই অভদ্রতা। তুমি চাইলে বাজার করতে গিয়ে পডকাস্ট বা গান শুনতেই পারো। কিন্তু বিল দেওয়ার সময় ঠিকই ইয়ারবাডজোড়া পকেটে পুরে রাখো। একটু কান খুলে চারপাশের আওয়াজ শুনেই দেখো না! দেখবে, বাইরের এই বিরক্তিকর পৃথিবীটা আসলে ততটাও একঘেয়ে নয়। নিজের চিন্তার সঙ্গে কিছুক্ষণ একা থাকা তোমার মস্তিষ্কের জন্যই বরং ভালো!

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট

আরও পড়ুন