ভিঞ্চির আইডিয়া থেকে যেসব আবিষ্কার এসেছে
‘মোনালিসা’ চিত্রকর্মের কারণে বিখ্যাত হয়ে যান ইতালির চিত্রশিল্পী লেওনার্দো দা ভিঞ্চি। অথচ এর বাইরে তিনি এমন অনেক কাজ করেছেন ও কীর্তি গড়েছেন, যার যেকোনো একটির জন্য তিনি পৃথিবীর ইতিহাসে অমর হয়ে থাকতেন।
তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা একজন ব্যক্তি। সব সময় বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তা করতেন। নিত্যনতুন আবিষ্কারের চিন্তা তাঁর মাথায় ঘুরত। তিনি শুধু এসব আবিষ্কারের চিন্তা মাথায় ধারণ করেই ক্ষান্ত দেননি, কাগজে-কলমেও সেগুলোর ডিজাইন করেছিলেন। এখন থেকে প্রায় ৫০০ বছরের আগে তিনি এমন সব আবিষ্কারের কথা ভেবেছিলেন, যা সে সময় কেউ কল্পনাও করতে পারত না। তাঁর কিছু ভাবনার ফসল হচ্ছে আধুনিক বেশ কিছু যন্ত্র। চলো দেখি কী কী যন্ত্র আমরা তাঁর কারণে পেয়েছি:
অরিনথোপটেরস
১৪৮৫ সাল থেকে ভিঞ্চি পাখিদের ওড়া নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তিনি বুঝেছিলেন পাখির মতো ডানা লাগালেই মানুষ আকাশে উড়তে পারবে না, কারণ মানুষের শরীর অনেক ভারী। আর তাই তিনি একটা যন্ত্রের কথা ভাবলেন, যেটা পাখির মতো মানুষকে আকাশে উড়তে সাহায্য করবে। এরপর তিনি সেটার ডিজাইন এঁকে ফেললেন। এতে দুটি বিশাল ডানা যুক্ত করলেন, এতে আর ছিল প্যাডল আর ছিল পুলি।
লেওনার্দোর ছবি থেকে প্রথম অরিনথোপটেরস নির্মাণ করেছিলেন ইতালীয় বংশোদ্ভূত পোলিশ বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবক তাইতুস লিউইজ বোরাতাইনি। সেটা মানুষকে আকাশে উড়াতে পারেনি। তবে ১৮৭১ সালে ফ্রান্সের আলফন্সো পিনোদ, আবেল পিয়েরে দ্য ভিলেনেউভে ও ভিক্টর টাইটান যে অরিনথোপটেরস তৈরি করেন, সেটা আকাশে উড়তে পেরেছিল আর বেশ খানিকটা দূরত্ব পাড়ি দিতে পেরেছিল। হয়তোবা আজকের গ্লাইডারের আইডিয়া কেউ একজন সেখান থেকেই চিন্তা করেছেন।
হেলিক্যাল এয়ার স্ক্রু
শুধু পাখির মতো ডানা মেলে নয়, আকাশে একটা যন্ত্রের সাহায্যের মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে—এ রকম কল্পনাও করেছিলেন লেওনার্দো। ১৪৮০ সালে যে যন্ত্রের ডিজাইন তিনি করেছিলেন, সেটা হচ্ছে হেলিক্যাল এয়ার স্ক্রু। সরাসরি আকাশে উড়বে—এমন সেই যন্ত্রের আইডিয়ার ছবি তিনি এঁকেও ফেলেন সঙ্গে সঙ্গে। থমাস আলভা এডিসন এ রকম একটা যন্ত্র বানিয়ে আকাশে ওড়ানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু গানপাউডার ব্যবহার করার কারণে সেটি বিস্ফোরিত হয়। ১৯০৬ সালে ফরাসি দুই ভাই জ্যাক ও লুইস ব্রেগুয়েত প্রথম মাটি থেকে সরাসরি আকাশে উড়বে এমন যন্ত্রের ডিজাইন করেন, সেটার নাম দেওয়া হয় জাইরোপ্লেন। ১৯০৭ সালে ফরাসি আবিষ্কারক পল করনু প্রথম যে সরাসরি আকাশে ওড়ার যন্ত্র আবিষ্কার করেন সেটার নাম ছিল হেলিকপ্টার। রাশিয়ায় জন্ম নেওয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে বসতি গড়া ইগোর সিকোরস্কি নামের এক বৈজ্ঞানিক ও আকাশযান নির্মাণের অন্যতম কারিগর ১৯০৯ সালে আকাশে ওড়ার যে যন্ত্রের ডিজাইন করেন, সেটাকে প্রথম আধুনিক হেলিকপ্টারে সূচনা হিসেবে ধরা হয়।
প্যারাস্যুট
ভিঞ্চি শুধু আকাশের উড়তে চাননি, সেই সঙ্গে যাতে মেঘের দেশ থেকে মানুষ যেন নিরাপদে মাটিতে নেমে আসতে পারে, তার জন্য একটা যন্ত্রের ডিজাইন করেছিলেন। প্রায় ১২ হাত লম্বা ও ১২ হাত চওড়া এই যন্ত্রটির ডিজাইন তার কোডেক্স আটলান্টিকাসে নামের খাতায় পাওয়া গিয়েছিল। এটা আসলে আধুনিক যুগের প্যারাস্যুটের আইডিয়া হিসেবে চিহ্নিত হয়। এটি তিনি এঁকেছিলেন ১৪৮৫ সালে। ক্রোয়েশিয়ার একজন আবিষ্কারক ফাউস্ত ভ্রানাজিও ভ্রানাচিচ প্রথম ভিঞ্চির ডিজাইন করা প্যারাস্যুট নিয়ে একটা সেতুর ওপর থেকে লাফ দেন। লুইস সেবাস্টিয়ান লেনরমান্দ নামের একজন ফরাসি আবিষ্কারক প্রথম আধুনিক প্যারাস্যুট আবিষ্কার করেন ও ১৭৮৩ সালে সফলভাবে প্যারাস্যুট জাম্প দিয়ে অক্ষত অবস্থায় মাটিতে নামেন। প্যারাস্যুট নামটাও তাঁরই আবিষ্কার।
থার্টি থ্রি ব্যারেলড অর্গান
লেওনার্দো এমন এক যন্ত্র বানাতে চেয়েছিলেন, যেটা একই সঙ্গে অনেকগুলো গোলা একবারে ছুড়তে পারবে। তিনি সেটার একটা ডিজাইন করেছিলেন, সেটা আর কোনো দিন তৈরি করা হয়নি, তবে এর কাছাকাছি যন্ত্র বানানো হয়েছে, যা পরে মানুষের মৃত্যুর একটা হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, সেটির নাম মেশিনগান।
ট্যাংক
ট্যাংক লেওনার্দো দা ভিঞ্চি আবিষ্কার করেননি, তবে তিনি এমন একটা যন্ত্রের কথা ভেবেছিলেন, যেটি গাড়ির মতো চলতে চলতে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হামলা চালাবে। একটা গাড়িতে চাকা যুক্ত করে সেটাকে একটা কাঠের শক্ত আবরণে ঢেকে দিয়ে তিনি সেই যান দিয়ে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করার যে আইডিয়ার কথা ভেবেছিলেন। সেটাকে বাস্তবে পরিণত করেন বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্র ও অতীতের বোহেমিয়ান রাজ্যের সেনাপতি জ্যান জিজকা। তিনি হুসাইট নামের এক যুদ্ধে প্রথম এ রকম কাঠের ওয়েগেনবার্গ নামের এক যুদ্ধযান ব্যবহার করেন।
তবে আধুনিক ট্যাংকের গল্পটা লিখেছিলেন এইচ জি ওয়েলস একটি সায়েন্স ফিকশন গল্পে, যার নাম দ্য ল্যান্ড আয়রনক্লাড। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ট্যাংক নামের যন্ত্রটি প্রথম ব্যবহৃত হয়, পরবর্তী এই ট্যাংক হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম এক যুদ্ধাস্ত্র।