বিশ্বের সবচেয়ে বড় সুড়ঙ্গ কোনটি
সুড়ঙ্গ বা টানেল শব্দটা শুনলেই আমাদের মনে হয় কোনো ট্রেন বা মেট্রোরেলের রাস্তা। বাংলাদেশের কর্ণফুলী টানেল দিয়ে যেহেতু গাড়ি চলে, তাই শোঁ শোঁ করে ছুটে চলা কোনো গাড়ির দৃশ্যও কারও মনে হতে পারে। তবে বিশ্বের দীর্ঘতম টানেলটি দিয়ে কোনো মানুষ চলাচল করে না। কারণ, এর ভেতর দিয়ে কোনো ট্রেন বা গাড়ি চলে না। আসলে এ অন্ধকার টানেলের ভেতর দিয়ে দিনরাত অনবরত বয়ে চলে কোটি কোটি লিটার সুস্বাদু পানি!
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের মাটির অনেক গভীরে, লোকচক্ষুর অন্তরালে লুকিয়ে আছে ১৩৭ কিলোমিটার লম্বা এক বিশাল সুড়ঙ্গ। নাম তার ডেলাওয়্যার অ্যাকুডাক্ট। দৈর্ঘ্যের দিক দিয়ে এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা টানেল।
নিউইয়র্ক শহরের ট্যাপের পানি সারা বিশ্বে বিখ্যাত। এ পানিকে অনেকে বলেন পানির শ্যাম্পেন। কারণ, এই পানি এতটাই স্বচ্ছ, বিশুদ্ধ আর সুস্বাদু যে একে কোনো ফিল্টার বা কেমিক্যাল দিয়ে শোধন করারও দরকার হয় না। পাহাড়ি ঝরনার মতো পরিষ্কার এ পানি সরাসরি চলে আসে মানুষের বাসায়।
আর এ পানি বয়ে আনার গুরুদায়িত্ব পালন করে ডেলাওয়্যার অ্যাকুডাক্ট টানেল। টানেলটি চারটি বিশাল জলাধার থেকে পানি সংগ্রহ করে। সেগুলো হলো রন্ডাউট, ক্যাননসভিল, নেভারসিঙ্ক ও পেপ্যাকটন। সেখান থেকে এঁকেবেঁকে হাডসন নদীর নিচ দিয়ে গিয়ে শেষ হয় ইয়ঙ্কার্সের হিলভিউ জলাধারে। প্রতিদিন নিউইয়র্ক শহরের প্রায় ৮৫ লাখ মানুষের তৃষ্ণা মেটায় এই সুড়ঙ্গ। শহরের মোট পানির অর্ধেক আসে এই টানেল ধরে।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো মাটির নিচের এই বিশাল স্থাপনা কিন্তু আজকের তৈরি নয়। এটি বানানো হয়েছিল ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকে। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন চলছে, তখন মাটির নিচে এ মহাযজ্ঞ চলছিল।
টানেলটি গোলাকার এবং এর ব্যাস প্রায় ৪ দশমিক ১ থেকে ৫ দশমিক ৯ মিটার। অর্থাৎ এর ভেতর দিয়ে অনায়াসেই একটি দোতলা বাস চলে যেতে পারবে। তখনকার দিনে এখনকার মতো এত আধুনিক টানেল বোরিং মেশিন ছিল না। কাজটা ছিল ভীষণ কঠিন। ইঞ্জিনিয়াররা মাটির ওপর থেকে ৩১টি গভীর গর্ত খুঁড়ে নিচে নেমেছিলেন। এই গর্তগুলো লিফটের মতো কাজ করত। এর সাহায্যেই শ্রমিকদের ও যন্ত্রপাতি নিচে নামানো হতো। এরপর মাটির নিচে কঠিন পাথর বা বেডরক ডিনামাইট দিয়ে ফাটিয়ে ও ড্রিল করে তৈরি করা হতো পথ। পরে কংক্রিট দিয়ে প্লাস্টার করে তৈরি হতো এ বিশাল পাইপলাইন।
যেহেতু তখন বিশ্বযুদ্ধ চলছিল, তাই এই টানেলকে বোমাপ্রুফ করে বানানো হয়। মানে এই টানেলে বোমা মারলেও যাতে কিছু না হয়, সেভাবেই নকশা করা হয়েছিল। আসলে যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল, শত্রুপক্ষ যেন শহরের পানি সরবরাহ বন্ধ করতে না পারে।
শ্রমিকেরাও এই প্রজেক্টে বিশেষ সুবিধা পেয়েছিলেন। সেকালের বড় বড় প্রজেক্টে শ্রমিকদের জন্য সাধারণত আলাদা ক্যাম্প করা হতো। সেই ক্যাম্পে তাঁরা গাদাগাদি করে থাকতেন নির্দিষ্ট কোনো জায়গায়। কিন্তু ডেলাওয়্যার অ্যাকুডাক্ট ছিল ব্যতিক্রম। এখানে শ্রমিকেরা ক্যাম্পে থাকতেন না। তাঁরা আশপাশের শহরে নিজেরা বাসা ভাড়া করে থাকতেন এবং গাড়িতে করে অফিস করার মতো কাজে আসতেন। এটি ছিল ওই সময়ের যুক্তরাষ্ট্রের বদলে যাওয়া সামাজিক ব্যবস্থার এক অনন্য উদাহরণ।
তবে এত বছর ধরে সেবা দিতে দিতে টানেলটি এখন কিছুটা ক্লান্ত! নব্বইয়ের দশক থেকেই এটি লিক করছে। শুনলে বিশ্বাস হবে না, প্রতিদিন প্রায় ৩ দশমিক ৫ কোটি গ্যালন পানি এই লিক দিয়ে বেরিয়ে মাটির নিচে হারিয়ে যাচ্ছে!
নিউইয়র্ক পরিবেশ রক্ষা দপ্তর এই লিক মেরামতের জন্য ১০০ কোটি ডলারের (প্রায় হাজার কোটি টাকা) বিশাল প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। কিন্তু চাইলেই তো আর পানি বন্ধ করে মেরামত করা যায় না। কারণ, তাতে পুরো শহর অচল হয়ে যাবে!
তাই তারা বুদ্ধি করে মাটির নিচ দিয়ে আরেকটি নতুন বাইপাস টানেল বানিয়েছে। সেটির কাজ শেষ হয়েছে ২০১৯ সালে। এখন পরিকল্পনা হলো মূল টানেলের পানিপ্রবাহ বন্ধ করে ওই বাইপাস দিয়ে পানি পৌঁছানো হবে এবং সেই ফাঁকে মূল টানেলটি মেরামত করা হবে। তবে এ কাজ শেষ হতে ২০২৭ সাল বা তার বেশি সময় লাগতে পারে।
যখন মেরামতের জন্য এই টানেল সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে, তখন নিউইয়র্কবাসী হয়তো তাঁদের প্রিয় পানির স্বাদে একটু হেরফের পাবেন। কারণ, তখন অন্য উৎস থেকে পানি মেশানো হবে। তবে কর্তৃপক্ষ কথা দিয়েছে, স্বাদ একটু বদলালেও পানি নিরাপদই থাকবে।
সূত্র: আইএফএল সায়েন্স