কিছু মানুষ কেন ফেক নিউজ বিশ্বাস করে, শেয়ার করে

সত্য যাচাই করেও কেন থামানো যাচ্ছে না ভুয়া খবরের দাপট? কীভাবে ভুয়া খবর আমাদের স্বাভাবিক চিন্তার জগৎকে বদলে দিচ্ছে? এর থেকে বাঁচার উপায় কী?

একটা খবর মিথ্যা হলেও যদি সেটা তোমার মনের ভয়, রাগ বা ঘৃণাকে উসকে দিতে পারেমিডজার্নি

ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে স্ক্রল করছো। হঠাৎ এমন একটা খবর চোখের সামনে এল, যা দেখে রাগে তোমার গা জ্বলে গেল কিংবা ভয়ে বুকটা ধক করে উঠল। সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই শেয়ার বাটন টিপে দিলে।

কিন্তু কেন আমরা এমনটা করি? কেন একটা ডাহা মিথ্যা খবরকে আমরা অবলীলায় সত্য বলে মেনে নিই? অনেকে ভাবেন, মানুষ বুঝি বোকা, তাই যা দেখে তা-ই বিশ্বাস করে। অথবা আমাদের কনফার্মেশন বায়াস আছে। জটিল এই শব্দটার মানে, আমরা যা বিশ্বাস করতে চাই, সেই রকমের খবর পেলেই লুফে নিই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক বলছেন, ব্যাপারটা আসলে আরও গভীর।

সম্প্রতি গবেষকেরা কোভিডের সময়ের ১০ হাজারের বেশি টুইট বিশ্লেষণ করে এক অদ্ভুত মডেল দাঁড় করিয়েছেন। তাঁদের গবেষণা বলছে, আমরা খবরের সত্যতা দেখি না, আমরা খুঁজি আবেগ।

আরও পড়ুন

আমরা সাধারণত ট্যাবলয়েড বা চটুল পত্রিকা পড়ি বিনোদনের জন্য। ওটা যে গালগল্প, তা আমরা জানি এবং পড়ে মজাও পাই। এখানে চটুল পত্রিকা বলতে এমন সংবাদপত্র বা সাময়িকীকে বোঝাচ্ছি, যারা খবর পরিবেশন করে একটু নাটকীয় ভঙ্গিতে। তথ্যের চেয়ে উত্তেজনা বেশি গুরুত্ব পায়। পাঠক যেন একনজরে থমকে যায়, এইটাই আসল লক্ষ্য। কিন্তু ভুয়া খবর ব্যাপারটা আলাদা। মানুষ ভুয়া খবরকে বিনোদন মনে করে না, বরং দরকারি তথ্য মনে করে। বিশেষ করে যখন চারপাশটা অনিশ্চয়তায় ভরা থাকে, তখন মানুষ খড়কুটো ধরে বাঁচতে চায়। ভুয়া খবরগুলো আমাদের সেই অনিশ্চিত মনের আবেগী ক্ষুধা মেটায়।

সহজ কথায়, একটা খবর মিথ্যা হলেও যদি সেটা তোমার মনের ভয়, রাগ বা ঘৃণাকে উসকে দিতে পারে, তবে তোমার মস্তিষ্ক সেটাকে সত্য বলে ধরে নিতে চায়। সত্যের চেয়ে তখন আবেগটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়। গবেষকেরা দেখেছেন, মানুষ কোনো খবর শেয়ার করবে কি না, তা বিচার করে মূলত তিনটি জিনিসের ওপর ভিত্তি করে। এক, খবরটা কতটা সত্য; দুই, খবরটা কেমন অনুভূতি দিচ্ছে; তিন, খবরটা আমার জীবনের সঙ্গে কতটা মিলছে।

আরও পড়ুন

মজার ও ভয়ের ব্যাপার হলো, কোনো খবরে যদি ভয়ংকর নেতিবাচক আবেগ থাকে এবং সেটা যদি তোমার পরিস্থিতির সঙ্গে মিলে যায়, তখন খবরটা মিথ্যা হলেও তুমি সেটা বিশ্বাস করবে। গবেষকেরা দেখেছেন, যুক্তির চেয়ে এখানে আবেগের জোর অনেক বেশি। ভুয়া খবরগুলো তোমাকে মানসিক সাপোর্ট দেয়, সেটা ভুল সাপোর্ট হলেও!

গবেষকেরা এখানে ওভারটন উইন্ডো নামে একটি পলিটিক্যাল সায়েন্সের থিওরি ব্যবহার করেছেন। সহজ করে বললে, এটা হলো একটা জানালা। সমাজের মানুষ নির্দিষ্ট সময়ে যে ধরনের চিন্তাভাবনাকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য মনে করে, সেটাই এই জানালার সীমানা।

ভুয়া খবরগুলো খুব কায়দা করে এই জানালার সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়ে। অথবা একটু একটু করে এই সীমানাটাকে ঠেলে বড় করে দেয়। ফলে আজ যে কথাটা তোমার কাছে অসম্ভব মনে হচ্ছে, ভুয়া খবরের পাল্লায় পড়ে কদিন পর সেটাই তোমার কাছে স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করবে।

তাহলে এর থেকে বাঁচার উপায় কী? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের যুগে ভুয়া খবর এখন বন্যার মতো ধেয়ে আসছে। শুধু সত্য যাচাই করে একে ঠেকানো যাবে না। গবেষকেরা বলছেন, আমাদের বুঝতে হবে কখন কোনো খবর আমাদের আবেগ নিয়ে খেলা করছে।

ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে কিন্ডারগার্টেন থেকেই শিশুদের মিডিয়া লিটারেসি বা সংবাদ বোঝার শিক্ষা দেওয়া হয়। আমাদেরও এখন শেখার সময় এসেছে। কোনো খবর দেখে হুট করে রেগে বা ভয় না পেয়ে, আগে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, ‘এই খবরটা কি আসলেই সত্য, নাকি এটা আমার আবেগকে ম্যানিপুলেট করছে?’

কারণ, দিন শেষে ভুয়া খবর শুধু তোমাকেই বোকা বানাচ্ছে না, পুরো সমাজের চিন্তাধারাকেই বদলে দিচ্ছে।

সূত্র: জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি ও ফিউচারিটি ডটকম

আরও পড়ুন