কাজী শাহনূর হোসেনের গল্প—অন্য ভুবন

প্রথম পর্ব

অলংকরণ: এস এম রাকিব

অদ্ভুতুড়ে গল্পটা শুরু করার আগে, আমার পরিচয়টা বরং একটু দিয়ে নিই। আমি পিপন, ১২ বছর বয়সী, সাদামাটা ছেলে। একমাথা কালো চুল আমার, চোখের মণি জোড়াও কালো। দাঁতগুলো সামান্য আঁকাবাঁকা, তবে সেটা তো আমার বয়সী অনেক ছেলেমেয়েরই থাকে, তা–ই না? ঢাকা শহরের আকাশচুম্বী এক অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে থাকি আমি। এত দিন ভেবে এসেছি, আমাদের বাড়িটাও বুঝি আমার মতোই অতি সাধারণ, তারপর তো ঘটল সেই ঘটনা, যেটা এখন বলতে চলেছি।

অস্বীকার করব না, উদ্ভট কাণ্ডকারখানার প্রতি আমার একটা বিশেষ আগ্রহ আছে। যেমন ধরো, নিশুতি রাতে কবর থেকে গুড়ি মেরে বেরিয়ে আসছে মরা মানুষের দল। কিংবা ধরো, কেউ তোমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে, হঠাৎ দেখলে তার মাথাটা ফেটে চৌচির হয়ে গেল। আমি অবশ্য এসব দৃশ্য কখনোই দেখিনি। কিন্তু এমন ঘটনা যে আদৌ ঘটবে না, তাই–বা কে বলতে পারে!

যাকগে, ঘটনাটা ঘটেছিল শীতকালে। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। একদম ঝাড়া হাত-পা। বাবা আর আমি পরিকল্পনা করেছি সাভারে যাব আমরা, আবাহনীর ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে। বাবা আবাহনীর গোঁড়া সমর্থক। সে সূত্রে আমিও। বড় ম্যাচ। আর লিগ এবার জমেও উঠেছে দারুণ। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে।

আমার মা মারা গেছে। বাবা ব্যবসা করে আর শখের লেখক। মাঝেমধ্যে নানান পত্রপত্রিকায় তার লেখা ছাপা হয়। সে জন্য বাবা নাকি আবার কিছু সম্মানীও পায়।

শনিবার সকাল নাগাদ রওনা দেওয়ার কথা আমাদের। আমি এতটাই উত্তেজিত ছিলাম যে সকাল ছটায় জেগে গেলাম। চোখ মেলতেই একটা ব্যাপার মনে পড়ল। শুতে যাওয়ার আগে রিটেইনারটা পরতে ভুলে গেছিলাম। জিনিসটা আছে কোথায়?

আরও পড়ুন

রিটেইনার হচ্ছে ব্রেস, রাতে যেটা পরতে হয় আরকি। রিটেইনার পরতে মোটেও ভালো লাগে না আমার। জিনিসটা তার আর গোলাপি প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি। বিশ্রী দেখতে, বিশেষ করে তুমি যখন দুপুরে খাবার টেবিলে ওটা খুলে রাখো, তখন আরও জঘন্য দেখায়।

আমি যখনই রিটেইনার হারাই, বাবা গম্ভীর হয়ে যায়। জিনিসটা বেশ দামি, তবে আমি কখনোই দামটা মনে রাখতে পারি না ছাই!

একবার জিনসের পকেটে রিটেইনার রেখেছিলাম। লন্ড্রি থেকে যখন ফিরল প্যান্টটা, দেখি গলে গেছে ওটা পকেটের ভেতর। একটা পড়ে গিয়েছিল আমার দিদার বাতিল কাগজের ঝুড়িতে। আরেকটা কীভাবে যেন ভুলে টয়লেটে ফ্লাশ করে ফেলেছিলাম। আরও একটার ব্যাপারে আমি প্রায় নিশ্চিত, আমি যখন ঘরে ছিলাম না, তখন ডাকাত এসে নির্ঘাত ওটা চুরি করে নিয়ে গেছে, অবশ্য আমি যদিও কখনোই তা প্রমাণ করতে পারিনি।

যা-ই হোক, আধডজনের বেশি ও জিনিস হারাইনি আমি। বড়জোর সাতটা হতে পারে।

আমি জানি, বাথরুমে মেডিসিন ক্যাবিনেটে রিটেইনারটা আছে। থাকার কথা ছিল যদিও আমার মুখের ভেতর। যাকগে, বিছানা ছেড়ে, মেডিসিন ক্যাবিনেটের দরজা খুললাম। হ্যাঁ! আছে। কিন্তু আমি যেই না ক্যাবিনেটের দরজাটা লাগাতে যাব, অমনি অদ্ভুত এক কাণ্ড ঘটল। ভারী আজব কাণ্ড। মেডিসিন ক্যাবিনেটের পেছন দিকটা খুলে গেল। আর একটা ছেলে, যে কিনা হুবহু আমারই মতো দেখতে, ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল আমার মুখের দিকে!

দুই

অবিকল আমার মতো দেখতে একটা ছেলে? তা কীভাবে হয়? ঘটনার আকস্মিকতায় এতটাই চমকে গেছি যে রিটেইনারটা ছিটকে পড়ে গেল। আর পড়বি তো পড়, সোজা ওই ছেলের বাথরুমে। এবার আমরা দুজনই তারস্বরে চিৎকার ছেড়ে, আমাদের মেডিসিন ক্যাবিনেটের দরজা দুটো লাগিয়ে দিলাম।

কী ঘটছে এসব?

একটু পরে, ধীরে ধীরে আবারও খুললাম ক্যাবিনেটটা। নাহ্। ওপাশে কেউ নেই। পেছন দিকে চাপ দিলাম। খুলল না ওটা। আজব তো!

তাহলে আমার রিটেইনারটা গেল কোথায়? পাশের অ্যাপার্টমেন্টে খোঁজ নিয়ে দেখি তো। মাজেদা বেগম নামের এক বৃদ্ধা থাকেন ওখানে।

ভদ্রমহিলা একটু ছিটগ্রস্ত। আমার ঘরের দেয়ালে বাস্কেটবল হুপ বসিয়েছি, সে জন্য তাঁর মেলা আপত্তি। বাবাকে এ নিয়ে বেশ কয়েকবার নালিশও করা হয়ে গেছে। আমি স্ল্যাম-ডাঙ্ক করলে তাঁর নাকি মনে হয়, বাড়িতে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে। বোঝো!

তবে মাজেদা বেগমের হয়তো কোনো নাতিপুতি আছে। সে হয়তো দেখতে অনেকটা আমারই মতন। হয়তো তার মেডিসিন ক্যাবিনেটটি আমাদেরটার ঠিক উল্টো পাশেই বসানো।

আমি অবশ্য জানি, এই ব্যাখ্যা খাটে না। কিন্তু অন্য আর কোনো কিছু তো মাথায়ও আসছে না!

বাইরে যাওয়ার পোশাক পরে নিলাম। এবার আলগোছে আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে এলাম। মাজেদা বেগমের দরজায় টোকা দিলাম। সাড়া নেই। আবারও টোকা দিলাম। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে গেল। মাজেদা বেগম দাঁড়িয়ে। তাঁর পরনে শাড়ি আর পায়ে চটি। মাথার চুল উষ্কখুষ্ক। চোখ কচলাচ্ছেন। যদি সত্যিটা জানতে চাও তো বলি, আমাকে দেখে তিনি মোটেও খুশি হননি।

‘সরি, আপনাকে বিরক্ত করলাম,’ বললাম। ‘আপনার বাথরুম থেকে আমার রিটেইনারটা নিয়ে যেতে পারি?’

‘তোমার কী বাবু?’ বললেন তিনি।

ছোটদের সবাইকে তিনি ‘বাবু’ বলেন। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পারো, এটি মোটেও তাঁর মনের কথা নয়।

‘আমার রিটেইনার,’ বললাম।

‘জিনিসটা কী, বাবু?’

‘রিটেইনার হচ্ছে তার আর গোলাপি প্লাস্টিকে তৈরি ব্রেস। জিনিসটা মাঝেমধ্যেই এখানে-সেখানে পড়ে যায়,’ ব্যাখ্যা করলাম। ‘আমারটা পড়েছে আপনার অ্যাপার্টমেন্টে, আপনার নাতি যখন মেডিসিন ক্যাবিনেটটা খুলেছিল আরকি।’

মাজেদা বেগমের চোখের দৃষ্টি দেখে মনে হলো, আমি যেন কোনো ভিনগ্রহী জীব।

‘আমার নাতি?! আমার তো কোনো নাতি নেই, বাবু,’ বললেন তিনি।

‘নাতি নেই? তাহলে একটু আগে কে আমার মেডিসিন ক্যাবিনেটের ওপাশটা খুলেছিল?’

মাজেদা বেগমের চেহারার নিচের অংশটি মৃদু হাসল। তবে ওপরের অর্ধেকখানি ভ্রু কুঁচকে রেখেছেন। দেখে মনে হলো, দুটো অংশ পরস্পরের বিরুদ্ধে ধুন্ধুমার লড়াই করছে। এ সময় আমার পায়ের পাতার ওপর দরজাটা লাগানোর পাঁয়তারা করলেন তিনি।

‘দরজা লাগাবেন না, প্লিজ,’ মিনতি করে বললাম। ‘আমার রিটেইনারটা আপনার অ্যাপার্টমেন্টে পড়ে গেছে। এটা নিয়ে এখন পর্যন্ত অমন সাতটা হারিয়েছি আমি। আটটাও হতে পারে। ওটা ফেরত না পেলে বাবা আমাকে খুনই করে ফেলবে। আপনি কি তা চান?’

তিনি দরজা মেলে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন।

‘তুমি কী চাও?’ বললেন। আমার কানে কথা নয়, যেন সাপের হিসহিসানির মতো শোনাল শব্দগুলো। আর খেয়াল করলাম, এবার তিনি ‘বাবু’ বলতেও ভুলে গেছেন।

‘শুধু আমার রিটেইনারটা,’ বললাম। ‘ওই ছেলেটা, যে আপনার নাতি নয়, তাকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন, ওটা আমার মেডিসিন ক্যাবিনেট থেকে আপনার বাথরুমে পড়েছে। আমাকে প্লিজ, একটু খুঁজে দেখতে দিন।’

‘তোমাকে দেখতে দিলে,’ বললেন তিনি ঘুমজড়ানো কণ্ঠে, ‘তুমি চলে যাবে তো? আর আমাকে একটু শান্তিতে ঘুমোতে দেবে?’

‘এক শ বার,’ বললাম।

গভীর শ্বাস টানলেন তিনি। তারপর হাতের ইশারায় তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতে বললেন।

ঢুকলাম।

আরও পড়ুন

আশ্চর্য ব্যাপার! যেদিকেই তাকাই, শুধুই স্টাফ করা জন্তু-জানোয়ার। আদুরে টেডি বিয়ার নয়। সবই কোনো ট্যাক্সিডার্মিস্টের স্টাফ করা সত্যিকারের জীবজন্তুর মৃতদেহ। কাঠবিড়ালি, খরগোশ, বেজি, ইঁদুর। কিম্ভুত ভঙ্গিমায় জমে শক্ত হয়ে রয়েছে ওরা। কাচের কুতকুতে চোখ মেলে দেখছে আমাকে। সারা শরীর শিউরে উঠল।

তড়িঘড়ি বাথরুমে ঢুকে চারপাশে চোখ বোলালাম। নাহ্, মেঝেতে কিংবা কোথাওই কোনো রিটেইনার পড়ে নেই। মেডিসিন ক্যাবিনেটটা খুললাম। পেছন দিকটায় চাপ দিলাম। এতটুকু নড়ল না। অগত্যা মেডিসিন ক্যাবিনেটের দরজাটা লাগিয়ে দিতে বাধ্য হলাম।

‘হয়েছে?’ হিসিয়ে উঠলেন ভদ্রমহিলা।

হঠাৎই কেন জানি মনে হলো, এখনই যদি এখান থেকে চলে না যাই, তাহলে তাঁর চোখ জোড়া অঙ্গারের মতো লাল হয়ে উঠবে। তারপর তিনি আমাকে ক্যাঁক করে চেপে ধরে স্টাফ করার অপচেষ্টা করবেন। আমাকে তখন অন্য জন্তুগুলোর পাশে উদ্ভট, জমাটবাঁধা শক্ত ভঙ্গিতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে আর অতিথিদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে কাচের চোখ মেলে।

ভাবতেই হিমধারা নেমে গেল আমার শিরদাঁড়া বেয়ে। মন বলছে, পালাও, পালাও!

তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে রীতিমতো পালিয়ে বাঁচলাম। ফিরে এলাম নিজেদের অ্যাপার্টমেন্টে। ঘটনার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝলাম না। আচ্ছা, পুরোটাই কোনো স্বপ্ন নয় তো? কিন্তু স্বপ্নই যদি হবে, তবে আমার রিটেইনারটা গেল কই?

শোবার ঘরে ফেরার পথে, আমার বাথরুমটির পাশ কাটালাম। মনে হলো চোখের কোণে কিছু একটা নড়তে দেখেছি।

আমার মেডিসিন ক্যাবিনেটের দরজা।

ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে ওটা!

হায়, খোদা!

তিন

ঊর্ধ্বশ্বাসে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলাম। হ্যাঁচকা টানে পুরোটা খুলে ফেললাম মেডিসিন ক্যাবিনেটটা।

ওই তো! আগেরবার দেখা সেই ছেলে!

‘অ্যাই!’ বললাম।

এবার আর দড়াম করে দরজা লাগাল না। বোধ হয় মারাত্মক ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেছে। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। আমিও অপলক দেখছি ওকে। দেখতে প্রায় আমারই মতো ছেলেটা। শুধু দাঁতগুলো আরও বেশি কিরিমিরি।

আরও পড়ুন

‘কে তুমি?’ প্রশ্ন ছুড়লাম।

‘দীপন,’ বলল ও।

‘আমি পিপন।’

‘জানি।’

‘তুমি তো পাশের বাসায় থাকো না,’ বললাম। ‘থাকো?’

মাথা নাড়ল ছেলেটা।

‘তাহলে কোথায় থাকো?’

‘অন্য কোথাও। বলতে পারো কাছেপিঠেই, আবার অনেক দূরে। শুনলে তুমি অবাক হয়ে যাবে।’

‘কোথায়? গাজীপুর? মানিকগঞ্জ? নারায়ণগঞ্জ? মুন্সিগঞ্জ?’

আবারও মাথা নাড়ল ও।

‘তাহলে কোথায়?’

‘তুমি কখনো আঢাকার নাম শুনেছ?’ বলল ছেলেটি।

‘সেটা আবার কী? জলঢাকা নামে একটা জায়গার নাম অবশ্য জানি।’

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখ ঘোরাল ও, ভাবখানা এমন যেন এ রকম বুদ্ধুমার্কা কথাবার্তা জীবনেও শোনেনি।

হঠাৎই একটা চিন্তা ঘাঁই মারল আমার মাথায়।

‘আচ্ছা,’ বললাম, ‘ব্যাপারটা কি এতটাই অদ্ভুত যে পরে এতে জড়িয়ে পড়ায় আফসোস করব আমি?’

‘আমার হাতে আর মাত্র একটা প্রশ্ন শোনার মতো সময় আছে,’ জানাল ও। ‘তারপর আমার চলে যেতে হবে।’

‘ওকে! ওকে,’ বললাম। ‘আমার রিটেইনারটা কি তোমার কাছে? ওটা মনে হয় তোমার ওপাশটায় পড়ে গেছে।’

আচমকাই সজোরে দরজাটা লাগানোর চেষ্টা করল ও। কিন্তু আমি তার চেয়ে দ্রুততার সঙ্গে বাধা দিলাম। একটা বাহু ঢুকিয়ে দিয়েছি মেডিসিন ক্যাবিনেটে। ফলে ও আর ওটা লাগাতে পারল না। আমার হাতটা পাকড়ে ধরে দরজা থেকে ঠেলে সরাতে আপ্রাণ চেষ্টা করল ছেলেটা। আমিও খপ করে ওর কবজি চেপে ধরলাম।

‘ছাড়ো! ছাড়ো!’ চেঁচিয়ে উঠল ও।

‘আগে আমার রিটেইনারটা ফেরত দাও!’

ঝটকা দিয়ে ছাড়া পেতে চাইল ও। আমিও সাঁড়াশির মতো চেপে ধরে রয়েছি। ও পিছিয়ে গেল। আমি দুহাতে ওকে আঁকড়ে ধরে ঝুলে পড়লাম। ও আমাকে মেডিসিন ক্যাবিনেটের ভেতর দিয়ে টেনে নিল। এবার দুজনই আমরা ধপাস করে পড়লাম ওর বাথরুমের মেঝেতে।

‘কী করলে এটা?!’ গর্জাল ও। ‘করলেটা কী?!’ ভয়ানক আতঙ্কিত দেখাচ্ছে ছেলেটিকে।

‘কী করেছি?’ অবাক কণ্ঠে শুধালাম।

‘যেটা কখনোই কারও করা উচিত নয়,’ বলল ও।

‘কী সেটা?’ আমার প্রশ্ন।

‘প্যারালাল ইউনিভার্সে চলে আসা!’

চলবে...
আরও পড়ুন