বাবেলের কুকুর
জাকির হোসেন রোডে একবার একটা মার্ডার হলো।
আমি ‘মার্ডার’ বললাম, কারণ বাংলায় হত্যাকাণ্ড বললে রহস্যের ব্যাপারটা ঠিকমতো আসে না। ‘হত্যাকাণ্ড’ শুনলে মনে হয় সেটা কেবলই এক নৃশংস ঘটনা। সহিংসতায় শুরু, সেখানেই শেষ। এমনকি ‘খুন’ বললেও একটা ধারালো ছুরির ছবি ভেসে ওঠে মাত্র। এর বেশি কিছু না। কিন্তু ‘মার্ডার’ বললে বন্ধ ঘরে পড়ে থাকা একটা মৃতদেহ আর তার চারপাশে ঘরময় অজানা হত্যাকারীর রেখে যাওয়া নানান ইশারার ছবি ভাসে। আর ভাসে একটা চিকন এবং লম্বা চেহারার লোকের ছবি, যিনি সেসব ইশারা কুড়িয়ে কুড়িয়ে হত্যাকারীকে নিশানা করার চেষ্টা করছেন।
জাকির হোসেন রোডের তৃতীয় লেনের শেষ মাথায় মল্লিকদের বাড়ির দুই বাড়ি আগে তালুকদারদের ছয়তলা বিল্ডিংয়ের পঞ্চম তলায় মার্ডার হলেন ষাটোর্ধ্ব মোহনদাস চক্রবর্তী। ২৭ এপ্রিল সকালে নিজ ভাড়া বাসার বন্ধ ঘরে তাঁর লাশ পাওয়া গেল। বুকে একটা ছুরি বসানো।
জাকির হোসেন রোডের ৭০ বছরের ইতিহাসে এটাই প্রথম ও শেষ মার্ডার।
তবে শুরুতে এর মধ্যে রহস্য তেমন ছিল না। অপরাধী অনায়াসে ধরা পড়েছিল। রহস্য বেরিয়ে আসে কিছুদিন পরে।
মোহনদাস চক্রবর্তীর বাসা ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগানো ছিল না। থাকলে সেটা একটা জটিল মার্ডার মিস্ট্রির চেহারা নিত। বাসা বাইরে থেকে তালা মারা পাওয়া গেল। অর্থাৎ যিনি বা যাঁরা হত্যা করেছেন, তাঁরা যাওয়ার সময় বাইরে থেকে তালা মেরে দিয়ে গেছেন, বেরসিকের মতো।
এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার তরুণ এসআই ফিরোজ আহমেদ এসে প্রথমেই বের করলেন কে এই তালার মালিক। দেখা গেল, তালা মোহনদাসের নিজের। তার মানে বাড়ির লোকেরাই কেউ খুনটা করেছে।
মোহনদাস বিয়ে করেননি। একা থাকতেন। বাড়ির লোক বলতে মাঝে মাঝে তাঁর এক দূরসম্পর্কের বোনের ছেলে এসে থাকত। নাম বিজন চন্দ্র চক্রবর্তী।
চার দিন পর শহরের আরেক প্রান্তে বংশাল এলাকার এক চিপা হোটেল থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করল। তার কাছ থেকে উদ্ধার হলো সাড়ে তিন লাখ টাকা, যেটা মার্ডারের আগের দিন ব্যাংক থেকে তুলেছিলেন মোহনদাস। নিজের পেনশনের টাকা এককালীন তুলে নিয়েছিলেন তিনি। এই টাকাটা হাতিয়ে নেওয়ার জন্যই মামাকে খুন করেছে বিজন। আগের রাতে সে এসে উঠেছিল মোহনদাসের বাসায়। মামা-ভাগনে একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়েছে। তারপর বিজন তার মামাকে খুন করে আলমারি থেকে টাকা বের করে রাতেই বাসায় তালা মেরে চলে গেছে। কেউ দেখেনি। আর সে আমলে সিসিটিভি ক্যামেরাও চালু হয়নি।
বিজন দাবি করল সে নির্দোষ। মামা তাকে দেওয়ার জন্যই টাকাটা তুলেছিলেন। নিজ হাতে তাঁকে সেই টাকা দিয়েছেন তিনি। ব্যবসা করার জন্য।
এসআই ফিরোজ বললেন, পাকা খুনিরা অপরাধ স্বীকার করতে রাজি হয় না। সঠিক কায়দায় জেরা করতে পারলে একসময় সবই স্বীকার করবে।
জাকির হোসেন রোডে এই একটাই মার্ডার। আর দ্রুতগতিতে সেটা সমাধান হয়ে গেল। মহল্লায় রীতিমতো হিরোর খ্যাতি পেয়ে গেলেন এসআই ফিরোজ। তিনি জাকির হোসেন রোডেই ভাড়া থাকতেন শিপ্রাদের বাসায়।
বিজন ধরা পড়ার ১৫ দিন পর একদিন বিকেলে মহল্লার আরেক প্রৌঢ় আলমগীর কবির বাবেল গিয়ে হাজির হলেন মোহাম্মদপুর থানায়। সেদিন থানায় খুব ঝামেলা চলছিল। জাফরাবাদে একটা নির্মাণাধীন মার্কেটের মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়েছে কয়েক দফা। তা সামাল দিতে থানা–পুলিশ হিমশিম খাচ্ছে। ম্যারাথন সালিস বসেছে থানার ভেতরে। গিজগিজ করা লোকজন। এর মধ্যে আলমগীর কবির এসে এসআই ফিরোজের কক্ষে ঢুকে বললেন, তাঁর অত্যন্ত জরুরি কথা আছে এসআই ফিরোজের সঙ্গে। কথাটা তিনি একান্তে বলতে চান।
দরজা লাগিয়ে দেওয়া হলো। তদন্ত কর্মকর্তাকে আলমগীর কবির কী বলেছিলেন, তা কেউ শুনতে পায়নি। তবে পরে বড়দের কাছে আমরা শুনেছি, তিনি নাকি মোহনদাস চক্রবর্তী মার্ডার কেস নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলেন। নিজ উদ্যোগে নিজের মতো করে এ ঘটনা তদন্ত করেছেন তিনি। সেই তদন্তের ফল জানাতে গেছেন এসআই ফিরোজকে। যেহেতু উনিই তখনো এই মামলার তদন্তের দায়িত্বে। আমরা শুনেছি, আলমগীর কবির দাবি করেছেন, সম্পূর্ণ ভুল একটা লোককে ধরেছে পুলিশ। ভাগনে বিজন চন্দ্র হত্যাকারী নয়। হত্যা করেছে ভিন্ন এক ব্যক্তি। এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত।
এই সবই আমরা পরে শুনেছি মহল্লার বড়দের কাছ থেকে। আর বড়দের বলেছেন এসআই ফিরোজ।
আমরা ছোটরা শুনেছি এসআই ফিরোজ ওই দিন খুব ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও ঠান্ডা মাথায় মনোযোগ দিয়ে আলমগীর কবিরের কথা শুনেছেন এবং বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করেছেন, তাহলে সেই আসল খুনিটি কে?
আলমগীর কবির বলেছেন, খুনির নাম-পরিচয় তিনি তখনই বলতে না পারলেও চেহারার কিছু বিবরণ দিতে পারবেন।
যেমন?
যেমন, লোকটা মহল্লার ব্যাংকার মনিমুল হকের চেয়ে মোটা, কিন্তু শাহেদ সাহেবের চেয়ে চিকন। মহসীন সাহেবের চেয়ে সামান্য লম্বা, কিন্তু মাংসের দোকানদার কুরবান আলীর চেয়ে খাটো।
এটা শুনে এসআই ফিরোজ হেসে ফেলেননি। সিরিয়াস ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করেছেন, এত কিছু তিনি জানলেন কীভাবে?
আলমগীর কবির আরেকটা অদ্ভুত কথা শুনিয়েছেন আমাকে। তিনি বলেছেন, এভাবে ভাষা শেখা শুরুর অল্প কিছুদিনের মধ্যে মহল্লার কুকুরগুলো নাকি টের পেয়ে যায় তিনি ওদের ভাষা বুঝতে শুরু করেছেন।
তখন আলমগীর কবির যে জবাব দিয়েছেন, সেটার জন্য এসআই ফিরোজ মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি বলেছেন, তিনি এই সবকিছু জানতে পেরেছেন মহল্লার কুকুরগুলোর কাছ থেকে। হত্যাকাণ্ডের পর থেকে কুকুরেরা নিজেদের মধ্যে এগুলোই বলাবলি করছে। তাদের কথা ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ তারা, মানে কুকুরেরা, ওই রাতে সবকিছু দেখেছে।
এ কথা শুনে, এসআই ফিরোজ নাকি স্তম্ভিত হয়ে বসে ছিলেন। তবে তিনি যদি জাকির হোসেন রোডের নতুন বাসিন্দা না হতেন, তাহলে হয়তো এতটা ভ্যাবাচেকা তাঁকে খেতে হতো না।
আমরা মহল্লাবাসী ছেলেবুড়ো সবাই জানি, আলমগীর কবির বাবেল কুকুরের ভাষা বুঝতে পারেন। অন্তত সে রকমই তিনি দাবি করেন। এই ভাষা তিনি শিখেছেন কয়েক বছরের নিবিড় অধ্যবসায়ে। তাঁর এ দাবি মহল্লার আর কেউ আমলে নেয় কি না আমার জানা নেই। তবে আমি নিই। তিনটি কারণে। প্রথমত, আলমগীর কবির বাবেলের কোনো পাগলামি রোগ নেই। কুকুরের ভাষা বুঝতে পারা ব্যতীত তাঁর স্বভাব-চরিত্রে কোনো তারল্যদোষ কেউ দেখেনি। তিনি যুক্তিবাদী মানুষ। দ্বিতীয়ত, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্বের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং তাঁকে অনায়াসে বহু ভাষাবিদ বলা চলে। বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দির বাইরে তিনি এশিয়ার আরও চারটি এবং ইউরোপের তিনটি ভাষা জানেন, লিখতে এবং বলতে পারেন। অর্থাৎ, মোটেই যেনতেন লোক তিনি নন। আর তৃতীয়ত, তিনি নিজে আমাকে পুরো বিষয়টি যেভাবে বুঝিয়ে বলেছেন, আমি ফেলে দিতে পারিনি।
আলমগীর কবিরের কুকুরের ভাষা শেখার একটা ইতিহাস আছে।
সাত বছর আগে তিনি যখন এ মহল্লায় আসেন, তখন তাঁর রাতে ঘুমানো কঠিন হয়ে গিয়েছিল। কুকুরের ডাকে। বিশেষ করে তিনি যে গলিতে বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন, মাংসের দোকানের গলি, সেখানটায় কুকুরের রীতিমতো কলোনি। সম্ভবত, মাংসের উচ্ছিষ্টের কারণে সেই গলির দখল প্রতিষ্ঠা নিয়ে কুকুরদের মধ্যে ঝগড়া-কাজিয়া লেগে থাকত। আর তাদের বড় জটলাটা বসত অধ্যাপকের ঠিক জানালার নিচে। রাত ১২টার দিকে শুরু হতো। দফায় দফায় রাত দুইটা-তিনটা পর্যন্ত চলত কখনো ঝগড়া, কখনো কনফারেন্স। কনফারেন্স মানে কুকুরদের সালিস বৈঠক।
ঘুম ভেঙে গেলেও বিরক্ত না হয়ে আলমগীর কবির মনোযোগ দিয়ে কুকুরের কাজিয়া শুনতেন। ধীরে ধীরে তিনি লক্ষ করেন, কুকুরের ডাকের মধ্যে নানা রকম প্যাটার্ন আছে, স্বরের উত্থান-পতন আছে, আছে ঘাত-অভিঘাত। এসব ডাক এলোমেলো বা যথেচ্ছ নয়। পরে একসময় তিনি জানালার পাল্লা খুলে একটা ভালো শব্দধারক যন্ত্র বসিয়ে কুকুরের ডাক রেকর্ড করতে শুরু করেন। পরদিন সারা দিন সেই সব ডাকের স্বরগ্রাম বিশ্লেষণ করতেন তিনি। পরিবারের লোকেরা বিরক্ত হতো। বাসায় সারা দিন লাউডস্পিকারে কুকুরের ডাকাডাকি আর ঝগড়াঝাঁটি বাজলে কার না ধৈর্যচ্যুতি ঘটে।
বছরখানেকের নিবিড় গবেষণায় আলমগীর কবির যে জিনিসটা তৈরি করতে সক্ষম হলেন, সেটা হলো কুকুরের ভাষার ভোকাবুলারি বা শব্দভান্ডারের তালিকা। মোট ১৪টা ধ্বনিমূল, ৩৫টা ধ্বনি এবং ৭৭টা শব্দ। এটাকে মানুষের ইতিহাসের প্রথম ‘কুকুরের ভাষার অভিধান’ বলা যাবে না মোটেও। বরং ‘কুকুরের ভাষার প্রথম গ্রামার বই’ বললে কিছুটা কাছাকাছি যায়। এটা ঠিক যে আলমগীর কবির বই আকারে কিছু লেখেননি। কারণ, কুকুরের ভাষার ধ্বনিরূপ মানবভাষার কোনো লিপিতে লিপিবদ্ধ করা সম্ভব নয়। সেটা কেবল শুনেই বুঝতে হবে।
‘মানুষের ভাষা আর কুকুরের ভাষা এক নয়’—আমাকে বলেছিলেন আলমগীর কবির, সাত বছর আগে, আমি তাঁর বাসার ড্রয়িংরুম থেকে থেকে বল কুড়িয়ে আনতে গেলে। ‘এক নয় মানে বোঝাতে চাচ্ছি, আমরা যদি বলি যে মানুষের যেমন ভাষা আছে, কুকুরেরও সে রকম ভাষা আছে, তাহলে কথাটা ঠিক হবে না। শব্দ বা ভাষা আমরা যে রকমভাবে ব্যবহার করি, কুকুরেরা সেভাবে ব্যবহার করে না।’
আমি কথাটা ঠিকমতো বুঝতে পারছি না টের পেয়ে তিনি বললেন, ‘কুকুরের ভাষা আছে, কথাটা ভুল। যদি কিছু বলতেই হয়, তাহলে বলতে হবে, কুকুরের পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের একটা সিস্টেম বা ব্যবস্থা আছে আর সেই ব্যবস্থাটা মানুষের ভাষার মতোই জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট।’
এরপর আমার কাছে আলমগীর কবিরের বক্তৃতা জটিল থেকে জটিলতর হতে শুরু করে। তিনি মনোযোগী শ্রোতা পেয়ে পরপর তিন দিন দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে আমাকে তাঁর থিসিস বোঝানোর চেষ্টা করেন। আমি যেটুকু বুঝলাম, তা হলো, আমরা সাধারণভাবে হরেদরে ‘কুকুরের ডাক’ কথাটা ব্যবহার করলেও সেগুলোর যে অনেক রকমফের আছে, তা বাংলার চেয়ে বরং ইংরেজিতে কিছুটা ধরা যায়। যেমন ইংরেজিতে বলে বার্ক (ঘেউ ঘেউ), গ্রাউল (ঘড়ঘড়), হোয়াইন (গরররররর…)। আরও আছে ইয়েলপ বা হাউল। এই রকম আরও ২৯ ধরনের স্বরগ্রাম বা ‘ভোকালাইজেশন’ আছে কুকুরের। এগুলোর প্রতিটির ওঠানামা তো আছেই, সেই সঙ্গে শ্বাসাঘাত, ব্রিদিং প্যাটার্ন, রিদম ইত্যাদির বিন্যাস-সমাবেশ ঘটিয়ে কুকুরেরা অজস্র জটিল ভাব ও তথ্য বিনিময় করতে পারে, প্রায় মানুষের মতোই।
‘আমি কুকুরের ভাষা শেখার চেষ্টা করছি, না বলে তুমি বরং বলতে পারো কুকুরের ভাষার ম্যাপিং করছি।’ বলেন আলমগীর কবির। ‘আমি এখনো সেই মানচিত্র তৈরি করে যাচ্ছি। নতুন নতুন শব্দ যোগ করছি আমার শব্দভান্ডারে। শিখছি এখনো।’
‘আপনি কি ওদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন?’ আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম।
‘না। এই যোগাযোগ একমুখী। কারণ, আমি তো ওদের মতো করে ডাকতে পারব না।’
আলমগীর কবির আরেকটা অদ্ভুত কথা শুনিয়েছেন আমাকে। তিনি বলেছেন, এভাবে ভাষা শেখা শুরুর অল্প কিছুদিনের মধ্যে মহল্লার কুকুরগুলো নাকি টের পেয়ে যায় তিনি ওদের ভাষা বুঝতে শুরু করেছেন। আর এতে করে তাদের মধ্যে যে সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, সেটা মানুষের ক্ষেত্রে যাকে আমরা ‘বিব্রত হওয়া’ বলি, তার কাছাকাছি কিছু।
‘বিব্রত হবে কেন?’ আমি অবাক হয়ে বলি।
‘বিব্রত বলি নাই তো। বললাম, বিব্রত হওয়ার কাছাকাছি কিছু। বিব্রত হওয়ার কুকুরীয় প্যারালাল বলতে পারো,’ বললেন অধ্যাপক।
‘কী রকম?’
‘ওরা আমাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতে শুরু করল। স্পষ্ট বুঝতে পারলাম। আমি কাছে গেলে ওরা নিজেদের মধ্যে কথোপকথন থামিয়ে দেয়। আমি এখন মোটামুটি নিশ্চিত, কুকুরেরা চায় না তাদের কথা মানুষ বুঝুক।’
এ কারণে মোহনদাস চক্রবর্তী মার্ডার কেসের ব্যাপারে তথ্য পেতে আলমগীর কবিরের কিছু বেগ পেতে হয়েছে। তাঁকে রীতিমতো আড়ি পেতে শুনতে হয়েছে কুকুরের কথাবার্তা। এভাবে ছেঁড়া ছেঁড়া আলাপ আর পথের ধারে শোনা টুকরো মন্তব্য জোড়া লাগিয়ে তিনি হত্যারহস্যের একপ্রকার কিনারা করেছেন।
ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল একদিন দুপুরবেলা শরিফের চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়। দোকানের সামনে শুয়ে থাকা দুটি কুকুর তাঁকে দেখেনি তখনো। ফলে তারা একজন আরেকজনকে বলছিল, ‘ওরা তো ভুল লোককে ধরেছে।’
প্রথমটায় আলমগীর কবির বুঝতে পারেননি কুকুরেরা কিসের কথা বলছে। আর তা ছাড়া তাঁর উপস্থিতি টের পেয়ে ওরা চুপ করে গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী কয়েক দিন এই একই বাক্য পরপর কানে আসায় আলমগীর কবির বুঝতে পারেন, ওরা আসলে মোহনদাস চক্রবর্তীর হত্যা নিয়ে কথা বলছে।
‘তা আপনি আমাকে তাহলে কী করতে বলেন?’ দ্বিতীয়বার থানায় হাজির হওয়া আলমগীর কবিরের দিকে তাকিয়ে অধৈর্য গলায় জানতে চাইলেন এসআই ফিরোজ।
পরদিন সকালবেলা অধ্যাপক ছুটে গেলেন প্রথমে মোহনদাসের বাড়িওয়ালা তালুকদারের কাছে। রোজার মাসে সাহ্রি খেয়ে তালুকদার বেলা পর্যন্ত ঘুমাচ্ছিলেন। তাঁকে টেনে তুলে অধ্যাপক বললেন, মোহনদাসের মৃত্যুর তিন দিন আগে তাঁর কাছে একটা লোক এসে রাতে থেকেছিল।
এই দ্বিতীয় সাক্ষাতের বিবরণ আমরা শুনেছি মল্লিকের কাছে, সে শুনেছে তার বাবার কাছ থেকে। তার বাবা ওই দিন থানায় উপস্থিত ছিল।
‘প্রথম যেটা করবেন, আপনি বিজনকে ছেড়ে দেবেন, যেহেতু সে নিরপরাধ,’ জোর দিয়ে বলেছিলেন অধ্যাপক। ‘আর দ্বিতীয়ত, আপনি মোহনদাসের আসল খুনিকে পাকড়াও করবেন।’
‘কীভাবে?’
‘কুকুরেরা বলে দেবে। আমি তাদের কাছ থেকে জানার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাকে কয়েক দিন সময় দেন।’
এসআই ফিরোজ এতক্ষণ ধৈর্য ধরে কথা শুনছিলেন। এ কথা শুনে আর সামলাতে পারলেন না। অত্যন্ত রূঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘অধ্যাপক আলমগীর, এটা একটা হত্যা মামলা। কোনো ছেলেখেলা নয়। আপনি বুঝতে পারছেন আপনি কী বলছেন? একটা মার্ডার কেসের খুনি ধরিয়ে দেবে মহল্লার কুকুর?’
‘হ্যাঁ দেবে। কারণ, তারা দেখেছে। তারা আই উইটনেস।’
‘কোর্টে গিয়ে তারা সাক্ষ্য দেবে?’
এ প্রশ্নে দমে গেলেন আলমগীর। ব্যাপারটা একবারও ভেবে দেখেননি তিনি। কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, ‘আমি বলছি না কুকুরের কথা আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে। কিন্তু আপনি নতুন করে তদন্ত চালিয়ে দেখুন। তাতে তো আর দোষ নাই।’
‘কীভাবে তদন্ত চালাব? অমুকের চেয়ে লম্বা আর তমুকের চেয়ে ফরসা একটা লোকের পেছনে ছুটে বেড়াব আমি? কারণ, মহল্লার কুকুরেরা বলেছে? আমাকে আমার মতো তদন্ত শেষ করতে দেন আলমগীর সাহেব। আপনার কাজ ক্লাসে পড়ানো। আর আমার কাজ চোর-ডাকাত ধরা।’
এ কথা শুনে অপমানিত বোধ করেন অধ্যাপক। বেরিয়ে আসেন থানা থেকে।
বিকেলবেলা তিনি যখন ধীরপায়ে বাসায় ফিরছিলেন, তাঁর মুখ ছিল সন্ধ্যার আকাশের মতো বিষণ্ন। শোনা যায়, এ সময় তাঁর বাসার সামনে তিনটি কুকুর দাঁড়িয়ে তাঁকে দেখছিল। তাদের চোখে তাঁর জন্য সমবেদনা ছিল বলে আমার অনুমান।
পরদিন মহল্লার খেলার মাঠের কোনায় বেঞ্চে বসে অধ্যাপক আমাকে একটা উপন্যাসের গল্প বলেন, যেটা তিনি সম্প্রতি পড়েছেন এবং যেটা পড়ে তাঁর খুব ভালো লেগেছে। সত্যি বলতে, কুকুর ভাষা শেখার আইডিয়াটা ওই উপন্যাস পড়েই তাঁর মাথায় এসেছিল।
উপন্যাসের নাম দ্য ডগস অব বাবেল। ক্যারোলিন পার্কহার্স্ট নামের এক মার্কিন লেখিকার লেখা। সেই কাহিনির কেন্দ্রে এক ভাষাতত্ত্ববিদ। বাসায় একটা দুর্ঘটনায় তাঁর স্ত্রীর অপমৃত্যু ঘটে। ভাষাতত্ত্ববিদ সেদিন ছিলেন শহরের বাইরে। বাসায় তখন কেউ ছিল না। পুলিশ এটাকে দুর্ঘটনা ঘোষণা করে। কিন্তু ভাষাতাত্ত্বিকের সন্দেহ জাগে। কোথাও কিছু একটা গড়বড় লাগতে থাকে তাঁর। ওই দিন বাসায় কেউ এসেছিল। তার উপস্থিতির আলামত তিনি আঁচ করতে শুরু করেন। সত্যিকার কী ঘটেছিল স্ত্রীর ভাগ্যে, কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছিল, জানার উপায় নেই। কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই। একটাই প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁদের পোষা কুকুর। সে সব দেখেছে। ভাষাতত্ত্ববিদ তখন এক অসম্ভব কাজ শুরু করেন। তিনি তাঁদের পোষা কুকুর লরেলেইকে শেখাতে শুরু করেন মানুষের ভাষা, যাতে কুকুরটা তাঁকে জানাতে পারে ওই দিনের ঘটনার বিবরণ।
‘তিনি পেরেছিলেন শেখাতে?’
‘না। কারণ, তিনি ভুল পথে গিয়েছিলেন। তাঁর মেথড ভুল ছিল।’
‘কী ভুল?’
‘ভুলটা হলো, তিনি কুকুরকে মানুষের ভাষা শেখানোর চেষ্টা করেছেন। আসলে তাঁর উচিত ছিল উল্টোটা করা—কুকুরের ভাষা শেখার চেষ্টা করা। যেটা আমি করেছি এবং আমি সাকসেসফুল হয়েছি।’
মাসখানেক পর মোহনদাস চক্রবর্তী মামলার চার্জশিট দিল পুলিশ। বিজন চন্দ্র একমাত্র আসামি। তার আইনজীবীকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়ে নিরুপায় হয়ে অধ্যাপক আলমগীর শেষ চেষ্টা হিসেবে জেলহাজতে বিজনের সঙ্গে দেখা করলেন। আদালতে তিনি সাক্ষ্য দিতে উঠলেন বিজনের পক্ষে। সাক্ষ্য শুনে দায়রা জজ বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকলেন তাঁর দিকে এবং তাঁর সামনেই আসামির আইনজীবীকে তিরস্কার করলেন আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট করার জন্য।
যেদিন বিজন চন্দ্রের ফাঁসির আদেশ হলো, সেদিন অধ্যাপক আলমগীর তাঁর ঘরের দরজা বন্ধ করে ভেতরে বসে থাকলেন। রাতের খাবারের জন্য অনেক ডাকাডাকি করেও তাঁকে বের করা গেল না। সে রাতে তাঁর জানালার বাইরে কুকুরেরা চুপচাপ বসে থাকল। তাদের রুটিন বিবাদ তারা করল না। শেষরাতের দিকে দুটি কুকুর ‘কুঁইকুঁই’ করে অদ্ভুত কিছু আওয়াজ করল অধ্যাপকের জানালা লক্ষ্য করে।
পরদিন সকালবেলা অধ্যাপক ছুটে গেলেন প্রথমে মোহনদাসের বাড়িওয়ালা তালুকদারের কাছে। রোজার মাসে সাহ্রি খেয়ে তালুকদার বেলা পর্যন্ত ঘুমাচ্ছিলেন। তাঁকে টেনে তুলে অধ্যাপক বললেন, মোহনদাসের মৃত্যুর তিন দিন আগে তাঁর কাছে একটা লোক এসে রাতে থেকেছিল। পরদিন সকালে চলে গেছে। লোকটার একটা পা খাটো। খুঁড়িয়ে হাঁটে। এ রকম একটা লোকের কথা তাঁর মনে পড়ছে কি না? তালুকদার বললেন, আবছা মনে পড়ছে। সিঁড়িতে দেখা হয়েছিল লোকটার সঙ্গে। মোহনদাস ছিল সঙ্গে। মোহনদাসই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।
কী বলে পরিচয় করিয়েছিল?
হালকা হালকা মনে পড়ছে, কোনো একটা আত্মীয় বলেছিল। কী আত্মীয় মনে পড়ছে না।
লোকটাকে আরেকবার দেখলে চিনতে পারবেন?
পারব।
এসআই ফিরোজ বিরক্ত গলায় বললেন, আপনি আবার এসেছেন?
এসেছি। এবার আপনাকে পাকড়াও করে নিয়ে যাব আসামি ধরতে।
কিসের আসামি?
মোহনদাস চক্রবর্তী হত্যার।
উফ্! আপনি যান তো প্রফেসর সাহেব। আমার অনেক কাজ।
আমি এসপি সাহেবের কাছ থেকে আসছি। উনি একটু পরে ফোন দেবেন আপনাকে। আপনি যাবেন আমার সঙ্গে।
কোথায়?
মথুরাপুরে।
সেটা আবার কোথায়?
ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার একটা গ্রাম।
গিয়ে?
সেখানে দিলীপ দস্তিদার নামে এক লোক আছে। তিনি মোহনদাসের এক দূরসম্পর্কের কাজিন। আপনি তাঁকে গ্রেপ্তার করবেন। কারণ, তিনি মোহনদাসের হত্যাকারী।
অ। স্বীকার করবে?
পাকা খুনিরা কখনো অপরাধ স্বীকার করে না। তাদের বিশেষ পদ্ধতিতে জেরা করতে হয়।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, দিলীপ দস্তিদার কেন খুন করবেন তাঁর নিজের কাজিনকে?
খেলার মাঠে বেঞ্চে বসে অধ্যাপক আলমগীর কবির বাবেল জবাবে বললেন, দেশের অধিকাংশ খুনখারাবি যে জন্য হয়, সেই জন্য—জমিজমার জন্য। বেচারা মোহনদাস জানতেনও না তাঁর এক পিসতুতো ভাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া বিপুল জমিজিরাতের মালিক বনে গেছেন তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে। কেউ তাঁকে বলেনি। তিনি নিজেও খোঁজখবর রাখতেন না আত্মীয়স্বজনের। দিলীপ দস্তিদাররা সেই সম্পত্তির উত্তরাধিকার হবেন, যদি মোহনদাস বেঁচে না থাকেন। এ কারণে তাঁর বেঁচে না থাকা নিশ্চিত করেছেন দস্তিদার। নিজ হাতে।
এগুলো কে বলেছে আপনাকে?
আমি বের করেছি। অনুসন্ধান করে। আমাকে শুধু দুটি নতুন ক্লু দেওয়া হয়েছিল। তা হলো, মোহনদাসের মৃত্যুর তিন দিন আগে খুনি এসেছিল তাঁর বাড়িতে। এক রাত থেকে গেছে সেখানে। লোকটা মোহনদাসের আত্মীয় এবং এক পা খোঁড়া।
ক্লু কে দিল?
মহল্লার কুকুরেরা।
আপনি আড়ি পেতে শুনেছেন?
না।
তাহলে?
তারা নিজে থেকে দিয়ে গেছে।