নাবিল মুহতাসিমের গল্প—গত বৃহস্পতিবার
দুপুরটা কাটতেই চাইছিল না।
বহুদিন পর এসেছি মফস্সলের দাদাবাড়িতে। ঢাকায় সপ্তাহে ছয় দিন সকাল-সন্ধ্যা অফিসের ডেস্কে কাটাই আমি। মনে হয় এতটা অখণ্ড অবসর আমার সহ্য হচ্ছিল না। এই বাড়িতে রয়ে যাওয়া আমার একমাত্র আত্মীয় দাদিমার সঙ্গে সকালের নাশতা খাওয়ার পর কিছুক্ষণ মোবাইল ফোন স্ক্রল করলাম, কিছুক্ষণ নেটফ্লিক্স দেখলাম; কিন্তু ভালো লাগছিল না কিছুই। রাতে প্রচুর ঘুমিয়েছি, ঘুমানোর প্রশ্ন আসছে না। বাইরে যাব? আমার স্কুলের এক বন্ধু এখনো এই শহরে থাকে, কাছেই বাসা। বেশ ঠান্ডা পড়েছে, তাই সেটাও করা হলো না।
বসার ঘরে সোফার পাশে একটা বইয়ের তাক আছে। বেশির ভাগ বই আমার দাদার। বইটই পড়ার অভ্যাস নেই তেমন, কিন্তু সময় কাটাতে সেগুলো নেড়েচেড়ে দেখা শুরু করলাম। খটমটে ভাষাতত্ত্ব আর সাহিত্যের জটিল তত্ত্বের বই মনে করিয়ে দিচ্ছে আমার দাদা ছিলেন কলেজের শিক্ষক। কয়েকটা বই পড়ার চেষ্টা করলাম, মাথায় ঢুকল না কিছু। অপেক্ষাকৃত সহজ কোনো বই খুঁজতে গিয়ে নিচের একটা তাকে পেয়ে গেলাম চামড়ায় বাঁধাই করা মোটা একটা বই। ওপরে প্যাঁচানো ইংরেজিতে লেখা—ফটো অ্যালবাম।
বাহ্, এই তো পাওয়া গেছে মনের মতো একটা জিনিস। সোফায় আরাম করে বসে অ্যালবামের পাতা ওলটাতে থাকলাম।
‘ওহ, অ্যালবামটা পেয়েছিস? তোর ছোটবেলার অনেক ছবি আছে ওটাতে’, দাদিমা বললেন। আরেকটা সোফায় চাদর মুড়ি দিয়ে বসে মোবাইল ফোনে ফেসবুক স্ক্রল করছেন তিনি। তাঁর তিন ছেলেমেয়ে বিদেশে থাকেন, তাই ফেসবুকে তাঁদের ছবি দেখেই অবসর সময় কাটে তাঁর। আগেকার যুগের দাদিরা উল বুনে আর পিঠা বানিয়ে সময় কাটাতেন, নতুন যুগের দাদিরা এখন ফেসবুকের একনিষ্ঠ ইউজার।
অ্যালবামের পাতা ওলটাচ্ছি আমি, স্মৃতির দরজায় কড়া নাড়ছি। এই তো আমার দাদা-দাদির বহু পুরোনো একটা ছবি। গোঁফওয়ালা দাদা গম্ভীর, ঘোমটা পরা দাদি অনেক বেশি তরুণী। আমার চাচা-ফুফুদের ছবি, কিশোর বয়সের। আব্বু–আম্মুর বিয়ের ছবি দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস চাপলাম—বহুদিন হলো পৃথিবীতে নেই ওনারা। আব্বু-আম্মুর হানিমুনের ছবি, কক্সবাজারে। আম্মুর কোলে ছোট্ট আমি, দু-এক দিনের বেশি হবে না বয়স। এই তো আমি কেবল হাঁটতে শিখেছি। এই তো আমি স্কুলের ব্যাগ কাঁধে প্রথম যাচ্ছি স্কুলে।
‘নয়ন! দেখ দেখ, এই বিড়ালটা কত চালাক!’ আমার মনোযোগ কেড়ে নিলেন দাদি। বিস্ময়ে কথা সরছে না তাঁর মুখ দিয়ে। আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন মোবাইল ফোনটা।
ফেসবুকের যে রিলটা উনি দেখালেন, তাতে হাসিও পেল আমার, মায়াও লাগল সরল বৃদ্ধার জন্য। ১৫ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একটা কমলা-সাদা ডোরাকাটা বিড়াল দুই পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে সামনের থাবায় একটা বেলন ধরে রুটি বানাচ্ছে। বেশ কয়েকজন মানুষ গোল হয়ে দাঁড়িয়ে তার কীর্তি দেখছে। মাথায় আবার শেফদের একটা সাদা টুপিও পরেছে বিড়ালটা।
হেসে বললাম, ‘দাদিমা, এটা তো এআই।’
‘মানে কী রে?’
‘এটা কম্পিউটার দিয়ে বানানো। পুরোটাই নকল, কার্টুনের মতো।’ বোঝানোর চেষ্টা করলাম আমি।
‘কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব, দাদুভাই! বিড়ালটা দেখ, একদম বাস্তবের মতো। কয়েকটা মানুষ আছে, তারাও তো।’ চমক লেগে গেছে দাদির।
‘এই এআই বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স জিনিসটা অনেক এগিয়ে গেছে, দাদি। একদম বাস্তবের মতো ছবি, ভিডিও বানাতে পারে, ধরা খুব কঠিন। তবু বোঝা যায় ভালো করে খেয়াল করলে। এই যে দেখো, বিড়ালটা বেলন ধরেছে কীভাবে? তার তো বুড়ো আঙুল নেই। চারপাশের মানুষগুলো দেখো, নড়াচড়া বাস্তবের মতো নয়।’ ফোনটা দাদিমাকে দেখালাম আমি। ‘আর মানুষের ক্ষেত্রে যেটা বেশি হয় সেটা হচ্ছে, আঙুলগুলো ঠিকমতো দেখাতে পারে না এআই। গড়বড় করে ফেলে। হয়তো আঙুল দেখায় ছয়টা বা চারটা। বা বুড়ো আঙুল দুটো। বা আঙুলের মাথায় কোনো নখ নেই।’
দাদি খানিকক্ষণ বোঝার চেষ্টা করলেন রিলটার ফাঁকিগুলো। ‘কী জানি বাপু,’ বললেন তিনি শেষমেশ, ‘আমি আগের যুগের মানুষ, এগুলা বুঝিটুঝি না।’
হেসে আবার অ্যালবামটায় মনোযোগ দিলাম আমি। আমার ৮-১০ বছর বয়স পর্যন্ত ছবি আছে এখানে। আব্বু-আম্মু তখনো বেঁচে। মোবাইল ফোন বের করে কয়েকটা ছবি তুললাম ছবিগুলোর। রেখে দেব নিজের কাছে। অ্যালবাম হারিয়ে যেতে পারে, নষ্ট হতে পারে, কিন্তু ডিজিটাল তথ্য প্রায় অমর।
আমার একটা জন্মদিনের ছবি পেলাম। চার বছর বয়সের মনে হয়—তার মানে প্রায় ২৬ বছর আগের। আমার আত্মীয়স্বজনের বেশির ভাগই উপস্থিত কেক কাটার ছবিতে। মোবাইলের ক্যামেরা ফোকাস করলাম ছবিটার ওপর।
ক্লিক করার পর ফোনের স্ক্রিনে ছবিটা চেক করার সময় মনে হলো, কিছু একটা ভুল হয়েছে।
ছবিটা জুম করলাম আমি। হাঁ হয়ে গেছে আমার মুখ। ওই যে ছবিতে দেখা যাচ্ছে আমার পাশে দাঁড়িয়ে আমার মেজ চাচা। চাচাকে নয়, আমি দেখছি তাঁর হাত। কেকের দিকে একটা হাত বাড়ানো তাঁর আর সেই হাতে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে ছয়টা আঙুল।
ভালো করে গুনলাম আমি ঠান্ডা মাথায়। না, ভুল হয়নি। আঙুল ছয়টাই।
‘মানে কী?’ বিড়বিড় করলাম আমি। একটা যৌক্তিক ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করছি এবং পেতেও দেরি হলো না। মেজ চাচার হাতে আসলেই হয়তো ছয়টা আঙুল আছে। থাকতেই পারে, অনেক মানুষেরই তো দেখা যায়। যেমন বলিউডের অভিনেতা হৃতিক রোশনের আছে। আমার চাচা-ফুফুরা অনেক দিন ধরে প্রবাসী। মেজ চাচাকে শেষ দেখেছি মনে হয় বছর ১০-১২ আগে। ওনার হাতের আঙুল কখনো হয়তো মনোযোগ দিয়ে দেখা হয়নি, দেখলেও ভুলে গেছি।
দাদি তখনো ফেসবুকের রিল নিয়ে মগ্ন। মোবাইলটার স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে, আফ্রিকার একটা কৃষ্ণাঙ্গ শিশু একটা ট্রাক্টর চালাচ্ছে। পুরো ট্রাক্টরটাই ফুলকপি দিয়ে তৈরি! এআইয়ের আরেক পাগলামি।
‘দাদি, মেজ চাচার হাতে ছয়টা আঙুল, এটা তো জানতাম না।’ হেসে বললাম আমি।
‘কী বললি?’ ফোন থেকে মুখ তুলে বললেন বিমূঢ় দাদি। মনে হয় ফুলকপির ট্রাক্টরের বিস্ময় কাটেনি তাঁর।
‘মেজ চাচার হাতে ছয়টা আঙুল আছে। বাঁ হাতে।’
‘আরে নাহ! কে বলল তোকে?’ আমার কথা উড়িয়ে দিলেন দাদি।
এবার আমার অবাক হওয়ার পালা। ‘আরে না, আছে!’
‘কোথায় পেলি এই কথা, পাগল ছেলে! আমার নিজের পেটের সন্তানের হাতে কয়টা আঙুল আছে, আমি জানব না?’ বললেন দাদি।
মোক্ষম জবাব। বলার মতো আর কিছু না পেয়ে ছবিটা দেখালাম ওনাকে। ‘এই যে, দেখেন তাহলে! বলেন, আঙুল কয়টা।’
চশমাটা চোখে ভালো করে এঁটে ছবিটা পরখ করে দেখলেন দাদি। ‘আসলেই তো! ছয়টা আঙুলই দেখা যাচ্ছে।’
রসিকতা করার লোভ সামলাতে পারলাম না আমি। ‘পেটের সন্তানের হাতে কয়টা আঙুল, মনে হয় জানেন না আপনি আসলে...,’ বলেই দাদির গম্ভীর চেহারা দেখে চুপ মেরে গেলাম আমি।
‘মনে হয় ছবি ছাপাতে ভুল হয়েছে,’ দাদি বললেন। ‘তোর মেজ চাচার দুই হাতে আর সবার মতো করে পাঁচটা আঙুলই আছে। কমও না, বেশিও না।’
ঠিকই বলেছেন। ছবি ছাপাতে ভুল হতেই পারে। আগেকার দিনের ফিল্মের ক্যামেরা। এক্সপোজার-টোজারের কী সব ব্যাপার আছে, যাঁরা ফটোগ্রাফি নিয়ে ভালো জানেন তাঁরা বলতে পারবেন। একটা আঙুলকে হয়তো দুবার তুলে নিয়েছে ক্যামেরার ফিল্ম।
দাদি আবার ব্যস্ত হয়েছেন একা একাই গাড়ি চালাতে থাকা একটা কুকুরের ভিডিও নিয়ে। আমি আবার অ্যালবামের পাতা ওলটাতে শুরু করলাম। যাকগে, বেশ একটা মজার জিনিস হয়ে গেল চাচার আঙুল নিয়ে।
হাত-পা-মাথা, কিছুই চলছে না আমার। চোখ রসগোল্লা করে তাকিয়ে আছি আরেকটা ছবির দিকে।
আমার ফুফুর ছবি। তাঁর স্বামী আর সদ্যোজাত সন্তানসহ, বিদেশে যখন প্রথম গেছেন তখনকার ছবি। কোনো একটা দুর্গের ছাদে দাঁড়ানো, পেছনে লেক। বাচ্চাকে কোলে ধরে আছেন যে হাতটা দিয়ে, তাতে স্পষ্ট দেখছি ছয়-ছয়টা আঙুল।
কোনো ভুল হচ্ছে আমার।
আঙুলগুলো সাবধানে গুনলাম আমি। এক, দুই...ছয়টা। ভুল হচ্ছে না গুনতে। ছয়টাই আঙুল!
‘মানে কী?’ অস্ফুট কণ্ঠে বলে অ্যালবামের পাতা এবার ঝড়ের বেগে ওল্টাতে শুরু করলাম। এই যে আমার ছোট চাচুর একটা ছবি। বিদেশের এক শহরে হাতে কফির কাপ হাতে দাঁড়ানো। অবশ্যই ছয়টা আঙুল তাঁর হাতে!
ছবিটা ভালো ক্যামেরায় তোলা। বেশ স্পষ্ট। তবু একটা আঙুলের মাথায়ও নখ দেখা যাচ্ছে না। যেন নখ নেই একটা আঙুলেও।
ক্যামেরার ভুল? না, এই থিওরি আর কাজ করছে না। পুরোনো ছবিগুলো না হয় ফিল্মের ক্যামেরায় তোলা, কিন্তু পরের দিকের অনেক ছবি ডিজিটাল ক্যামেরায় তুলে পাঠিয়েছেন আমার আত্মীয়রা। এগুলোতেও ভুল হচ্ছে আঙুল দেখাতে? এটা কীভাবে সম্ভব?
আরও কয়েকটা ছবিতে নানাজনের আঙুল কম-বেশি দেখলাম আমি। আমার কাজিন বিচ ভলিবল খেলছে খালি পায়ে—পায়ের আঙুলও দেখাচ্ছে কখনো ছ’টা, কখনো সাতটা! একটা ছবিতে একজনের হাতে দেখা যাচ্ছে পাঁচটাই আঙুল, আবার আরেক ছবিতে দেখছি ছয়টা!
দাদিকে আর কিছু বললাম না । জিনিসটা বড্ড বেশি গড়বড়ে। খালি খালি বুড়ো মানুষটাকে ত্যক্ত করে লাভ নেই। আমার নিজেরই সুরাহা করতে হবে জিনিসটার।
কী ভেবে, অ্যালবামের শুরুর দিকে সবচেয়ে পুরোনো ছবিগুলো দেখতে শুরু করলাম আমি।
না দেখলেই ভালো ছিল। আমার মায়ের বিয়ের ছবিতে, ওনার হাতে দুটো বুড়ো আঙুল। আমার বাবার অফিস পিকনিকের ছবিতে একটা ডেগচি শূন্যে ভাসছে!
দাদির তরুণী বয়সের ছবিটায় স্পষ্ট দেখছি, ওনার এক হাতে সাত-সাতটা আঙুল! কিন্তু এই তো উনি বসে আছেন আমার সামনে, হাতে আর সবার মতো পাঁচখানা আঙুলমাত্র।
অ্যালবামটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি। মাথা কাজ করছে না। ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে একটু।
এসব কী দেখছি আমি! আমার পরিবারের ছবির অ্যালবামে এআই দিয়ে তৈরি ছবি কেন থাকবে?
কেউ মজা করার জন্য আসল ছবিগুলোকে এআই দিয়ে বানানো ছবি দিয়ে বদলে নিয়েছে নাকি? উদ্ভট চিন্তা পুরোপুরি। আমার দাদাবাড়িতে আমার কোনো কাজিন থাকে না যে আমাকে বোকা বানানোর জন্য এমন করবে। আমার অশীতিপর দাদি তো আর করেননি কাজটা, তাই না? তা ছাড়া কেউ সেটা করলেও ধুলোপড়া বইয়ের তাকে রেখে দিত না অ্যালবামটা, চোখের সামনে কোনো জায়গায় রাখত।
বিছানায় হেলান দিয়ে পুরো জিনিসটা আবার গোড়া থেকে ভাবতে শুরু করলাম। না, স্বপ্নটপ্ন দেখছি না। এই তো অ্যালবামটা, এই তো ছবির পর ছবি জুড়ে এআই জেনারেটেড ইমেজ। ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম, প্রতিটি ছবিতেই গড়বড় আছে।
একা একা এই রহস্যের কূলকিনারা করতে পারব না। কিছুক্ষণ ভেবে একটা আইডিয়া এল মাথায়। ফোনটা হাতে তুলে কল দিলাম এই মুহূর্তে আমার শহরে থাকা একমাত্র বন্ধুকে, নাম সাব্বির। ভাগ্য ভালো, সে একজন টেক-উইজার্ডও বটে। কোডিং থেকে শুরু করে ক্রিপ্টোকারেন্সি আর এআই, সবই ওর নখদর্পণে। দেখি ও কোনো দিশা দেখাতে পারে কি না।
‘কিরে সাব্বির? বাসায়?’ ও প্রান্তে ফোন ধরতেই বললাম।
‘হ্যাঁ,’ ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলল সাব্বির। ‘তুই বাড়িতে এসেছিস, বললি তো কালকে। জানিস তো, আমি দুপুরে উঠি। বিকেলে দেখা হবে।’
সারা রাত আউটসোর্সিং করে দুপুর পর্যন্ত ঘুমায় সাব্বির। ‘হ্যাঁ রে, জানি তো সেটা, কিন্তু আজকে একটু দেখা করতে পারবি? মানে, এখনই?’
সাব্বির চালাক ছেলে। খুব দরকারি কিছু না হলে আমি যে এভাবে বলতাম না, সেটা বোঝার মতো ক্ষমতা তার আছে। বলল, ‘আধা ঘণ্টা সময় দে। হাত–মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হই।’
সাব্বিরের বাসাটা হাঁটাদূরত্বে। দরজা খুলে দিয়ে আমাকে ওর কাজের ঘরে নিয়ে গেল সে। অনেকগুলো কম্পিউটার মনিটর আশপাশে। সেগুলোতে আসা-যাওয়া করতে থাকা জটিল কোডিং ভাষা বোঝা আমার সাধ্যের বাইরে। বিটকয়েন মাইনিং করে অনেক টাকা কামায় সে, এটুকুই জানি।
‘বল দেখি,’ সাব্বির চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল। মাথাভর্তি কোঁকড়ানো চুল ওর, চোখে ভারী চশমা। ‘তোর হাতে ওটা কী, ছবির অ্যালবাম?’
নীরবে অ্যালবামটা তুলে দিলাম ওর হাতে। অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে অ্যালবামের পাতা ওলটাতে শুরু করল সাব্বির। প্রথম পাতাটা উল্টেই চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল ওর, এরপর প্রতিটি পাতার প্রতিটি ছবি দেখতে থাকল খুঁটিয়ে।
‘ছবিগুলো যে অনেক আগে প্রিন্ট করা, তাতে সন্দেহ নেই,’ সাব্বিরের দেখা শেষ হওয়ার পর বললাম আমি। ‘আবার এতেও সন্দেহ নেই যে এগুলো এআই দিয়ে বানানো।’
কয়েকটা ছবি প্লাস্টিকের স্বচ্ছ আবরণ থেকে বের করে উল্টেপাল্টে দেখল সাব্বির। ‘আসলেই পুরোনো,’ বিড়বিড় করল ও। ‘ছবি প্রিন্ট করার এমন কাগজ বহু আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।’
‘এসবের মানে কী?’ অবিশ্বাসমাখা গলায় বললাম আমি। ‘আমার জীবনটা তো কাল্পনিক নয়। আমার ছোটবেলার যে ঘটনাগুলোর ছবি আছে এখানে, সেই ঘটনাগুলো মনে আছে আমার। আমার আত্মীয়রা সবাই বাস্তব, তাঁদের সঙ্গে ফোনে কথা বলি আমি! আমার দাদির সাথে বসে ছিলাম একটু আগেই।’
আমার কথা যেন মনোযোগ দিয়ে শুনছে না সাব্বির। চোখ অন্যদিকে, নিশ্চিতভাবে মনও। ‘আমার কথা শুনে হাসবি হয়তো, তবে একটা থিওরির কথা মাথায় আসছে...একটা না আসলে, দুটো।’
‘কী?’ আগ্রহী গলায় বললাম আমি।
‘বাদ দে,’ মাথা নেড়ে বলল সাব্বির। ‘এগুলো পুরোপুরি দার্শনিক কথাবার্তা বা অলস লোকের চিন্তাও বলতে পারিস। শুনে লাভ নেই। বাসায় গিয়ে অ্যালবামটা আগের জায়গায় রেখে দে। বিকেলে হাঁটতে বের হব ভার্সিটি ক্যাম্পাসে...’
‘এত ভণিতা না করে বল তো থিওরিগুলো!’ অধৈর্য হয়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম আমি।
‘এটাও তো ভুল প্রমাণিত করা অসম্ভব মনে হচ্ছে,’ ঢোঁক গিলে বললাম আমি। ‘আনফলসিফায়েবল না কী বলে, সেটাই। অকাম’স রেজর তত্ত্ব দিয়ে হয়তো নাকচ করা যাবে।
‘একটা থিওরির নাম হচ্ছে লাস্ট থার্সডেইজম,’ অস্বস্তির সঙ্গে নড়েচড়ে বসে বলল সাব্বির। ‘এই থিওরি ধরে নেয়, পুরো পৃথিবীটা সৃষ্টি হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। শুধু পৃথিবী না, পুরো মহাবিশ্বটাই। আগে কিছুই ছিল না কোথাও, তারপর গ্যালাক্সি-নীহারিকা-সৌরজগৎ থেকে শুরু করে মানুষের ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্য—সবকিছু একদম তৈরি অবস্থায় অস্তিত্ব পেয়েছে।’
‘পুরো গালগপ্প,’ হেসে বললাম আমি। ‘তাহলে যেসব মানুষ তৈরি হলো, তারা তো মনে করতে পারবে যে গত বৃহস্পতিবারের আগে তারা ছিল না। আর হ্যাঁ, গত বৃহস্পতিবারই কেন? শুক্রবার কেন নয়, বুধবার কেন নয়?’
‘বারের নামটা এমনিই দিয়েছে, কোনো কারণে নয়। আর হ্যাঁ, থিওরিটা অনুযায়ী মানুষের মগজের স্মৃতিগুলোও একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে, বাকি সবকিছুর সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার’, বলল সাব্বির।
চুপচাপ খানিকক্ষণ ভাবলাম আমি। ‘সে ক্ষেত্রে তো এই থিওরিকে খারিজ করার কোনো উপায় নেই,’ বললাম আমি।
‘হ্যাঁ,’ বলল সাব্বির। ‘এ ধরনের থিওরিকে বলে আনফলসিফায়েবল—যাকে ভুল প্রমাণ করা যায় না। কারণ, এই থিওরির বিরুদ্ধে তুই যেকোনো প্রমাণই হাজির করবি না কেন, পাল্টা যুক্তি দেখানো যাবে যে এই প্রমাণও তৈরি হয়েছে গত বৃহস্পতিবার, বাকি সবকিছুর সঙ্গে।’
উত্তেজনায় সোজা হয়ে বসলাম আমি। ‘তাহলে আসলেই এ ঘটনা ঘটেছে নাকি? আমার জীবনের সব ঘটনা নতুন, সব তৈরি হয়েছে গত বৃহস্পতি বা শনিবার! অ্যালবামের ছবিগুলো...কোনো কারণে ঠিকভাবে তৈরি হয়নি। এআই দিয়ে বানানো মনে হচ্ছে সে জন্য।’
‘এ রকম অকাট্য থিওরিকেও বাতিল করার উপায় আছে দর্শনশাস্ত্রে। শব্দটা শুনেছিস বোধ হয় কোথাও, অকাম’স রেজর। এই থিওরি বলে, পাশাপাশি দুটো সম্ভাবনা যদি থাকে, তাহলে সেটাই ধরে নিতে হবে, যেটা সবচেয়ে সম্ভাব্য। এই মহাবিশ্ব কোটি কোটি বছর ধরে সৃষ্টি হয়েছে, মানুষের ইতিহাস হাজার হাজার বছরের—এটার সম্ভাবনাই তো বেশি, তাই না? অসম্ভব জটিল এই জগৎ গত বৃহস্পতিবার তৈরি হয়েছে কোনো কারণ ছাড়া, সেই ধারণাকে কেটে বাদ দিয়ে দেয় অকাম’স রেজর।’
মাথা ওপর–নিচ করলাম আমি, ভাবছি। ‘দুটো থিওরির কথা বলছিলি। অন্যটা কী?’
‘চিন্তা করে দেখ, প্রযুক্তির কতটা উন্নতি হয়েছে গত পঞ্চাশ–ষাট বছরে। একটা যোগ–বিয়োগ করতেই খবর হয়ে যেত সেই আমলের কম্পিউটারগুলোর। আর আমরা এখন প্রায় নিখুঁত এআই ভিডিও বানাচ্ছি, যেটাকে বাস্তব থেকে আলাদা করা খুব কঠিন। আমরা কম্পিউটারের ভেতর এমন জগৎ তৈরি করতে পারি, যেটা বাস্তবের মতো। এমনভাবে হয়তো এমন শক্তিশালী কম্পিউটার তৈরি হবে, যেটার ভেতরে থাকবে পুরো মহাবিশ্ব। অণু–পরমাণু থেকে শুরু করে গ্যালাক্সি পর্যন্ত। প্রত্যেক মানুষের আলাদা আলাদা জীবন। সেই মানুষগুলো মনে করবে, তারাই বাস্তব। তারা আবার কম্পিউটার তৈরি করবে, সেই কম্পিউটার আবার বানাবে এআই। এভাবে জগতের ভেতরে জগৎ চলতে থাকবে’, বলল সাব্বির।
‘এটাও তো ভুল প্রমাণিত করা অসম্ভব মনে হচ্ছে,’ ঢোঁক গিলে বললাম আমি। ‘আনফলসিফায়েবল না কী বলে, সেটাই। অকাম’স রেজর তত্ত্ব দিয়ে হয়তো নাকচ করা যাবে। তবে একটা ব্যাপার ভেবে দেখেছিস কি, অকাম’স রেজর তত্ত্বটাও হয়তো তৈরি হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। অথবা পরের থিওরি অনুযায়ী, তৈরি হয়েছে কোনো কম্পিউটারের ভেতর।’
কোনো উত্তর দিল না সাব্বির। খানিকক্ষণ দুজনই চুপচাপ। তারপর ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালাম আমি। ‘ঠিক বলেছিস। অ্যালবামটা হয়তো কিছুই না। হুদাই সময় নষ্ট করছি। অ্যালবামটা আগের জায়গায় রেখে লাঞ্চ খেয়ে একটা ভাতঘুম দিই। বিকেলে হাঁটতে বের হব তোর সঙ্গে।’
‘সেটাই ভালো হবে,’ অস্পষ্ট গলায় বলল সাব্বির।
ঘর থেকে বের হওয়ার আগে দেখলাম, চেয়ার থেকে উঠে ঘরের কোনায় একটা তাকের কাছে গেছে সাব্বির। তাকের ওপরে ওটা কী? ছবির অ্যালবামের মতো দেখতে না?
সাব্বিরের বাসা থেকে আমার বাসায় যেতে একটা চার রাস্তার মোড় পেরোতে হয়। সেখানে একটা বড় মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য। কয়েকজন যোদ্ধা চার্জ করছেন রাইফেল নিয়ে।
না দেখলেই ভালো হতো, তবু চোখে পড়ে গেল—সবচেয়ে সামনের যোদ্ধার রাইফেল ধরা হাতে দু-দুটো বুড়ো আঙুল।