তানভীর আহমেদ সৃজনের গল্প—নীরিষ্কপু

অলংকরণ: এস এম রাকিব

আজ পূর্ণিমা। অদ্ভুত সুন্দর চাঁদ উঠেছে আকাশে। পুকুরঘাটের সিঁড়িতে বসে একনাগাড়ে কতক্ষণ ধরে সেই চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছি, আমি নিজেও জানি না।

কাকডাকা জ্যোৎস্না বোধ হয় একেই বলে! মনে মনে ভাবলাম আমি। জ্যোৎস্নার আলোয় চারদিক এতটাই আলোকিত হয়ে আছে যে ভোর হয়ে গেছে ভেবে ভুল করে যেকোনো সময় কাক ডেকে উঠতে পারে!

চাঁদের দিক থেকে দৃষ্টি নামিয়ে তাকালাম পুকুরের পানির দিকে। সেখানে টলটলে পানিতে দেখা যাচ্ছে চাঁদের প্রতিফলন। পুকুরের মাঝখানে ঠিক যেখানটায় চাঁদের প্রতিবিম্বের সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে পানির নিচ থেকে অল্প অল্প বুদ্‌বুদ উঠছে। মাছটাছ হবে হয়তো কোনো! আমি আবার তাকালাম আকাশের চাঁদের দিকে।

কী অপূর্ব দৃশ্য! অথচ যে পূর্ণিমার রাতে এই অপূর্ব দৃশ্যের দেখা মেলে, সেই পূর্ণিমার রাতেই নাকি এই গ্রামে বাইরে বেরোনো নিষেধ! আর কোনো জরুরি প্রয়োজনে কেউ যদি বাইরে বেরও হয়, তাহলেও পুকুর, দিঘি কিংবা যেকোনো ধরনের জলাশয় নাকি এড়িয়ে চলতে হবে!

অমাবস্যার রাত নিয়ে অনেক জায়গায় অনেক রকম কুসংস্কার প্রচলিত আছে, শুনেছি। কিন্তু এই প্রথম কোথাও দেখলাম, পূর্ণিমার রাত নিয়ে কুসংস্কার! অবশ্য কুসংস্কারটা ঠিক কী, সেটা আমাকে বলেনি ইমন। ও নিজেও কিছুই জানে না এ ব্যাপারে। তবে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ওর স্ত্রী নাবিলা বলেছে যে সে জানে। এখানকার পুকুর নিয়ে যে গল্প প্রচলিত আছে, সেটা কাল সকালে উঠে আমাকে আর ইমনকে বলবে নাবিলা।

ইমন আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধু। আজ থেকে এক সপ্তাহ আগে নাবিলার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে ওর। বিয়ের দুদিন পরই স্বামী-স্ত্রী মিলে চলে এসেছে নাবিলার গ্রামের বাড়িতে। আর তার দিন পাঁচেক পর, অর্থাৎ আজ সকালে আমি চলে এসেছি ওদের দুজনের নিমন্ত্রণে।

আরও পড়ুন

ওরা, বিশেষ করে নাবিলা বারবার একটা কথাই বলছিল, ‘সৃজন ভাই, আমাদের গ্রামে না এলে কিন্তু অনেক কিছু মিস করবেন!’ আজ এখানে এসে টের পেয়েছি, খুব একটা ভুল বলেনি মেয়েটা।

আকাশের চাঁদের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আবার তাকালাম পুকুরের মাঝখানটায়। যেখানে চাঁদটার প্রতিবিম্ব তৈরি হয়েছে, সেখানে। সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত একটা ব্যাপার চোখে পড়তেই ভ্রু খানিকটা কুঁচকে গেল আমার।

পুকুরের মাঝখানে, যেখানে চাঁদটার প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে, সেখানে পানির নিচ থেকে এখনো বুদ্‌বুদ উঠছে এবং সেই বুদ্‌বুদের পরিমাণ আগের চেয়ে অনেক বেশি, উঠছেও আগের তুলনায় বেশ দ্রুত!

এবার লম্বা করে একটা শ্বাস নিলাম আমি। বহু কষ্টে নিজের ভেতর খানিকটা শক্তি সঞ্চয় করে এক পা-এক পা করে দু-পা পেছালাম কোনোরকমে।

স্রেফ মাছটাছ হলে তো এত পরিমাণ বুদ্‌বুদ ওঠার কথা নয়! মনে মনে ভাবলাম আমি। তারপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম পুকুরের মাঝখানের ওই জায়গার দিকে। বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম, ওইখানে কী থাকতে পারে, যার কারণে এত বুদ্‌বুদ উঠছে?

আমাকে আরও বিস্মিত করতেই যেন সেই বুদ্‌বুদের পরিমাণ আরও বেড়ে গেল! শুধু তা-ই নয়, বিস্ময়ঝরা চোখে দেখলাম, বুদ্‌বুদ শুধু বাড়ছেই না, বরং একটু একটু করে এগিয়ে আসছে পুকুরের যে পাড়ে আমি বসে আছি, সেই পাড়ের দিকে!

কী ওটা?

উঠে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম আমি। ঘটনাটা কী ঘটছে, তা বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম। ওদিকে বুদ্‌বুদের মাত্রা বেড়েই চলেছে, সেই সঙ্গে ক্রমেই এগিয়ে আসছে পাড়ের দিকে। পাড় থেকে যখন মাত্র পনেরো গজের মতো দূরে, ঠিক তখনই ঘটল আরও অদ্ভুত একটা ঘটনা। পানির নিচ থেকে ভেসে উঠল বেশ বড়সড় একটা ডেকচি!

বিস্ফারিত চোখে আমি তাকিয়ে আছি ডেকচিটার দিকে। কিছু একটা ঝলমল করছে ওটার ভেতরে। তবে সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে, ডেকচিটা একা ভেসে ওঠেনি! চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, পানির নিচ থেকে সেটাকে ধরে রেখেছে রক্তশূন্য, ফ্যাকাশে এক জোড়া হাত!

আতঙ্কের একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল আমার শিরদাঁড়া বেয়ে। ওদিক থেকে ডেকচিটা ক্রমেই পাড়ের দিকে এগিয়ে আসছে, আর এদিকে আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। মাথা যেমন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে, তেমনি পা দুটোও যেন একদম জায়গায় জমে গেছে!

দেখতে দেখতে ডেকচিটা পাড়ের আরও কাছাকাছি চলে এল। মাত্র তিন-চার হাত দূরে আছে ওটা পুকুরের পাড় থেকে! আর ওই ফ্যাকাশে এক জোড়া হাত পানির নিচ থেকে একইভাবেই ধরে রেখেছে ওটাকে!

আরও পড়ুন

এবার লম্বা করে একটা শ্বাস নিলাম আমি। বহু কষ্টে নিজের ভেতর খানিকটা শক্তি সঞ্চয় করে এক পা-এক পা করে দু-পা পেছালাম কোনোরকমে। তারপর আরও কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করে নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েই দিলাম ভোঁ-দৌড়! ছুটতে লাগলাম রুদ্ধশ্বাসে!

আমার মনের ভুল কি না কে জানে, দৌড়াতে দৌড়াতে আমার মনে হতে লাগল, ছপাৎ ছপাৎ শব্দ তুলে কিছু একটা তাড়া করে আসছে আমার পেছন–পেছন! তবে কি পানির নিচ থেকে ডেকচি ধরে রাখা জিনিসটা পুকুর থেকে উঠে এসেছে? এখন আমার পেছনে ছুটছে আমাকে ধরার জন্য? আমি কি পারব ওটার হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে?

মনে মনে প্রমাদ গুনলাম আমি। আমতা আমতা করে বললাম, ‘ইয়ে...হয়তো আশপাশেই কোথাও গেছে, চলে আসবে। এত দুশ্চিন্তার কী আছে?’

প্রাণপণে ছুটতে লাগলাম আমি। একপর্যায়ে মনে হলো, প্রায় সহস্র বছর ধরে দৌড়ানোর পর ইমনের শ্বশুরবাড়ির কলাপসিবল গেটের সামনে এসে পৌঁছলাম। একমুহূর্ত দেরি না করে কিছুক্ষণ আগে চাপিয়ে রেখে যাওয়া কলাপসিবল গেটটা হ্যাঁচকা টানে খুলে একদৌড়ে চলে গেলাম ভেতরে। আমাকে যে ঘর দেওয়া হয়েছিল, সেই ঘরে। ঘরের ভেতরে ঢুকে দ্রুত হাতে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দিয়ে সেই দরজার ওপর হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগলাম। খানিকক্ষণ একইভাবে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর চলে গেলাম বিছানার কাছে। ধপাস করে শুয়ে পড়লাম বিছানায়।

আমার হৃৎপিণ্ড তখনো হাপরের মতো লাফাচ্ছে!

রাতে আমার দুচোখ কখন লেগে এসেছিল, জানি না। সকালে আমার ঘুম ভাঙল ব্যাপক হইচই আর কান্নাকাটির শব্দে। নারী, পুরুষ মিলিয়ে তিন-চারজনের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। আর কান্না শোনা যাচ্ছে কেবল একজনের কণ্ঠেই—নাবিলার।

‘আমার পুট্টুস কই?!’ হাউমাউ করে কাঁদছে নাবিলা। ‘আমার পুট্টুস!’

পুট্টুস নাবিলার পোষা কুকুরের নাম। বয়স তিন-চার মাস কিংবা তার কিছু বেশি হবে। নাবিলা যেখানেই যায়, সঙ্গে করে নিয়ে যায় পুট্টুসকে। গ্রামের বাড়িতেও নিয়ে এসেছে।

কিন্তু কী হয়েছে পুট্টুসের? নাবিলা এভাবে হাউমাউ করে কাঁদছে কেন?

বিছানা থেকে নেমে পা টিপে টিপে দরজার কাছে এগিয়ে গেলাম আমি। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়েই দেখলাম, নাবিলার ঘরের বাইরে শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছে ইমন আর নাবিলার বড় ভাই নাঈম। ঘরটার ভেতর থেকে ভেসে আসছে নাবিলার কান্না আর তার মা, বাবা, ফুফু আর নাঈমের স্ত্রীর উদ্বিগ্ন কণ্ঠ।

‘আল্লাহ বাঁচাইছে, গেট খোলা পাইয়া আমাগো কারও কাচ্চাকাচ্চা বাইর হইয়া যায় নাই!’ শোনা গেল নাবিলার ফুফুর গলা, ‘পুরা বিপদটা খালি একটা কুত্তার উপরে দিয়া গেছে গা!’

‘একদম আজেবাজে কথা বলবেন না!’ রীতিমতো চিৎকার করে উঠল নাবিলা, ‘ও জাস্ট একটা কুকুর ছিল না! জাস্ট একটা কুকুর ছিল না ও! ও ছিল...ও ছিল...’ কথা শেষ করতে পারল না নাবিলা। আবার ভেঙে পড়ল কান্নায়।

আমি এগিয়ে গেলাম ইমন আর নাঈমের কাছে। ‘কী হয়েছে?’

আরও পড়ুন

তারা দুজন তাকাল আমার দিকে। মুখ শুকনো হয়ে আছে দুজনেরই। নাঈম শুষ্ক গলায় বলল, ‘নাবিলার কুকুরটাকে পাওয়া যাচ্ছে না। মা, ফুফু আর তোমাদের ভাবি ঘুম থেকে উঠেছে সবার আগে, সেই ভোর পাঁচটার দিকে। তারাও দেখেনি কুকুরটাকে। শুধু দেখেছে, বাড়ির সদর দরজাটা খোলা। কে যেন খুলে রেখে দিয়েছিল রাতের বেলায়।’

মনে মনে প্রমাদ গুনলাম আমি। আমতা আমতা করে বললাম, ‘ইয়ে...হয়তো আশপাশেই কোথাও গেছে, চলে আসবে। এত দুশ্চিন্তার কী আছে?’

অবুঝ শিশুরা অর্থহীন কথা বললে বড়রা তাদের দিকে যেভাবে তাকায়, ইমন আর নাঈম ঠিক সেভাবেই আমার দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর একপর্যায়ে ইমন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘নাঈম ভাই আমাকে সব বললেন একটু আগে। সব শুনে যা বুঝলাম, পুট্টুস আর কোনো দিনই ফিরবে না।’

‘কেন?’ অবাক হলাম আমি।

‘কারণ, ওকে নীরিষ্কপু নিয়ে গেছে।’ জবাবটা দিল নাঈম, ‘আর নীরিষ্কপু একবার যাকে নিয়ে যায়, সে আর কোনো দিনই ফিরে আসে না।’

‘নীরিষ্কপু?’

‘হ্যাঁ।’ নাঈম বলল, ‘আমার সঙ্গে এসো, খুলে বলছি।’

নাঈম হাঁটা ধরল নিজের ঘরের দিকে। আমি আর ইমন অনুসরণ করলাম তাকে। অনুসরণ করে গিয়ে তার ঘরে ঢুকে দেখলাম, তার বিছানার ওপর একটা ছোট্ট হাঁড়ি রাখা। বিছানার কাছে গিয়ে হাঁড়িটা হাতে তুলে নিয়ে নাঈম ঘুরে তাকাল আমার আর ইমনের দিকে। গম্ভীর ভঙ্গিতে বললেন, ‘এটার ভেতর কী আছে, বলো তো?’

আমি একবার ইমনের দিকে তাকালাম। ওর মুখভঙ্গি বলছে, ওই হাঁড়ির ভেতরে কী আছে, সে সম্বন্ধে ও ইতিমধ্যেই অবগত। আমি আবার তাকালাম নাঈম ভাইয়ের দিকে। ‘কী?’

নাঈম হাঁড়িটা এক হাতে ধরে রেখে অন্য হাত ঢোকাল সেটার ভেতরে। অসংখ্য ভারী ধাতুর টুকরো নাড়াচাড়ার শব্দ ভেসে এল হাঁড়িটার ভেতর থেকে। এরপর নাঈম একটা চকচকে সোনালি মুদ্রা বের করে এনে সেটা দেখিয়ে বলল, ‘গোল্ড কয়েন।’

‘বলেন কী?’ বিস্ময় ঝরল আমার কণ্ঠে। আমি এগিয়ে গিয়ে নাঈম ভাইয়ের হাত থেকে নিলাম জিনিসটা। হাতের তালুতে নিয়ে ওজন দেখলাম। হ্যাঁ, ছোট্ট একটা মুদ্রা হিসেবে বেশ ভারী! আবার অবাক হয়ে তাকালাম নাঈম ভাইয়ের দিকে। জানতে চাইলাম, ‘পেলেন কোথায়?’

‘সামনের বড় পুকুরটার পাড়ে।’ নাঈম বলল, ‘সকালে উঠে কলাপসিবল গেট খোলা আর পুট্টুসকে পাওয়া যাচ্ছে না শুনেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। আমি ইমনকে সঙ্গে নিয়ে দৌড়ে গেলাম পুকুরপাড়ে। গিয়ে দেখি, আমার সন্দেহই ঠিক, পুকুরপাড়ে পুট্টুসের আকারের এই হাঁড়ি পড়ে আছে। নীরিষ্কপু যাকে নিয়ে যায়, তার সমান হাঁড়িভর্তি স্বর্ণমুদ্রা রেখে যায়।’

‘কিন্তু এই নীরিষ্কপু জিনিসটা কী আসলে?’

আরও পড়ুন

‘একজন অপদেবী, যে পানিতে থাকে।’ নাঈম ভাই বুঝিয়ে বলল, ‘এই গ্রামের প্রতিটা পুকুরেই তার প্রভাব আছে। প্রতি পূর্ণিমার রাতে সে জাগ্রত হয়। এ কারণেই এই গ্রামে পূর্ণিমার রাতে পুকুরের আশপাশে যাওয়া নিষেধ।’

হতভম্ব হয়ে নাবিলার বড় ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। অন্য সময় হলে তার বলা কথাগুলো বিশ্বাস তো করতামই না, উল্টো হেসে উড়িয়ে দিতাম কুসংস্কার বলে। কিন্তু এখন সেটা করার উপায় নেই।

কারণ, প্রথমত, গতকাল রাতে নীরিষ্কপুর শিকার আমি নিজেই হতে যাচ্ছিলাম। আর দ্বিতীয়ত, নীরিষ্কপুর শিকার হওয়া থেকে বাঁচতে দৌড়ে এসে বাড়ির ভেতরে ঢোকার সময় বাড়ির সদর দরজাটা আমিই খোলা রেখে দিয়েছিলাম।

হ্যাঁ, পুট্টুসের চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার জন্য অন্য কেউ নয়, আমিই দায়ী।

আরও পড়ুন