মধ্যরাতের আগন্তুক
১
হঠাৎ মাঝরাতে কলিং বেলের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল আরাফের। ডিমলাইটের আবছা নীল আলোয় সামনের দেয়ালে থাকা ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে সময় দেখে নিল সে—৩টা ১২ বাজে।
‘এত রাতে আবার কে এল,’ বিড়বিড় করতে করতে বিছানা থেকে নামল আরাফ। এখনো কলিং বেল বেজেই চলেছে। বিরক্ত হলো আরাফ। ‘ব্যাটা কি পাগল!’ নিজ মনে বলল সে। বেডরুম থেকে বের হয়ে ড্রয়িংরুমের সদর দরজার কাছে গিয়ে প্রশ্ন করল, ‘কে?’ দরজার ওপাশ থেকে এক পরিচিত কণ্ঠে উত্তর এল, ‘আমি।’ কণ্ঠটা পরিচিত হলেও ঠিক চিনতে পারল না আরাফ। তাই আবার প্রশ্ন করল, ‘আমি কে?’
‘সাবিত।’
২
আরাফ আর সাবিত এখন ড্রয়িংরুমে বসে আছে। আরাফ তার রুমের দরজার পাশের সোফায় বসেছে। তার সামনে একটা চেয়ারে বসে আছে সাবিত। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার দিকে।
আরাফ কৌতূহলভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই তো রাত ১০ টায় বের হয়েছিলি কক্সবাজারের উদ্দেশে, তাহলে মাঝরাস্তা থেকে ফিরে এলি কেন?’
‘রাস্তায় খুব কুয়াশা, বাইক চালাতে অসুবিধা হয়।’ অস্বাভাবিক শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল সাবিত। মৃদু হেসে আরাফ বলল, ‘তোকে তো আগেই সতর্ক করেছিলাম। আমার কথা শুনলে মাঝপথ থেকে আর ফিরে আসতে হতো না।’
আফসোস ভরা কণ্ঠে সাবিত জবাব দিল, ‘তোর কথা মানা উচিত ছিল। এখন তো দেরি হয়ে গেছে।’
‘কিসের দেরি?’ জানতে চাইল আরাফ।
‘কিছু না। তুই তো ভূতে বিশ্বাস করিস না, তাই না?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু কেন?’
‘ভূত দেখবি?’
‘সাবিত, এই জগতে ভূত বলতে কিছু নেই, বুঝলি।’
‘অন্য জগতে তো থাকতে পারে।’
‘তুই আসার পর থেকে অস্বাভাবিক আচরণ করছিস। তোর কী হয়েছে?’
‘তোর বেডরুমে যা, তাহলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।’
সাবিতের ওপর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে আরাফের। একে তো মাঝরাতে তার ঘুম ভেঙেছে, তার ওপর এখন আবার কী সব অদ্ভুত কথা বলছে।
৩
আরাফ তার রুমের ভেতর গিয়ে থমকে গেল। তার বিছানায় সে নিজে ঘুমিয়ে আছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না আরাফ। শিরদাঁড়া দিয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। আরাফ অনুভব করল, তার পেছনে কেউ একজন এসে দাঁড়িয়েছে। তার নিশ্বাসের শব্দ আরাফের কানে আসছে। আরাফের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আগন্তুক অস্বাভাবিক স্বরে প্রশ্ন করল, ‘আরাফ, ভূতে বিশ্বাস করিস?’
ঘুম ভেঙে গেল আরাফের। ঘেমে একাকার হয়ে গেছে সে। তাহলে কি স্বপ্ন দেখছিল সে! যদি স্বপ্নই হয়ে থাকে, তাহলে তার বেডরুমের দরজা কে খুলল? হঠাৎ আরাফের ফোন বেজে উঠল। সাবিতের ছোট ভাই ফোন দিয়েছে। কল ধরল আরাফ।
‘হ্যালো, সামির’, মৃদুস্বরে বলল আরাফ। সামির ধরা কণ্ঠে বলল, ‘ভাই...’ ফোনের অপর পাশ থেকে হট্টগোলের আওয়াজ ভেসে আসছে। আরাফ চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে? সব ঠিক আছে তো?’ সামির কান্না জড়ানো কণ্ঠে বলল, ‘ভাই! সাবিত ভাই বাইক অ্যাকসিডেন্ট করেছে; স্পট ডেড। ঢাকা মেডিকেল থেকে ফোন...’ ফোনের সিগন্যাল কেটে গেল। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না আরাফ। তার হাত–পা কাঁপছে। তাহলে কি সত্যিই সাবিত এসেছিল তার কাছে, কিন্তু কেন? তাকে শুধু ভূতে বিশ্বাস করানোর জন্য!
ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়ছে অথচ চোখের পাতা বন্ধ করতে পারছে না আরাফ। চোখ বন্ধ করলেই মনে হয়, তার পাশে কেউ বসে আছে; যার ছায়া ছায়া কাঠামোর পটভূমিতে একজোড়া ক্লান্ত চোখ উজ্জ্বল হয়ে আছে। সেই চোখ কার? মধ্যরাতের আগন্তুকের?
লেখক: শিক্ষার্থী, মুকুল নিকেতন উচ্চবিদ্যালয়, ময়মনসিংহ